লুনানা: যে সিনেমা নিয়ে অস্কারের মঞ্চে ভুটান
এফই অনলাইন ডেস্ক | Saturday, 26 March 2022
গত ২০ বছর ধরেই অস্কার কমিটি চাইছিল, কিন্তু পাচ্ছিল না; শেষে একটি সিনেমা এল, তাতেও বাঁধল বিপত্তি। সেই বাধা পেরিয়ে এল ‘লুনানা: আ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম’। আর এটি নিয়ে অস্কারের মঞ্চে এখন ভুটান।
রোববার রাতে হলিউডের ডলবি থিয়েটারে অস্কারের যে বর্ণাঢ্য আসর বসতে যাচ্ছে, তাতে বিদেশি সিনেমার শ্রেণিতে লড়ছে ‘লুনানা: আ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম’। একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের চূড়ান্ত মনোনয়নে এটাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির প্রথম চলচ্চিত্র।
এর আগে ১৯৯৯ সালে অস্কারে ভুটান থেকে পাঠানো হয়েছিল ‘দ্য কাপ’ চলচ্চিত্রটি; কিন্তু তা বাছাই পেরিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন পায়নি।
এরপর অস্কারের আসরে ভুটানের দীর্ঘ অনুপস্থিতি। অস্কার কমিটি ‘আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম’ শাখায় বারবার সিনেমা আহ্বান করছিল, কিন্তু প্রতিবারই তাদের নিরাশ হতে হচ্ছিল।
২০ বছরের বিরতি নিয়ে ২০২০ সালে ভুটান দ্বিতীয়বারের মতো অস্কারে জমা দেয় ‘লুনানা: আ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম’ চলচ্চিত্রটি। কিন্তু কারিগরি কিছু শর্ত পূরণ না করায় সে বছর সিনেমাটিকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে অস্কার কর্তৃপক্ষ। সেই সিনেমাটিই আবার নিয়ম মেনে ২০২১ সালে অস্কারে জমা দেওয়া হয়।
আর তাতেই ইতিহাস গড়া হয়ে গেল পায়ো চোয়িং দরজির। আর তা ‘স্বপ্নের মতো মতো’ ছিল তরুণ এই চলচ্চিত্র নির্মাতার কাছে।
গত মাসে অস্কার কমিটি চূড়ান্তভাবে মনোনীত সিনেমার নাম ঘোষণার পর পায়ো চোয়িং দরজি বলেছিলেন, “এটা একটা অসম্ভব যাত্রা ছিল, শুরুতে ভাবতে পারিনি কাজটি আদৌ শেষ করতে পারব। আর অস্কারে মনোনয়ন পাওয়া আমার জন্য এটাই অবিশ্বাস্য যে, বন্ধুদের কয়েকবার বলছি, সকালে উঠে হয়ত দেখব স্বপ্ন দেখছিলাম।”
সাধারণত ফেব্রুয়ারির শেষে বা মার্চ মাসের শুরুর দিকে ডরবি থিয়েটারে অস্কারের আসর বসে। মহামারীর বাধা পেরিয়ে এবার ৯৪তম আসর বসলেও কিছুটা পিছিয়েছে।
সেরা বিদেশি সিনেমার লড়াইয়ে ‘লুনানা: আ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম’ এ সঙ্গে রয়েছে আরও পাঁচটি সিনেমা। আর সেখানে জাপানের ‘ড্রাইভ মাই কার’ সমালোচকদের দৃষ্টিতে এগিয়ে রয়েছে। রোববার রাতেই জানা যাবে, কার ঝুলিতে যাচ্ছে এই পুরস্কার।
তবে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জিততে না পারলেও দেশের জন্য ইতিহাস গড়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্র সমালোচকদের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে ‘লুনানা: আ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম’।
ফলে যুক্তরাজ্যের দৈনিক ইনডিপেন্ডেটসহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে এসেছে এই সিনেমার কথা, এসেছে পায়ো চোয়িং দরজির সাক্ষাৎকার।
কী আছে এই সিনেমায়
ভুটানের এক উঠতি গায়কের দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ার পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা, আবার সেখান থেকে সরে আসারর দোটানা এই সিনেমার উপজীব্য, যার মধ্যদিয়ে ভুটানের শিক্ষকদের সঙ্কট তুলে ধরতে চেয়েছেন পায়ো চোয়িং দরজি।
সিনেমার পটভূমি ভুটানের একটি দুর্গম এলাকা লুনানা। জায়গাটি এতই দুর্গম যে একে ‘অন্ধকার উপত্যকা’ বলা হয়। দরজিকে শুটিং ইউনিট নিয়ে তুষার-বরফ পেরিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়েছে। আর লুনানায় যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠ, ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়েছিল দরজিকে।
সিনেমার কাহিনীতে দেখানো হয়েছে দাদির সঙ্গে ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে থাকেন তরুণ ইউগুয়েন। তার ইচ্ছা গান করা। ইউগুয়েনের পরিকল্পনা শিগগির অস্ট্রেলিয়া যাবেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তাকে যেতে হয় ভুটানের প্রত্যন্ত অঞ্চল লুনানায়। একটি বিদ্যালয়ে পড়ানোর দায়িত্ব পড়ে তার কাঁধে।
হিমালয়ের পাশে পাহাড়, পর্বত পেরিয়ে সেই বিদ্যালয়ে হেঁটে যেতে লাগে প্রায় তিন দিন। সেখানে বসবাস করে হাতে গোনা মানুষ। সেখানকার একমাত্র স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াতে হবে, যে ক্লাসরুমে একটি ইয়াক বা চমড়ি গরু রাখা হয়। শুধু তাই নয় ইয়াকের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা এক নারী চান, স্কুলের শিক্ষকই শেষমেশ এই প্রাণিটির দেখাশোনা করুক।
নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বাইরে কঠিন এক সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয় ইউগুয়েন।
প্রথম দিকে মানিয়ে নিতে না পারলেও ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানিয়ে যান ইউগুয়েন, সখ্য হয় বছর বয়সী পেম জামের সঙ্গে, ভাবনা বদলে যায় এই তরুণের। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানিয়ে যান ইউগুয়েন। দিন ভালোই কাটছিল।
এর মধ্যে গ্রামের প্রধান জানান, আবহাওয়া ভালো নয়, শিগগির বরফ পড়া শুরু হবে। একবার বরফ পড়া শুরু হলে আর কোনোভাবেই শহরে ফেরার পথ থাকবে না। বরফে ঢেকে যাবে পুরো এলাকা। শীতের প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকবে এই স্কুল। মন না চাইলেও ফিরতে হয় শহরে। ছবির শেষে ভেসে আসে- এটিই বিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী স্কুল।
পোয়ে চোয়িং দরজি এমন এক স্থানে শুটিং করেছেন, যেখানে মানুষ জানেই না সিনেমা কী? এই সিনেমায় তিনি নিয়েছেন সব অপেশাদার শিল্পীকে।
তিনি বলেন, “তারা সিনেমা তো দেখেইনি, কখনও কোনো সিনেমা হলে পা রাখেনি। তারা আসলে অভিনয় করছিল না, প্রাত্যহিক জীবন যেভাবে যাপন করছিল, তাই করছিল ক্যামেরার সামনে।”
বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত লুনানায় সবসময় চলে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এই দুটি মাসই কেবল ঝকঝকে রোদের দেখা মেলে, তাই সেই সময়ই বেছে নেওয়া হয় শুটিংয়ের জন্য।
পোয়ে চোয়িং দরজি বলেন, “থার্মাল জ্যাকেট আর তিনটি প্যান্ট পরে সারাদিন শুটিং করতাম আমরা, থাকার জায়গায় তেমন আলো ছিল না, ছিল না ঘুমানোর জন্য খাট এবং মেঝেতে কম্বল বিছিয়েই ঘুমাতাম। ওখানে গোসল এক ধরনের বিলাসিতা, দুমাস গোসলও করিনি।”
লুনানার গত ১৫ বছরের আবহাওয়ার তথ্য গবেষণা করে সে অনুযায়ী দরজি কাজ করেছেন বলে জানান।
“আমাদের প্রযোজক দলটি খুব কাজের, তারা সৌর প্যানেল নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করে কাজ করেছে, কারণ যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে সৌর বিদ্যুৎ পাওযা যাবে না। আমরা দুটি জেনারেটর সঙ্গে নিয়েছিলাম এবং কাজ সেরে ফেরার সময় সেটি স্থানীয়দের জন্য রেখে আসি।”
“চ্যালেঞ্জ ছিল এসব সামলে শেষ করতে পারব কি না, দুঃশ্চিন্তা ছিল, কিন্তু আমরা ব্যর্থ হইনি,” বলেন অস্কারের মঞ্চে পা রাখা পোয়ে চোয়িং দরজি।
এ ধরনের দুর্গম একটি এলাকায় একজন শিক্ষকের সংগ্রামকে তুলে আনার কারণ কী?
পোয়ে চোয়িং দরজি বলেন, “আমি খুবই আধ্যাত্মিক এবং বৌদ্ধধর্ম আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষক বা গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
“ভুটানের তরুণ স্কুলশিক্ষকদের মধ্যে কাজ ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। গত কয়েক বছরে বহু শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তারা ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্নের বিভাগ। আমি এই দিকটা দেখাতে চেয়েছি।”
পোয়ে চোয়িং দরজির সিনেমার একটি সংলাপ রয়েছে, যেখানে একটি শিশু বলছে, সে বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়, কেননা তার স্বপ্ন ভবিষ্যৎকে ছোঁয়ার। আর চলচ্চিত্র সমালোচকদের অনেকেই সিনেমার এই সংলাপটির মধ্যে বড় শক্তির আভাস দেখছেন।