logo

লন্ডন যেভাবে কালো টাকার অভয়ারণ্য হয়ে উঠল

সৈয়দ মূসা রেজা | Monday, 7 March 2022


যুদ্ধোত্তর বিশ্বের তীব্র টানাপড়েন সামাল দেওয়ার তাগিদে থেকে কিভাবে স্বৈরশাসকদের ‘খানসামা’র ভূমিকায় নামল ব্রিটেন এবং আমেরিকার অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো – বর্তমানে তাই খতিয়ে দেখা হয়েছে সম্প্রতি প্রকাশিত তিন বইয়ে।

ব্রিটেনের রক্ষণশীল দলের সদস্য এবং দেশটির পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ এবং উন্নয়ন মন্ত্রী এলিজাবেথ মেরি ট্রাস (তিনি সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও থেরেসা মে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অধীনে  মন্ত্রিসভার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন ও করছেন) সম্প্রতি দেশটির সংসদে ঘোষণা করেন যে দেশটি ক্ষমতা কুক্ষিগতকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানের তালিকা তৈরি করেছে। পরিণামে দেশটিতে এমন পরিস্থিতিদের সৃষ্টি হবে যে, “এ সব ব্যক্তি সেখানে জমা করা তাদের বিত্ত-বৈভবের তহবিল আর ছুঁতে পারবে না। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের জাহাজ কোনো বন্দরে ভিড়তে পারবে না।  তাদের বিমান পারবে না নামতে।” ব্রিটিশ সংসদের সাধারণ অধিবেশনে  ট্রাস এবং অন্যান্য সহযোগীর দেওয়া ভাষণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো ক্ষমতা কুক্ষিগতকারীদের বিরুদ্ধে ঝাল ঝাড়া হয়। লন্ডনে রুশ বিত্তবানদের আবাস কেন্দ্রগুলোকে ব্যাঙ্গ করে বলা হয় “লন্ডনগ্রাদ।”

ইউক্রেনে পুতিনের বর্বরোচিত হামলাকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা কুক্ষিগতকারীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়।

লজ্জাজনক সত্য কথাটি হলো, সোভিয়েত-পরবর্তী বলয় এবং অন্যান্য স্থান থেকে নোংরা অর্থকে (ডার্টি মানি) প্রায় ‘এসো আমার ঘরে এসো’ বলে দু’হাত তুলে সাদর সম্ভাষণ জানিয়েছে ব্রিটিশ প্রশাসন এবং দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। নোংরা অর্থ বলতে করফাঁকি ও দুর্নীতি-লুণ্ঠনের মাধ্যমে অর্জিত টাকা ও সেগুলো নিরাপদে বিদেশে পাচার করার কথা বোঝান হয়েছে। একে সহজভাবে কালোটাকা বলাও যায়।

দিমিত্রি ফিরতাশের কথাই উদাহরণ হিসেবে ধরা হোক। রুশ ইউক্রেনীয় গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানির আংশিক মালিক তিনি সে কথাটি ফাঁস হলো ২০০৬ সালে। এই গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানির মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনকে চাপের মুখে রাখতে পেরেছে রাশিয়া।  ব্রিটেনে বিলাসবহুল ঘরবাড়ি কেনা থেকে শুরু করে দাতাকর্ণ সেজে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি প্রদান এবং ব্রিটেনের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে  দান-দক্ষিণা সবকিছুতেই দুহাত খুলে অর্থ ওড়ানো! সবমিলিয়ে মনে হলো, যুক্তরাজ্যের সামাজিক জীবনে অসীম অবস্থান এবং অকল্পনীয় সম্মানের শিখরে পৌঁছে গেছেন তিনি। ব্রিটিশ সংসদ সদস্যরা তাকে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব। এমনকি, ব্রিটিশ রানির স্বামী ডিউক অব এডিনবার্গ প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে করমর্দন করেন তিনি। তবে তাঁর এই নামডাক এবং জৌলুস ফেঁসে যায় এফবিআইয়ের কল্যাণে।  দুর্নীতিতে যোগসাজশের দায়ে তিনি গ্রেফতার হলেন অস্ট্রিয়ায়।

বিত্তেরখানসামা ব্রিটেন

দুনিয়াজুড়ে লুটপাটের জড়িত দুর্নীতির বরপুত্র এবং দুর্বৃত্ত-বিত্তের জোরে অভিজাত হিসেবে পরিচিত লাভকারী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদকে হুন্ডির মাধ্যমে পশ্চিমে নিয়ে গেছে। সেখানে জমা করছে। গত এক দশক ধরে বিশদ এবং সাড়া জাগানো প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে এ সব বিষয়ে অবহিত আছেন অনেকেই। অর্থ-কড়ি-সম্পদ লুটপাটের ওপর এ সব প্রতিবেদন যতটা নজর দিয়েছে ততটা নজরই দিয়েছে অর্থ হুন্ডি মারফত পাচারের বিষয়াদির ওপর। কিভাবে এবং কেন বিত্তশালী দেশগুলো ক্ষমতা কুক্ষিগতকারীদের ‘কাজের ছেলে’তে রূপান্তরিত হলো তাও তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাটলার টু দ্যা ওয়ার্ল্ড’ বইতে অলিভার বুলফেরি এক শক্তিশালী রূপক ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমী দেশগুলো এ সব অবৈধ বিত্তের মালিকদের ‘বাটলার’ বা ‘খানসামায়’ পরিণত হয়েছে। দেশগুলোর এমন রূপান্তরের দিকে সংবাদ মাধ্যমসহ অন্যান্যদের যতটা নজর দেওয়া উচিত ছিল তা দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি। হালে এ ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ইউক্রেনে আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে পুতিনের সহযোগীদেরকে যখন পশ্চিম থেকে বের করে দেওয়ার মহোৎসব চলছে সে সময়ই এ সব বইয়ের কথা উঠছে। এ সব বইয়ের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতেই পারে না।

বাটলার টু দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ের প্রচ্ছদ

’বাটলার টু দ্যা ওয়ার্ল্ডে’ যুক্তরাজ্যকে সমালোচনার ধারালো ছররায় ক্ষত-বিক্ষত করেন বুলফ। পিজি ওয়াডহাউসের বার্টি উস্টার সিরিজের বিপদে অবিচল বাটলার জিভসের প্রতি ইঙ্গিত করে ‘বাটলার’ বা ‘খানসামা’ শব্দটি বেছে নেন বুলফ।  ব্রিটেনসহ হাজার হাজার ইংরেজি পাঠকের প্রিয় চরিত্রকে কেন্দ্র করে বিদ্রূপ এবং আক্রমণের ধারালো ছোরা চালানো  যায় না সে কথা স্বীকার করেন বুলফ। পাশাপাশি তিনি বলেন, “জিভসের চরিত্রকে সদা হাসি-খুশি এবং ভদ্র-সভ্য আচরণের ব্যক্তি হিসেবে শব্দচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন ওয়াডহাউস । জিভসের আচরণের দিকে নজর না দিয় তৎপরতার দিকে যদি তাকান হয় তা হলেই গভীর অন্ধকারাবৃত বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। জিভস প্রকৃতপক্ষে একজন ভাড়া খাটা ব্যক্তি, বিপদ বা  মুশকিল থেকে রক্ষা করতে সে ভাড়ায় দালালীর ভূমিকা নেয়।”  এখানেই ব্রিটিশ সরকারে সাথে তার সাযুজ্যের দেখা মেলে বলে ব্যাখ্যা দেন বুলফ। একই ভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসা ব্যক্তিদের হাতে যতক্ষণ নগদ নগদ টাকা-কড়ি আছে ততক্ষণ সব রকম সেবা দিতে সর্বদা প্রস্তুত ব্রিটেনও – বলেন তিনি।

খানসামার চরিত্রকে বেছে নিয়েই থেমে যাননি বুলফ। খানসামাগিরি শেখায় এমন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেন তিনি। হুন্ডি নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি এটি এক সময়ে বের করে ফেলে প্রতিষ্ঠানটি।  আর এ পরিপ্রেক্ষিতে ফুলসজ্জা বিষয়ক ক্লাসের পর বুলফকে সেখান থেকে সরাসরি বহিষ্কার করা হয়।

বিশ্ব-দুর্নীতিবাজদের কামাই করা টাকা কেবল ব্রিটেনে গচ্ছিত রাখাই হয় না। বুলফ আরো কিছু তুলে ধরেন, এ অর্থ-বিত্ত ব্যয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় তাঁদের বসবাসের জন্য প্রাসাদোপম আবাসগৃহ। তাদের সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা চলে নিরবিচ্ছিন্ন। তাঁদেরকে নানা ভাবে সম্মানিত করা হয়। ব্রিটেনের বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাঁদের নামে নানা কেন্দ্রের নামায়ন পর্ব ঘটে। তাঁরা রাজ-রাজাদের পৃষ্ঠপোষকও বনে যেতে পারে। এ সব ধনকুবের ব্যক্তির খুচরা প্রয়োজনগুলোও সামাল দেওয়ার ঢালাও তৎপরতাও চলতে থাকে পাশাপাশি।

বুলফের সুখপাঠ্য বই থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল নিয়ে ব্রিটেনের হঠকারী থেকে এসবের সূচনা। এ হঠকারী শেষ হয় বিপর্যস্ত সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে। এ কাজে ব্রিটেন জোট বেঁধেছিল ইসরাইল ও ফ্রান্সের সঙ্গে। সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করেছিল মিসর। আর এ জোট চাইছিল তা বানচাল করতে। আমেরিকার বিরোধিতা এবং এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনের কৌশলগত নপুংসক পরিস্থিতিকেই প্রকট করে তোলে। বুলফ মনে  করেন, এ ভাবে পিছিয়ে আসার পর “খানসামার” ভূমিকাকে বেছে নেওয়া ছাড়া ব্রিটেনের দৃষ্টিসীমার মধ্যে আর কোনো পথই খোলা ছিল না। ব্রিটেনকে নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন অ্যাচেসন তীর্যক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দেশটি (ব্রিটেন) “তার সাম্রাজ্য খুইয়েছে কিন্তু এখনো (বিশ্বে) কী ভূমিকা পালন করবে তা খুঁজে পায়নি।”  এমন কথারও জবাব দেওয়ার জন্য ব্রিটেনের সামনে খোলা রইল ওই “খানসামাগিরি।” এ অবস্থায়, ব্রিটেনের ভূমিকা হবে বিশ্বের নানা স্থান থেকে যে অর্থ-বিত্ত আসছে তাকে বিনা প্রশ্নে নিরাপত্তা দেওয়া।

এর মধ্যে একযোগে কিছু ঘটনা ঘটল যা কিনা এমন ভূমিকার সহায়ক হয়ে ওঠে। বুলফ বলেন, যুদ্ধোত্তর লন্ডন নগরী সরকারি বাধা-নিষেধের বেড়াজাল থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সচেষ্ট হয়। অর্থশালীদেরকে লাভজনক ব্যবসার সুযোগ এনে দিতে পারবে এমন সব নতুন নতুন পথ খুঁজে বের করতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তিনি তুলে ধরেন যে, কী ভাবে ডলার- প্রবাহ আটকে দিয়ে ওয়াশিংটন সুয়েজ ছাড়তে লন্ডনকে বাধ্য করেছিল। তিনি তুলে ধরেন, কী ভাবে নগদ মুদ্রার ঘাটতির সুযোগ নিয়ে জাতীয় নিয়ন্ত্রণকে ফাঁকি দিয়ে বিশ্বে আন্তঃসীমান্ত অর্থ প্রবাহ অবারিত ভাবেই চলতে থাকে। বুলফের এ সংক্রান্ত আগের বই ‘মানিল্যান্ড’এ দুনিয়াজোড়া আর্থিক ব্যবস্থায় দুর্নীতির তত্ত্ব-তালাশ করেন। একই নোংরা মুদ্রার অন্য দিক হিসেবে  শতাব্দীর মধ্যভাগে উদ্ভব ঘটে বিদেশে (অফশোর) ডলার লেনদেনের ইউরোডলার ব্যবস্থা এবং ব্রিটেনের “খানসামাগিরি” ভূমিকার ।

তারপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে নেমে এলো ভাটার সময়। বুলফ বলেন,  “ওয়েস্টমিনিস্টার যদি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মস্তিষ্ক হয়, তবে লন্ডন নগরটি হৃদপিণ্ড। সব মহাদেশ এবং পৃথিবীর প্রতি নগরীতে প্রসারিত আর্থিক ধমনীগুলোতে অর্থ সঞ্চালনার কাজ এটি করছে।” বুলফের বক্তব্যে, ব্রিটিশ অর্থনীতির উদ্ধারকর্তা হয়ে দেখা দেয় এই “খানসামাগিরি।”  ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ থেকে জিব্রাল্টার পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশ বা  ফাঁড়িগুলো অর্থ লুকানোর জায়গা হয়ে ওঠার কাহিনি তিনি শোনান। তিনি শোনান, কিভাবে  কঠিন নিয়ম নীতিকে ফাঁকি দিয়ে গোপনে অর্থ রাখার তৎপরতায় পটু হয়ে ওঠে সে গল্প। এ সবই বলেছেন তার  সম্প্রতি প্রকাশিত বই ‘বাটলার টু দ্য ওয়ার্ল্ড’এ।

 

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস  অবলম্বনে]