logo

লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ বাংলা একাডেমি

এসএম নাজমুস সাকিব | Sunday, 21 February 2021


বিশেষজ্ঞ ও লেখকদের মতে, বাংলা ভাষা আরো সমৃদ্ধ করার বর্তমান চাহিদা পূরণে পিছিয়ে পড়ছে বাংলা একাডেমি, এমনকি এর অতীতের গৌরবোজ্জ্বল যাত্রার সাথে তুলনা করলেও এই পিছিয়ে পড়া চোখে পড়ে।

বাংলা ভাষার প্রচার, প্রসার, সমৃদ্ধি এবং সুরক্ষার লক্ষ্যে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সাথে যুক্ত অনেকের মতে, বিগত দশকগুলোতে বাংলা একাডেমি তার নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।

একাডেমি কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ এখানে ভিন্ন। তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, বাংলা একাডেমি সঠিক দিশাতেই রয়েছে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা আরো জানিয়েছেন, আগামী একুশে বই মেলার পূর্বেই একাডেমির কারিকুলাম ও বাহ্যিক কাঠামো নতুন করে সাজানো হবে।

বর্তমান সময়ের একজন নবীন লেখক, থিয়েটার কর্মী ও ঢাকার লালমাটিয়া মহিলা কলেজের প্রভাষক মইন মুনতাসির দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেছেন যে কর্মতৎপরতার অভাবে একাডেমি নবীন লেখক ও পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, “একসময় বাংলা একাডেমি নবীন লেখকদের সুযোগদান এবং তাদের লেখা প্রকাশের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু নীতিগত কাঠামোতে ত্রুটি থাকা এবং কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সহায়তা না পাওয়ার কারণে উদ্যোগটিসফল’হয়নি।

ইতোমধ্যে কয়েকটি কবিতার বই প্রকাশ পাওয়া লেখক হতাশার সাথে বললেন, একাডেমি প্রাঙ্গণ তরুণ লেখক, কবি ও পাঠকদের আনাগোনায় মুখরিত হতে পারত, কিন্তু দেশের তরুণ প্রজন্ম ভুলতে বসেছে যে বাংলা একাডেমি নামক একটি একাডেমি রয়েছে।

মইন মুনতাসিরের দৃষ্টিতে, ”আমরা ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর যোগ্য উত্তরসূরী পাইনি, যিনি কাজ ও নতুন নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলা ভাষার উন্নতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়োজিত একাডেমির স্বপ্ন দেখেছিলেন।“

তিনি আরো যোগ করেন, “বাংলা সাহিত্য, পল্লীসাহিত্য, লোকজ সাহিত্য ও ভাষা এবং বহুবিধ ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য একাডেমির পক্ষ থেকে নবীন লেখকদের জন্য চিত্তাকর্ষক বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে সেরকম কোনো গবেষণামূলক কাজ করা হয়নি।

স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে প্রশ্রয় দানের ব্যাপারে তিনি একাডেমি কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলামও (সুমন সাজ্জাদ) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও বিকাশে বাংলা একাডেমির অবদান সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

 

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, বাংলা লিখনশৈলী, ভিন্ন ভিন্ন বাংলা অভিধান ব্যবহারের মতো কিছু অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে, যেগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান এই সমস্যাগুলো সমাধানে বাংলা একাডেমি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

অধ্যাপক বলেন, “আমাদের দেখামতে লোকজ সাহিত্যকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও একাডেমির কোনো আগ্রহী উদ্যোগ নেই। কিন্তু এই কাজগুলোকে বাংলা সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারলে ভাষা হিসেবে বাংলা আর সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে এবং এখানে বিদ্যমান অন্যান্য ভাষার প্রচার বাদেও আমরা বাংলা ভাষার প্রচারের জন্য কাজ করতে পারি।

সাজ্জাদুল ইসলাম আরো যোগ করেন, বাঙালিকরণের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির কাজ করা উচিত। উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তারা বাংলা ভাষার প্রসারের জন্য বিভিন্ন অঙ্গনের বই, যেমন গবেষণা, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং ভাষা বিষয়ক অন্যান্য ভাষার বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে পারে।

কবিতা, কল্পকাহিনী, সাংস্কৃতিক শিক্ষা, ইতিহাস ও সাহিত্যে একাধারে কাজ করছেন এমন একজন বলেছেন, “বাংলা একাডেমি বেশকিছু বিখ্যাত বাংলা ম্যাগাজিন প্রকাশের মতো ভালো ভালো কাজ করছে, কিন্তু ১৯৫২ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে ভাষাকে রক্ষা করেছি, তার প্রসারে এ কাজগুলো যথেষ্ট নয়।“

তিনি আরো বলেছেন, “বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার বিশেষজ্ঞ এবং এ ভাষা নিয়ে কাজ করছে এমন সব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিদের নিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উপর নিয়মিত কনফারেন্স ও সেমিনারের আয়োজন করতে পারে। বাংলা একাডেমির উদ্দেশ্য ফলপ্রসূ করতে আমাদের অবশ্যই সঠিক, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।“

আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তিনি ই-লাইব্রেরি এবং একাডেমির ডিজিটালকরণের পরামর্শ দিয়েছেন।দুর্লভ এবং শত বছরের পুরনো বই, যেগুলো খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর- সেগুলো ই-গ্যালারিতে পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারি আমরা”।

তিনি উল্লেখ করেন, “বাংলা একাডেমি ১৯৭০ সালে যে কাজগুলো করেছে বা অবদান রেখেছে, তার থেকেও বর্তমানে পিছিয়ে রয়েছে; যার অর্থ দাঁড়ায়, বাংলা একাডেমি অতীতের মতো কাজ করছে না।

বাংলা একাডেমির সচিব এএইচএম লোকমান দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, শিক্ষক ও লেখকদের উত্থাপিত কিছু বিষয়ের সাথে তিনি দ্বিমত পোষণ করছেন এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য প্রসারের লক্ষ্যে একাডেমি আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

জনাব লোকমান বলেন, ”আগামী বছর একুশে বইমেলার আগেই বাংলা একাডেমির পুরো চিত্র পাল্টে যাবে। সমস্যা সমাধান এবং উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে আমরা ১০ থেকে ১২টি বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছি।“

এই কর্মকর্তা জানান, “ডিজিটাল সুবিধাসহ সুন্দরভাবে গোছানো এবং সমৃদ্ধ একটি একাডেমি লাইব্রেরী থাকবে আমাদের। লেখক ও পাঠকদের সুবিধার্থে একাডেমি প্রাঙ্গণকে নতুনভাবে সাজানো হবে এবং কিছু অংশ বর্ধিত করা হবে।