লকডাউনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা: যেমন কাটছে সময়
তানজিম হাসান পাটোয়ারী | Monday, 12 July 2021
ভোর হতেই বেজে উঠল মোবাইলে অ্যালার্ম। তড়িঘড়ি করে উঠে তৈরি হয়ে যেতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটু দেরি হলেই মিস করতে হবে সকালবেলার প্রথম ক্লাস। সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, এর ফাঁকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, কিংবা ক্যাফেটেরিয়াতে বসে সবাই মিলে একসাথে গলা ছেড়ে গান গাওয়া- এই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের জীবনের চিত্র, ঠিক তখনই বাদ সেধে বসে করোনা মহামারির ছোবল। বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে এই দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী এই সময়টিকেই লাগিয়েছেন বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে।
এমনই এক শিক্ষার্থী হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত ওয়াহিদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিনের এই বন্ধে সেশনজটসহ নানা সমস্যা পোহাতে হলেও এই সময়টিতে কিছু গঠনমূলক কাজও করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ইয়ুথ অপরচুনিটিজ নামক একটি ইন্টার্নশিপে অংশগ্রহণ করা, যা আমাকে বাস্তবিক কর্মজীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এছাড়া কোর্সেরাতে এক্সেলে উপর একটি কোর্স করেছি এবং ন্যাশনাল হেলথ বাজেট-২০২১ নামক একটি ওয়েবিনার প্রেজেন্টেশনে অংশ নিয়েছি।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ আবু আজাদ তামিম বলেন, “করোনা মহামারিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছি, তা হলো ‘স্কলারশিপ স্কুল বিডি’নামক একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়া, যা আমাকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণা বিষয়ে অনেক কিছু শিখতে সাহায্য করেছে। এছাড়াও ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-২০২০’নামক একটি প্রতিযোগিতায়ও অংশগ্রহণ করেছি এই সময়টিতে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের ছাত্র মোঃ আশিকুর রহমান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের এই সময়টিতে বেশ কিছু সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছি এবং সেখানে সময় দিচ্ছি। এগুলোর মধ্যে ‘বিএলএসসি’, ‘লাইট টু লাইফ’অন্যতম। এছাড়াও কমিউনিটি অব বায়োটেকনোলজি নামক একটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার সুযোগও হয় এই সময়টিতে।” তিনি আরো বলেন, “নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কোর্সেরাসহ বিভিন্ন সংগঠনের একাধিক কোর্সও করেছি এই সময়টিতে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র মহিউদ্দিন আহমাদ বলেন, “ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল ফটোগ্রাফিতে। কিন্তু পড়ালেখার চাপে এই শখটিতে কখনো সেভাবে সময় দিতে পারিনি। তবে দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করতে পেরেছি অনেক। পাশাপাশি নিজের একটি অনলাইন ব্যবসায় পরিচালনা করেছি সময়টিতে।”
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপকরণ এবং ধাতব প্রকৌশল (ম্যাটেরিয়াল অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুমা আকতার লাভলি বলেন, “লকডাউনে প্রথম গঠনমূলক কাজ ছিল বহুব্রীহি নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনটি অনলাইন কোর্স করা। এছাড়া কোর্সেরাতে ই-মেইল লিখন এবং ইংরেজি সাহিত্যের উপর কিছু কোর্স করেছি।”
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে স্নাতক (বিবিএ) পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সাবরিনা তাসনিম এশা বলেন, “লকডাউনের এই সময়টিতে আমি অনেকগুলো সংগঠনের ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এছাড়াও অংশগ্রহণ করেছি বিভিন্ন ভার্চুয়াল কম্পিটিশনে, যা নিজেকে নতুনভাবে জানতে সাহায্য করেছে।
নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি) বিভাগের ছাত্র আসিফ আর রহমান বলেন, “করোনাকালীন সময়ে প্রথমত আমি বিভিন্ন ধরনের স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশ নিই। এছাড়াও ‘নোবিপ্রবি সায়েন্স ক্লাব’, ‘নেটওয়ার্ক অব ইয়ং বায়োটেকনোলজিস্ট’নামক সংগঠনগুলোর সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাই। কোর্সেরা, সিম্পল লার্ন, ইউডেমি থেকে কিছু অনলাইন কোর্সও করেছি এই সময়টিতে। এর মাঝে কমিউনিটি অব বায়োটেকনোলজি হতে আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় বায়ো ক্লাব সেগমেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করি। সেইসাথে বিভিন্ন অনলাইন সেমিনারে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাও রয়েছে।”
ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের শিক্ষার্থী জায়েদী জাফরি বলেন, “দীর্ঘ এই বন্ধে প্রথমদিকের সময়গুলো খুব একঘেয়ে লাগছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু অনলাইন কোর্স করি। এছাড়া আগে থেকে প্রোগ্রামিং এর কাজ কিছুটা জানা থাকায় এই সময় এটিকে ব্যবহার করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে একটি আয়ের পথও খুঁজে পাই। আবার কিছু ইয়ুথ স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আন্ডারে ইন্টার্নশিপ করেছি এই সময়টিতে।”
এ বিষয়ে আরো কথা হয় সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম এবং খনি প্রকৌশল (পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের ছাত্র আমাদ হোসেনের সাথে। তিনিও বিভিন্ন সংগঠনের ক্যাম্পাস এম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কথাটি জানান। তিনি আরো বলেন, “কোর্সেরা, এডেক্স, এবং বহুব্রীহিতে পাইথনের উপর কিছু কোর্স করেছেন।”এছাড়াও তার অর্জনগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত ভার্চুয়াল পোস্টার প্রেজেন্টেশনে ব্রোঞ্জ অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি, ভারতের গুজরাটে অনুষ্ঠিত এসপিই পিডিপিইউ ফেস্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন, এবং আইসিইআরআইই-২০২১ এ একটি কনফারেন্স পেপার প্রকাশ করা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আনিসুর রহমান শোভন বলেন, “করোনার এই সময়ে ‘ইনসাইট’নামক একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে নিজ এলাকার জনসাধারণের মাঝে করোনা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করেছি এবং হতদরিদ্র মানুষদের মাঝে মাস্ক, স্যানিটাইজার, এবং খাদ্য সামগ্রী বিতরণের কাজ করেছি। এছাড়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত একটি অনলাইন কোর্স এবং টেকনিক্যাল ট্রেইনিং সেন্টার-কুমিল্লা কর্তৃক আয়োজিত গ্রাফিক্স ডিজাইনিংয়ের উপর কোর্স করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আর এগুলোর পাশাপাশি নিজস্ব ফেসবুক পেজের মাধ্যমে কুমিল্লার খাদি কাপড় ও রসমালাইয়ের ব্যবসা পরিচালনা করেছি।”
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) যন্ত্রকৌশল (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের ছাত্র ফয়সাল আহমেদ নাঈম বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর প্রথম কয়েকমাস খুব বেশি কিছু করা না হলেও পরবর্তীতে সময়গুলো কাজে লাগানোর চিন্তা করি। আর এরই ধারাবাহিকতায় কোর্সেরা, ইউডেমি, ডোমেস্টিকাসহ কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করি। এছাড়াও অংশগ্রহণ করেছি গবেষণামূলক বিভিন্ন ওয়েবিনারে যেগুলো আমার স্কিল ডেভেলপমেন্টে অনেক সাহায্য করেছে।”
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আতিকুর রহমান বলেন, “লকডাউনে যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, তাই এই ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে একটি শিক্ষামূলক ইউটিউব চ্যানেল খুলেছি, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতে পারবে। এছাড়া অনলাইনে আর্টিকেল রাইটিংয়ের মাধ্যমে উপার্জনের পাশাপাশি নিজ এলাকায় কিছু উন্নয়নমূলক কাজেও অংশ নিয়েছি; যার মধ্যে হতদরিদ্র মানুষদের মাঝে মাস্ক বিতরণ করা এবং মাদকের কালো থাবা থেকে যুবসমাজকে মুক্ত রাখতে খেলাধুলায় উৎসাহিতকরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।”
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও এটি উদ্যমী শিক্ষার্থীদেরকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, কারণ তারা নিজেদের মেধা এবং পরিশ্রম দিয়ে এই হতাশাজনক সময়েরও সদ্ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। করোনাকালে শিক্ষার্থীদের এসব গঠনমূলক কাজ তাদের ব্যক্তিগত জীবনে দক্ষতা আনয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com