লকডাউনে কষ্টে বাসকর্মীরা: ‘গাড়ি বন্ধ হলে আমাদের সব বন্ধ হয়ে যায়’
এফই ডেস্ক | Monday, 12 July 2021
রাজধানী ঢাকার চিড়িয়াখানা থেকে মতিঝিলগামী নিউ ভিশন পরিবহনের চালক আবু হানিফ ১৬ বছর ধরে আছেন এই পেশায়। চিড়িয়াখানার পাশে মুক্তিযোদ্ধা আবাসিক এলাকায় ছয় হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিয়ে ছেলে-মেয়ে-বাবা-মাসহ পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে থাকেন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
করোনাভাইরাস মহামারীর অতি বিস্তার ঠেকাতে গত ১ জুলাইয়ের কঠোর লকডাউনের পর থেকে এক পয়সাও রোজগার হয়নি হানিফের। তিনি বলেন, “অনেক কষ্টেই কোনো রকম দিন যাচ্ছে। গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। একজনের আয়ের ওপর সবার খরচ নির্ভর।
“আগে মাঝেমধ্যে মাছ মাংস খেতাম, এখন শাক সবজির বাইরে ভালো কিছু খেতে পারি না। কোনো রকম জীবন চলতেছে। কারও কাছে টাকা পয়সাও ধার পাই না। কীভাবে যে দিন চলে, সেটা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।“
মহামারীতে হঠাৎ বিপদে পড়ে যাওয়া আবু হানিফ তার দুর্দশার কথা মুখ ফুটে না বললেও মিরপুর চিড়িয়াখানা এলাকায় বসবাসকারী একাধিক চালক-শ্রমিক জানিয়েছেন, টাকার অভাবে তিন বেলার খাবার হয়ে গেছে অনিয়িমত। দিনের খাবারে ভাত, ডাল-আলু ভর্তা অথবা শাক ছাড়া কিছু জুটাতে পারছেন না। পরিচিতজনদের কাছ থেকে ধারও মিলছে না বলে অস্থিরতার মধ্যে সময় পার করছেন।
ঢাকায় দীর্ঘদিন মোটাদাগে স্বচ্ছল জীবনযাপন করা এসব গণপরিবহন চালক ও কর্মীদের অনেকেই টাকার অভাবে নামমাত্র মূল্যে টিভি, ফ্যানসহ বাসার জিনিসপত্র বিক্রি করা শুরু করেছেন বলেও জানালেন।
নিদারুণ কষ্টের জীবনযাত্রার করুণ চিত্র তুলে ধরার সময় সবার চোখেমুখে ছিল অজানা শঙ্কাও।
পরিবহন সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর হিসাবে দেশে বাস ও ট্রাক মিলিয়ে ৫ লাখ গণপরিবহন রয়েছে, যাতে যুক্ত অন্তত ৩০ লাখ শ্রমিক। লঞ্চ, স্টিমার, রিকশা, সিএনজি অটোরিকশাসহ অন্যান্য পরিবহন মিলিয়ে এই সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি।
এসব শ্রমিকদের প্রায় সবাই ‘যেদিন কাজ, সেদিন বেতন’ এর ভিত্তিতে জীবিকা নির্বাহ করেন বলে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এভাবে কাজের মধ্যেও টেনেটুনে যারা কিছু সঞ্চয় করেছিলেন, ২০২০ সালে কোভিড সংক্রমণের শুরুতে প্রথম দফার লকডাউনেই তা নিঃশেষ হয়ে গেছে।
মাঝে কিছুদিন সীমিত আকারে জীবিকার সুযোগ মিললেও গত এপ্রিলে দ্বিতীয় দফা এবং এখন তৃতীয় দফার লকডাউনে টানা কর্মহীনতায় গণপরিবহন শ্রমিকদের সংসার চালানোর কষ্ট দীর্ঘতর হচ্ছে।
বছরজুড়ে কাজ না থাকায় বিপুল পরিবহন শ্রমিকের বেশিরভাগই চলমান লকডাউনে বাসস্থান ও খাবারের চরম কষ্ঠের মধ্যে জীবনযাপন করার কথা জানিয়েছেন।
শহরবাসী অনেক শ্রমিককে ভাড়া মেটাতে ব্যর্থ হয়ে বাসা ছাড়তে হয়েছে। দুই পরিবার মিলে উঠেছেন এক বাসায়; অনেকে ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়িতে।
গত কয়েকদিন রাজধানীর মহাখালী, চিড়িয়াখানা রোড, গাবতলীর অর্ধশত শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জীবনযাত্রার এরকম নিদারুণ করুণ চিত্রই জানা গেল।
“আমরা অধিকাংশ ড্রাইভার হেলপার ঘরভাড়া দিতে পারছি না। না পারতেছি কাজ করতে, না পারতেছি ঘরে থাকতে, না পারতেছি খাইতে। আমাদেরকে যে কেউ এসে খোঁজ নেবে সেই লোকও নাই,” বলেন একজন বাস শ্রমিক।
প্রজাপতি পরিবহনের চালক সেকেন্দার বলেন, “প্রথম দফায় লকডাউনে পরিস্থিতি কোনো রকমে সামাল দেওয়া গেছে। নিজেদের কিছু সঞ্চয় ভেঙে খেলাম। পরে আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার-কর্য করে কিছুদিন চললাম।
“সরকারও কিছু দিয়েছিল। জনপ্রতিনিধিরাও কিছু দিয়েছিল। কিন্তু এবারের লকডউন ও গত এপ্রিলের লকডাউনে কেউ আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন না। আমরা আসলে নিরুপায়।”
তার ভাষায়, মানুষ জীবনের সবকিছু ছাড় দিতে পারে, কিন্তু না খেয়ে তো থাকতে পারে না।
“আমাদের এখন হয়েছে, সেই না খেয়ে মরার দশা। ধার-কর্য পাওয়া যাচ্ছে না। পাওনা টাকাও কেউ ফেরত দিচ্ছে না। দেবে ক্যামনে, সবারই তো এক অবস্থা। আমার বন্ধুবান্ধব ওরা সবাই ড্রাইভার হেলপার। তাহলে এখন কার কাছে টাকা ধার নিতে যাব?”
সেকেন্দার জানালেন, এক ড্রাইভার বন্ধুকে দেওয়া ধারের টাকা এখনও ফেরত পাননি। বার বার চাইলেও তা দিতে পারছেন না সেই বন্ধু।
“আজকে ফোন করার পর বলল, ‘দোস্ত আমি রিকশা চালাচ্ছি’, বলে কেটে দিল। পরে বিকালে এসে আমাকে দেড়শ টাকা দিয়ে বলল, ‘আজকে আর চাইও না। আড়াইশ টাকা ভাড়া মারছি, তোমাকে দেড়শ টাকা দিয়া গেলাম।’”
গত তিন দশক ধরে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালানো আল আমিন লকডাউনের আগে দিশারী পরিবহনের বাস চালাচ্ছিলেন। বর্তমান লকডাউনের নিজের জীবনযাত্রার কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ধরে এল তার, দুচোখে এল পানি।
“বহুত খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি, আমরা না খায়াই আছি। বাচ্চা-কাচ্চার মুখের দিকে তাকায়ে হাসিমুখে কথা বলতে পারি না। চারিদিকে শুধু অভাব আর অভাব। হাতে টাকা না থাকলে শহরের জীবন একেবারেই অচল হয়ে যায়।”
গত বছরের লকডাউনে অনেকেই সরকারি সহায়তা পেলেও তা ভাগে পড়েনি দিশারী পরিবহনের আরেক চালক মোহাম্মদ আব্দুস সালামের। এ বছর পরপর দুই দফায় লকডাউন চললেও কেউ সহায়তার হাত বাড়ায়নি।
সালাম আরও বলেন, “ঘরে একটা দুধের বাচ্চা আছে, কিন্তু তার খাবারের কিছু নাই। ৩০ বছরের জীবনে কোনোদিনও রিকশা চালাই নাই, তারপরও উপায় না দেখে কালকে পায়ের রিকশা চালাইছি, সারা শরীর ব্যথা হয়ে গেছে।
“দুইজন ড্রাইভার মিলে আধা বেলা, আধা বেলা করে ভাগ করে চালাইছি। আজকে আমি আর হাঁটতে পারতেছি না ব্যথায়।“
কথা বলতে বলতে হতাশ এই চালকের কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসে, করুণ সুরে তিনি বলে চলেন, “গত সাতদিনের লকডাউনে এই অবস্থা। এখন সামনের দিকে কীভাবে যে চলব, তা আমার মাথায় আসতেছে না। উপরে আল্লাহ একজন আছেন, তিনিই জানেন আমাদের কী হবে।”
চিড়িয়াখানা রোডে ১০/১২ জন রিকশা চালককে দূর থেকে দেখিয়ে অন্যান্য বাস চালক জানালেন, “এরা সবাই আমাদের সাথে ড্রাইভারি করত। এখন তারা রিকশা চালাচ্ছেন।
“এখন সিনিয়র সিনিয়র ড্রাইভাররা পায়ের রিকশা চালায়। কারণ মোটরের রিকশা পুলিশ চলতে দেয় না। কারও কাছে ধার চাইলে পাওয়া যায় না। আমি কারও কাছে পাওনা নাই, উল্টো আমার কাছে পাইব অনেকে,” বলেন তাদের একজন।
চিড়িয়াখানা এলাকায় দিশারী পরিবহনের ৪০০ ড্রাইভার-স্টাফ রয়েছে জানিয়ে একজন চালক বলেন, “১৫ দিন পার হয়ে গেল, কোনো ত্রাণ-সহায়তা আসে নাই। আমি গ্রাম থেকে কিছু চাল নিয়ে আসছিলাম, সেটাই খাচ্ছি। না হলে এখন ভিক্ষা করা লাগত। কারণ আমার যে শরীরের অবস্থা, তাতে রিকশাও চালাইতে পারি না।“
সম্প্রতি গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, লকডাউনের কারণে দুপুরে সেখানে ভাসমান মানুষজনের জন্য খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। ভবঘুরে, পাগল, ছিন্নমূল মানুষের জন্য বিতরণ করা এসব খাবার নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন কিছু পরিবহন শ্রমিক।
বাস চলাচল স্বাভাবিক থাকলে তারা গাড়ি পরিষ্কার করা, মাঝেমধ্যে দূরপাল্লার বাসের হেলপার হওয়াসহ বিভিন্নভাবে আয় উপার্জন করছিলেন।
শতশত গাড়ির ভিড়ে এরকম কিছু মানুষকে দেখা যায় যারা কাজ না থাকার কারণে টার্মিনাল এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আশা কম তবুও যদি কোনো কাজ মেলে।
এই টার্মিনালে ছিন্নমূল মানুষের পড়াশোনায় নিয়োজিত বঙ্গবন্ধু অসহায় ছিন্নমূল স্কুলের শিক্ষক আল আমিন হাওলাদারকে দেখা গেল দুপুরে সেখানে খিচুড়ি বিতরণ করতে।
তিনি জানান, আগে কেবল ছিন্নমূলদের মাঝে বিতরণ করা হলেও এখন সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন দুপুরে ও রাতে ২০০ মানুষকে খাবার দেওয়া হয়। কয়েকদিন ধরে ৫০/৬০ জন পরিবহন শ্রমিকও খাবার নিতে আসেন।
তাদেরকে সম্মানের সঙ্গে পৃথকভাবে খাবার দেওয়া হয় বলে জানালেন তিনি।
একদিন কাজ দুই দিন বসে থাকা
সারাবছর গাড়ি চালানো বা কাজের পর এক লকডাউনেই কীভাবে সবকিছু অচল হয়ে যায়? তাহলে সঞ্চয় কী হয় না?
পরিবহন শ্রমিকদের কাছে প্রশ্নটি করা হয়েছিল বারবার। এর উত্তরও প্রায় একই ধরনের।
মহাখালী বাস টার্মিনালের বাসের হেলপার আবু তাহের মিয়া বলেন, “পরিবহন শ্রমিকদের হাতে আসে কাঁচা টাকা, নগদ। পকেটে যখন টাকা, তখন মাথা থাকে গরম। অধিকাংশ শ্রমিক এটাসেটা করে খরচ করে ফেলার অভ্যাস। কারণ সে জানে, একদিন পরেই আবার তার হাতে টাকা আসছে।“
ঢাকা শহরের ভেতরে এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃজেলা বাসগুলোর প্রতিটিতে দুজন করে চালক থাকেন। ফলে একজন চালকের পক্ষে মাসে ১৫ দিনের বেশি কাজ করা সম্ভব হয় না।
চালকের সঙ্গে হেলপাররাও বদলি হিসেবে কাজ করেন। অনেক সময় একটি গাড়ির জন্য তিনজন চালকও বরাদ্দ থাকে।
বাস-ট্রাক চালানোর অতিরিক্ত পরিশ্রম ও নির্ঘুম সময় পার করতে হয় বলে এই পদ্ধতি অনুসরনের কথা উল্লেখ করেন বাস মালিক ও শ্রমিক নেতারা।
দৈনিক এক হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করলেও পরিবহন শ্রমিকরা এই কারণে সঞ্চয় করতে পারেন না বলে তাদের দাবি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ এনায়েত উল্লেখ বলেন, “আমার যে গাড়িগুলো আছে সেখানেও একদিন পর পর চালক-হেলপার কাজের সুযোগ পান। পরিবহনখাতে এভাবেই চলে। এখানে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ ভিত্তিতে তারা কাজ করেন।“
ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরি সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, “শ্রমিকের কোনো নিয়োগ নাই, যেদিন গাড়ি চালায় সেদিনই তাদের আয় হয়। ফলে হরতাল অবরোধ কিংবা অন্য কারণে গাড়ি না চললে খুব সহজেই শ্রমিকরা কাবু হয়ে পড়েন।”
নেই কোন সরকারি ত্রাণ
২০২০ সালে প্রথম লকডাউনের সময় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দুই কিস্তিতে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল। সেই বরাদ্দ থেকে কিছু বরাদ্দ সৌভাগ্যবান শ্রমিক পেয়েছিলেন। তবে মোট শ্রমিকদের ১/২ শতাংশও হবে না বলে মনে করেন শ্রমিক নেতারা।
এনায়েত উল্লাহ বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে শ্রমিকদের কিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। অন্যান্য মালিককেও এগিয়ে আসতে বলি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মালিকরা আরও চরম বিপদে আছেন। তাদের মাথার ওপর মাসে মাসে ব্যাংকের কিস্তি। যারা তিন চারটি গাড়ির মালিক, গাড়ি বন্ধ থাকার কারণে তাদের জীবনও অচল হয়ে গেছে।“
নিজ কোম্পানি এনা পরিবহনের শ্রমিকদের জন্য এবারের ঈদে ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করার কথা জানান তিনি।