লকডাউন: ফেরি বোঝাই করে মরিয়া যাত্রা
এফই ডেস্ক | Tuesday, 29 June 2021
একজন শ্বাস ফেললেও আরেকজনের গায়ে লাগবে, এমনই ঠাসা ভিড়। গায়ে গা লাগিয়ে কোনোক্রমে দুই পায়ে দাঁড়িয়ে কেবল মাথা জাগিয়ে রেখেছেন যাত্রীরা।
সঙ্গের পোটলা রাখার জায়গা নেই, তাই মাথায় তুলে রেখেছেন কেউ কেউ। বেশিরভাগের মুখে মাস্ক নেই, থাকলেও থুতনিতে নামিয়ে রেখেছেন।
ডেকে যারা জায়গা পাননি, রেলিং, সিঁড়ি বা নামাজের জায়গায় কোনোক্রমে দাঁড়িয়েছেন তারা, পুরো ফেরিতে তিল ধারণের জায়গা নেই।
এই দৃশ্য ফেরি ফরিদপুরের। অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাক আর প্রাইভেটকার মিলিয়ে ডজনখানেক গাড়ি আর সহস্রাধিক যাত্রী নিয়ে মঙ্গলবার সকালে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে পদ্মার ওপারে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ফেরিটি।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার লকডাউনের বিধিনিষেধ জারি করেছে, দূরের যাত্রায় রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এই যাত্রীরা মরিয়া।
গণপরিবহন না থাকায় নানা ভোগান্তি সহ্য করে বিভিন্ন বাহনে ভেঙে ভেঙে বেশি ভাড়া দিয়ে ঢাকা বা আশপাশের জেলাগুলো থেকে তারা আসছেন। তাদের গন্তব্য পদ্মার ওপারে দক্ষিণ জনপদের বিভিন্ন জেলা।
সারাদেশে ‘লকডাউন’ জারির ঘোষণা আসার পর গত শুক্রবার থেকেই চলছে এ পরিস্থিতি। প্রতিদিন ফেরি বোঝাই করে মানুষ চলছে বাড়ির পথে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে মানুষের এই জনস্রোত সামলাতে হিমশিম খাওয়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও যেন অসহায়।
মাওয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ পরিদর্শক মো. সিরাজুল কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “মানুষ কিছুই বুঝতে চাইছে না। পথে চেকপোস্ট আছে, গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হলে তারা হেঁটেই ঘাটে চলে আসছে।”
ঘাটে পৌঁছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির অপেক্ষায় বসে থাকছেন এই যাত্রীরা। কোনো ফেরি ভিড়লেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
লকডাউনে যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও পণ্যবাহী ট্রাক ও জরুরি সেবার যানবাহন পারাপারের জন্য শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে ফেরি চালু রেখেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গাড়ি ওঠার আগেই ফেরি দখল করে ফেলছে ঘাটে অপেক্ষায় থাকা মানুষ।
পরিদর্শক সিরাজুল কবির বললেন, “ঘাটে যারা চলেই আসছে, তাদের দ্রুত পার করে দেওয়াই এখন আমাদের একমাত্র চেষ্টা।”
শিমুলিয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ১১ কিলোমিটারের এই নৌপথে তিন ধরনের ফেরি চলে। রো রো ফেরি, ডাম্প ফেরি আর মিডিয়াম ফেরি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় রো রো ফেরিতে ২৫ থেকে ৩০টি যানবাহন পরিবহন করা যায়। আর গাড়ি না তুললে তিন থেকে চার হাজার মানুষের জায়গা হয়।
শিমুলিয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিসি ব্যবস্থাপক আহাম্মদ আলী বলেন, “জরুরি পরিষেবার জন্য সচল রাখা ফেরি এখন যাত্রীদের দখলে। যাত্রীর চাপ সামাল দিতে এই রুটের ১৬টি ফেরির ১৫টিই চালাতে আমরা বাধ্য হচ্ছি। তারপরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। যাত্রীরা কোনো কথা শুনতে রাজি না।”
পরিদর্শক সিরাজুল কবির জানান, ঘাটমুখী এই জনস্রোত ঠেকাতে সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও শিমুলিয়ার হিলশা মোড়ে পুলিশের তিনটি চেকপোস্ট বসানো রয়েছে। মহাসড়ক ধরে আসলে ওই তিন চেকপোস্ট পার হতে হয়।
লকডাউনে কেবল ট্রাক, কভার্ড ভ্যানসহ পণ্যের গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্স চলছে। পাশাপাশি প্রাইভেট কারকেও ঘাটে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কোনো গণপরিবহন এলে আটকে দিচ্ছে পুলিশ।
“কিন্তু পণ্যের গাড়িতে করেও মানুষ আসছে, তাদের নামিয়ে দেওযা হচ্ছে। অনেকে মহাসড়ক এড়িয়ে জেলার ভেতরের আঞ্চলিক রাস্তা দিয়ে মিশুক বা কভার্ড ভ্যানে করে আসছে। তাদের তো আটকানো যাচ্ছে না।”
ফেরিতে বাদুড় ঝোলা হয়ে এই যাত্রায় কখনও রোদে পুড়তে হচ্ছে, আবার কখনও ভিজতে হচ্ছে বৃষ্টিতে। ভেঙে ভেঙে আসতে খরচ হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া।
মহামারীর মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে তারপরও কেন বাড়ি যাচ্ছে মানুষ?
ঘাটে অপেক্ষায় থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা বেশিরভাগই শ্রমজীবী। লকডাউনে কাজ থাকবে না, আর আয় রোজগার বন্ধ থাকলে কয়েক সপ্তাহ রাজধানীতে টিকে থাকা তাদের পক্ষে কঠিন। ফলে বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় তাদের নেই।