logo

রাস্তার পাশে চা পানের খরচও বেড়েছে

ইয়াসির ওয়ারদাদ | Saturday, 18 September 2021


চিনি, তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং কনডেন্সড মিল্কের অগ্নিমূল্যের মধ্যেই শহরে রাস্তার পাশে চায়ের দাম বেড়েছে কাপ প্রতি ১.০ থেকে ২.০ টাকা।

এতে সাধারণভোক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাকাল শ্রমজীবী স্বল্প আয়ের মানুষ, যারা রাস্তার পাশে টং দোকানে চা পান করে থাকে।

তারা বলছেন, কদিনের মধ্যেই রাস্তার পাশে টং দোকানগুলোতে চায়ের দাম কাপ প্রতি এক থেকে দুই টাকা বেড়ে ৬.০-৮.০ টাকায় পৌঁছেছে। আগে কাপ প্রতি চায়ের দাম ছিল ৫.০ থেকে ৬.০ টাকা।

দোকানিরা জানান, এক মাসে চিনির দাম বেড়েছে ১০-১২ টাকা, কনডেন্সড মিল্কের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা  এবং এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে প্রায় ১৫০ টাকা। 

যদিও চা পাতা'র দাম কয়েকমাস ধরে প্রায় স্থির আছে তবে তা গত বছরের তুলনায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ বেশি বলে তারা উল্লেখ করেন।

চা-স্টলে অনেক ভোক্তাকে গত কয়েক দিন ধরেই দাম বৃদ্ধির জন্য দোকানিদের সাথে বচসা করতে দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো দোকানি আবার খদ্দেরের হ্যাপা সামলাতে বড় কাপের জায়গায় অধিকতর ছোট কাপ ব্যবহার করছেন, পুষিয়ে নিচ্ছেন বাড়তি খরচ।

গরুর বা পাউডার দুধের চায়ের জন্যে গুনতে হয় প্রায় দ্বিগুণ টাকা, তাই সারা দেশে রাস্তার পাশের দোকানিরা চিনি এবং কনডেন্সড মিল্ক মিশ্রিত চা-ই বেশি বিক্রি করেন। এক হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।

শহরের রায়ের বাজারের পুলপাড় এলাকার রিকশাচালক মহসিন মোল্লা বলেন, "আমি সকাল এবং সন্ধ্যার নাস্তায় একটি বনরুটি এবং কলা খাই তারপর চা, প্রতিদিন ৪-৫ কাপ চা খাওয়া হয়"।

তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেই বান, বিস্কুট এবং অন্যান্য খাবারের দাম ২.০ থেকে ৩.০ টাকা বেড়েছে। এখন এক কাপ চায়ের দাম বাড়লো ১.০-২.০ টাকা।

এই অতিমারীর কালে যখন আয় কমেছে প্রায় অর্ধেক সেই সময় সকাল-বিকালের নাস্তা বাবদ মাসিক খরচ প্রায় ৫০০-৬০০ টাকা গুনতে হচ্ছে বলে জানান মহসিন।

শঙ্করের চা দোকানি মো. জাকারিয়া বলেন, চিনির দাম বেড়ে এখন ৮০-৮২ টাকা। কনডেন্সড মিল্কের দাম বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছেছে ৭৫ টাকায়। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ১১৫০ টাকা।

তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছরে চায়ের পাতার দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও লকডাউনের সময় কম গ্রাহকের কারণে কোন দোকানিরা এক কাপ চায়ের দাম বাড়ায়নি।

ইতোমধ্যে সিগারেটের মুনাফাও কমেছে এবং দোকানের জায়গার দৈনিক ভাড়াও বেড়েছে বলে জানান জাকারিয়া।

ধানমন্ডি -২৭ এলাকার চায়ের দোকানের মালিক আব্দুল গণি বলেন, তিনি দাম বাড়াননি কিন্তু 'কাপ' পরিবর্তন করেছেন। গ্রাহকদের সঙ্গে ঝামেলা এড়াতে ছোট আকারের কাপ কিনেছেন গনি যাতে আগের কাপের চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ কম পরিমাণ চা থাকে।

তিনি বলেন, ১০০ কাপ দুধ-চা তৈরিতে লাগে ৪ কন্টেইনার কনডেন্সড মিল্ক যার মূল্য প্রায় ৩০০ টাকা, ১.২৫ কেজি চিনি যার দাম ১০০ টাকা, ৪০০ গ্রাম চাপাতা যার দাম ১৬০ টাকা এবং জ্বালানি আনুমানিক ৫০ টাকার। এই হিসেবে এক কাপ চা তৈরির সর্বনিম্ন খরচ ৬.০ টাকা।

এদিকে সরকার কিছু দিন আগে চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৭৪-৭৫ টাকা কেজি নির্ধারণ করেছিল যা এখনও বাজারে দৃশ্যমান  হচ্ছেনা। বেশিরভাগ মুদিখানা এখনও খোলা চিনি ৭৮-৮২ টাকা ও প্যাকেট চিনি ৮৪-৮৮ টাকায় বিক্রি করছেন।

মোহাম্মদপুর-ভিত্তিক মদিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক ফুয়াদ হাসান বলেন, কনডেন্সড মিল্কের দাম বেড়েছে মূলত পাম অয়েলের দাম বৃদ্ধির কারণে। তিনি বলেন, পামোলিন ফ্যাট, চিনি, স্কিমড মিল্ক এবং অন্যান্য উদ্ভিজ্জ-চর্বি এই দুধের মূল কাঁচামাল।  মেঘনা গ্রুপ, আবুল খায়ের এবং অন্যান্য রিফাইনাররা মূলত কনডেন্সড মিল্কের মূল সরবরাহকারী বলে জানান ফুয়াদ।

এব্যাপারে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজির হোসেন বলেন, এই মহামারীর সময় যখন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে তখন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তিনি বলেন, রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে চা বা অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি নিম্ন-আয়ের এবং দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কারণ দৈনিক খাবারের একটা ভাল অংশ এসব দোকান থেকেই তারা খেয়ে থাকে।

তিনি বলেন, চাল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস পর্যন্ত বেশিরভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক, বাড়িয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের দুঃখ।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা সত্বেও চিনি বা ভোজ্য তেলের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক সরকার কমায়নি বলে তিনি জানান। 

বাজার পর্যবেক্ষণ বাড়ানো ছাড়াও, তিনি সরকারকে এই ধরনের পণ্যের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক অপসারণের আহ্বান জানান যাতে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্থি পান।

tonmoy.wardad@gmail.com