logo

রাস্তার কত সস্তা হোটেলে!

শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য | Wednesday, 24 March 2021


আমরা যারা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, কিংবা শহরে কোনো মেসে থেকে চাকরিবাকরি করি, তাদের বড়দের কাছ থেকেএত রাস্তার খাবার খাও কেন?’ ধরনের কথা প্রায়ই শুনতে হয়। কিন্তু সত্যি বলতে, বর্তমান নাগরিক জীবনে রাস্তার খাবার এমনি একটা অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তাকে বাদ দিয়ে বোধ হয় একদিনও চলা সম্ভব নয়।

স্ট্রিট ফুড বলতে যে শুধুমাত্র রাস্তার পাশে একটা খোলা ভ্যানে মাছির ভনভন শব্দের মধ্যে তৈরি করা কিছু খাবারকেই বোঝায়, তা কিন্তু নয়। যেকোনো সহজলভ্য এবং সুলভমূল্য খাবারকেই স্ট্রিট ফুড বলা যায়, তা সে টং কিংবা দোকানেরই হোক, বা ভ্যানেরই হোক, হোক ফুডকার্টের কিংবা ফুটপাতে কাপড় বিছিয়ে তৈরি করা কোনো স্টলের।

গোটা বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুডের তালিকাটা নেহায়েত ছোট নয়। এ তালিকায় আপনি অ্যাপেটাইজার থেকে শুরু করে হেভি ডিশ হয়ে একদম ডেজার্ট পর্যন্ত সব ধরনের খাবারই পেতে পারেন। বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুডের মধ্যে আছে চা, কফি, ঝালমুড়ি, চটপটি, ফুচকা, চানাচুর-মাখা, সিঙ্গারা, সমুচা, ডালপুরি, পেঁয়াজি, ছোলা, নুডলস, নানান রকমের পিঠা, ভেলপুরি, পানিপুরি, শরবত, জিলাপি, রসমালাই এবং জিভে জল আনা আরও অনেক কিছু।  চলুন, তবে ডুব দেওয়া যাক বাংলাদেশের বিশাল এই স্ট্রিট ফুডের সম্ভারে!

গোটা বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুডের কথা বললে প্রথমেই যে কয়েকটা খাবারের কথা মাথায় আসে, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সিঙ্গারা কিংবা সমুচা। যদিও দুটোই মোটামুটি একই জিনিস, পাশের দেশ ভারতে সমুচা বলতে আমাদের সিঙ্গারাকেই বোঝানো হয়, কিন্তু আমাদের দেশে দুটোরই আলাদা অস্তিত্ব আছে। সিঙ্গারা বা সমুচা একদমই বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের নিজস্ব আবিষ্কৃত কোনো খাদ্য নয়। উপমহাদেশের বাইরে থেকে আসা যেসব খাদ্য এ অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়েছে, তাদেরই অন্যতম সদস্য হচ্ছে সিঙ্গারা। ফারসি শব্দসংবোসাগ’ থেকেই মূলতসিঙ্গারা’ শব্দটি এসেছে। বর্তমানে আমরা আলু পুরে দেওয়া যে সিঙ্গারা দেখি, তার প্রচলনও হয় ষোড়শ শতকে, যখন বাণিজ্যিকভাবে পর্তুগিজরা এ দেশে আলুর প্রচলন শুরু করে। তার আগে সিঙ্গারাতে মূলত পুর হিসেবে মাংসের কিমা, বাদাম এবং নানান রকমের মসলা ও মরিচ ব্যবহৃত হতো।

তেমনি আরেকটি সর্ব-বাংলাদেশি স্ট্রিট ফুড হচ্ছে পেঁয়াজি। যদিও পেঁয়াজ থেকেই পেঁয়াজির নামকরণ, কিন্তু পেঁয়াজি বানানোর মূল উপাদান হচ্ছে মসুর কিংবা খেসারির ডাল। সাধারণত প্রচুর পেঁয়াজ, মরিচ ও মসলা দিয়ে তৈরি ছোট ছোট এসব ডালের বড়াকেই পেঁয়াজি বলা হয়ে থাকে। ডুবোতেলে কড়া করে ভাজা এক বাটি লাল লাল পেঁয়াজি অবশ্যই আপনার চোখে, মনে এবং পেটে খিদের উদ্রেক করতে বাধ্য। 

এ ছাড়া রয়েছে ডালপুরি। ডালপুরি হচ্ছে মূলত নরম লুচির মতো একটি তেলে ভাজা রুটি, যার ভেতরে পুর হিসেবে নোনতা ডালের ভর্তা ব্যবহার করা হয়। এটিও গোটা বাংলাদেশেই বেশ জনপ্রিয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড কী জিজ্ঞেস করলে একটা নামই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উঠে আসবে; সেটি হচ্ছে ফুচকা। বাংলাদেশে বোধ হয় এমন কোনো রাস্তা নেই, যার কোনো না কোনো প্রান্তে ফুচকার স্টল বা দোকান পাওয়া যাবে না। তবে এটিও বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো খাবার নয়। ফুচকার অনেকগুলো নাম ও প্রকার আছে; যেমন পানিপুরি, গোলগাপ্পা ইত্যাদি। ফুচকার উদ্ভব প্রথম হয় পানিপুরি হিসেবে, এর উৎপত্তিস্থল ছিল দক্ষিণ বিহারের মগধে। মচমচে লুচির এই ক্ষুদ্র সংস্করণটি খাওয়ার সময় এর ভেতরে দেওয়া হয় আলু, মাংসের কিমা কিংবা সবজির পুর, যদিও আলুর পুর দেওয়া ফুচকাই আমাদের বাংলাদেশে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। যে জিনিসটি ছাড়া ফুচকা একেবারেই অচল, তা হচ্ছেটক’! আমাদের দেশে সাধারণত টক হিসেবে মসলা দেওয়া তেঁতুলের জলকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়; স্বাদকোরককে প্রচণ্ড আলোড়িত করতে আলুর পুর দেওয়া তেঁতুল জলে ভেজানো টক-মিষ্টি-ঝাল স্বাদের এক বাটি ফুচকার কোনো জুড়ি নেই।

অবশ্য শেষ কয়েক বৎসরে ফুচকারই একটি বৃহত্তর সংস্করণ, যার নাম হচ্ছে ভেলপুরি। বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুডের মধ্যে নিজের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এর বৈশিষ্ট্য হুবহু ফুচকারই মতো। এতেও ফুচকার মতোই আলুর পুর দেওয়া হয় এবং টক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভেলপুরি সাধারণত আকারে ফুচকার দ্বিগুণ হয়। বর্তমানে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে মূলত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও তার ধারেকাছে ভেলপুরির আধিক্য লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশি হওয়ার পরও যে স্ট্রিট ফুডটি জীবনে একবারও না খাওয়াটা মোটামুটি ভালো রকমেরপাপ করার’ সমতুল্য। সেটি হচ্ছে ঝালমুড়ি। মুড়ি, চানাচুর, তেল, পেঁয়াজ, মরিচ, ঘুগনি, ধনেপাতা, এমনকি টমেটো, লেবু ইত্যাদিকে একসঙ্গে ঝাঁকিয়ে তৈরি এই ঝালমুড়ি নামের মিশ্রণটির স্বাদ হয় অমৃতসম। ফুচকার মতোই ঝালমুড়িও খুবই সহজলভ্য। বিশেষ করে স্কুল কিংবা কলেজের আশপাশে বেশির ভাগ সময়েই একাধিক ঝালমুড়িওয়ালাকে তাদের সরঞ্জাম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্ট্রিট ফুড, যার কথা না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে চটপটি। আমাদের দেশে সাধারণত ফুচকা আর চটপটি দুটো খাবারই একই স্টলে কিনতে পাওয়া যায়। অনেকখানি ঝাল ও ঝোল দিয়ে তৈরি এই খাবারটির প্রধান উপকরণ হচ্ছে বুটের ডাল, আলু, সেদ্ধ ডিম, ধনেপাতা, পেঁয়াজ, মরিচ, জিরা ইত্যাদি। ক্ষেত্রবিশেষে এতেও টক ব্যবহার করা হয়। এই খাবারটি গোটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে এতটাই প্রিয়, যে, বৈকালিক বা সান্ধ্যভ্রমণের জন্য বেরিয়ে ফেরার সময় কোনো একটা চটপটির স্টলে কখনো বসে পড়েননি, এমন মানুষ কমই আছেন।

এ তো গেল প্রধান প্রধান, পরিচিত স্ট্রিট ফুডগুলোর কথা। এ ছাড়া আলুর চপ, ডিমের চপ, ঘুগনি, নানা রকম ফল আর ফলের আচার, বেগুনি, পাঁপড় ভাজা, মোগলাই পরোটা, বিভিন্ন রকম রোল, ভাজা মুরগি, নানান মৌসুমি ফলের রস, অনেক পদের মিষ্টি ইত্যাদি সারা দেশ জুড়ে হরহামেশাই পাওয়া যায়, একটা একটা করে সবগুলোর কথা বলতে গেলে গোটা একখানা মহাভারত হয়ে যাওয়ার কথা।

তা ছাড়াও অঞ্চলভেদে আরও কত কত রকমের স্ট্রিট ফুড যে আছে, তার হিসাবই বা কজন রাখতে পারে? যেমন ধরুন চট্টগ্রামে সমুদ্রের পাশে গেলে আপনি স্ট্রিট ফুড হিসেবে পাচ্ছেন চিংড়ি ভাজা, কাঁকড়া ভাজা, নানা রকম সামুদ্রিক মাছ ভাজা, মায় টাটকা অক্টোপাস ভাজা পর্যন্তও। রাজশাহী গেলে সেখানে পাচ্ছেন বারো ভাজা, কলাই রুটি ইত্যাদি আরও বেশ কয়েক রকম স্ট্রিট ফুড। বরিশালে পাবেন নানান রকম নানান রকম বিখ্যাত মিষ্টি, পটলের চপ, মাখন রুটি; সিলেটে পাচ্ছেন এক পেয়ালায় সাত লেয়ারের বা সাত রঙের চা; মোদ্দাকথা বাংলাদেশের যেখানেই স্ট্রিট আছে, সেখানেই স্ট্রিট ফুডও থাকতে বাধ্য।

বাংলাদেশে স্ট্রিট ফুডের সহজলভ্যতার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষজন যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমাদের রাস্তার খাবারগুলোর মূল ভোক্তা মূলত এরাই। স্বল্পমূল্যে আমাদের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খিদে মেটানোর পরও যে বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুড নিজ গুণে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছেই প্রিয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনীয়ও হয়ে উঠেছে, সেটা আমাদের স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতির জন্য যথেষ্ট গৌরবের ব্যাপার। হাজার হলেও একজন এসি রুমে অফিস করা স্যুট টাই পরা মানুষ আর একজন ছেঁড়া লুঙ্গি গেঞ্জি পরা রিকশা টানা মানুষ একই দোকানে পাশাপাশি চেয়ারে বসে একই রকম খাবার খাচ্ছে, আমাদের স্ট্রিট ফুড ছাড়া সাম্যবাদের এমন বিপ্লব আর কে ঘটাতে পারত!

শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

 ইমেইল: shuvodipbiswasturja1999@gmail.com