রাসের মেলা, রাসলীলা
মোজাক্কির রিফাত | Thursday, 18 November 2021
বাংলাদেশের আদিবাসী গোষ্ঠী মণিপুরীদের অন্যতম প্রসিদ্ধ উৎসব রাসলীলা। প্রতিবছর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের পুর্ণিমা তিথিতে একটা মস্ত বড় চাঁদকে উপজীব্য করে মণিপুরীরা পালন করে এ উৎসব।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গাতে উৎযাপন করা হয় এই মহা রাসলীলা। তবে মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা কমলগঞ্জ আর আদমপুরে মণিপুরী সম্প্রদায়ের মানুষ সবচেয়ে জাঁকালোভাবে এ উৎসব উৎযাপন করে।
রাসলীলা উপলক্ষে দুই জায়গাতেই বসে রাসমেলা। মণ্ডপগুলো সেজে ওঠে মণিপুরীদের নিপুণ হাতের কারুকাজে, আর উৎসবের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী নৃত্য।
রাসমেলার শুরু
সংস্কৃত শব্দ ‘রস’ থেকে হয় ‘রাস।’ ‘রস’ শব্দের অর্থ হলো আনন্দ, দিব্য প্রেমানুভূতি। কার্তিকের পূর্ণিমায় হয় রাসের ক্ষণ। কৃষ্ণ-রাঁধার প্রেমলীলাকে বন্দনা করে এই উৎসব উৎযাপন করা হয়।
মৌলভীবাজারে প্রায় ১৫০ বছর ধরে এই উৎসব হয়ে আসছে। লোকমুখে শোনা যায়, মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নাদেশে রাসলীলার এই নৃত্য-গীতের প্রর্বতন করেছিলেন অষ্টাদশ শতকের ’৭০ এর দশকে। সেই থেকেই এই উৎসব মণিপুরীদের সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
উৎসবের আচার
রাস উৎসব মণিপুরীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মণিপুরী নাচ তো যেন মণিপুরীদের স্বকীয়তা আর সংস্কৃতির অংশ। নাচের মুদ্রা শিল্পের শিখরে ভ্রমন করায় শিল্পপ্রেমী মনকে। এই নৃত্যেই ফুটে উঠে রাঁধা-কৃষ্ণের জীবন, প্রেম আর শান্তির বাণী।
মণিপুরীরা বিশ্বাস করে শিশুদের মধ্যেই থাকে আধ্যাত্মিকতা। তাই এই উৎসবে কৃষ্ণ আর রাঁধার ভূমিকায় নাচ করতে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের ছোট শিশুদের এবং গোপীদের ভূমিকায় থাকে তরুণীরা।
রাসলীলায় যে নৃত্য পরিবেশিত হয় তার নাম 'রাস-নৃত্য।’ এটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত - মহারাস, বসন্তরাস, কুঞ্জরাস, দিব্যরাস, নিত্যরাস। এই নাচ আর সাজপোশাকেই থাকে মণিপুরীদের গোষ্ঠীগত স্বকীয়তার ছাপ।
জনমানুষের রাসমেলা
প্রতি বছর বাংলা কার্তিক-অগ্রহায়ণ আর ইংরেজি নভেম্বর মাসে এই উৎসব উৎযাপন করা হয়। মণিপুরী ছাড়াও বর্ণ, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে দেশ বিদেশ থেকে মানুষ মিলিত হয় এই মেলাতে।
তবে ১৯২৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৌলভীবাজার সফরের আগে এই মেলা সম্পর্কে বাইরের মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না। মূলত বাংলা, মৈথিলী আর ব্রজবুলি কবিতায় রাস নৃত্যের গানের পদ পাওয়া যায়।
এই পদের ধরন আর নৃত্যের গভীরতা কবিগুরুর কবিমনকে আলোড়িত করলে সাহিত্যে তিনি তা চিত্রায়ণ করেন। এর পর থেকেই মূলত মানুষ জানতে শুরু করে।
রাসমেলা মণিপুরী ঐতিহ্যবাহী সাজপোশাক, তাদের লোকশিল্প, কারুশিল্প ও বিকিকিনির মহাসমারোহ হয়ে ওঠে সকলের অংশগ্রহণে।
রাসমেলায় যেতে চাইলে
সারাদেশে বাস ও ট্রেনযোগে চলে যাওয়া যায় মৌলভীবাজার। এরপর সব ছোট যান-ই ভরসাআশেপাশে থাকার জন্য বিশেষ ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে কাছাকাছি লাউয়াছড়া ফরেস্টের পাশে বেসরকারি কিছু সংস্থার কটেজ আছে। এছাড়াও সমশেরনগরের কাছেই বেশ কিছু রিসোর্ট আছে। দিনে দিনে ফিরতে না চাইলে থাকতে পারেন এখানেও।
আদিবাসী গোষ্ঠী মণিপুরীদের সবচেয়ে বড় উৎসব এটি। একই সাথে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংস্কার জড়িত এই মহা রাসলীলার সাথে। তাই অবশ্যই তাদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রধান কর্তব্য। তাদের এই আনন্দযজ্ঞের শান্তি-সম্প্রীতি ও আনন্দদায়ক পরিবেশ যাতে কোনভাবেই বিঘ্নিত না হয় সে বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা আবশ্যক।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anmrifat14@gmail.com