logo

রাতের আঁধারে ঢাকা ছাড়ার মরিয়া চেষ্টা নিম্ন আয়ের মানুষের

এফই ডেস্ক | Monday, 5 July 2021


শনিবার তখন রাত পৌনে ১২টা, কারওয়ান বাজার মোড় থেকে পান্থপথের দিকে ধীর গতিতে আসতে থাকা একটি পিকআপকে ঘিরে ধরলেন একদল মানুষ।

ঢাকা থেকে বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের ভাড়া নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দরকষাকষি চললো পিকআপ চালকের সঙ্গে। পিকআপ চালক চাইছিলেন জনপ্রতি ৪০০, কিন্তু যাত্রীরা আড়াইশর বেশি দিতে রাজি নয়। রফা না হওয়ায় একসময় চলে গেল পিকআপ। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের। 

এ যাত্রায় ব্যর্থ গাইবান্ধার যাত্রী আব্দুল জলিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “লোক বেশি দেখে তারা ভাড়া বেশি চাচ্ছে। বড় ট্রাক এলে ঠিকই দুইশ টাকায় যাওয়া যাবে।”

জলিলরা যখন ঢাকা ছাড়ার চেষ্টায় গাড়ি খুঁজছেন, ততক্ষণে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকারের জারি করা লকডাউনের তৃতীয় দিন পেরিয়ে গেছে। কঠোর এই বিধিনিষেধের মধ্যে সব যাত্রীবাহী যান্ত্রিক যান চলাচল বন্ধ। পণ্যবাহী গাড়িতেও মানুষ তোলা নিষেধ।

কিন্তু লকডাউনে রোজগার হারানো এই মানুষগুলো মরিয়া। তাদের বেশিরভাগই দিনমজুর, রিকশা চালক বা ফেরিওয়ালা। হাতে যা জমা আছে, সেটা ফুরাবার আগেই তারা এই নগরী ছেড়ে বাড়ি ফিরতে চান।

রাজধানীর হাতিরপুল থেকে ভ্যান গাড়িতে করে টাইলস, রড ও সিমেন্ট শহরের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতেন জলিল। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে দোকানগুলো বন্ধ, তার হাতে কাজ নেই। এর মধ্যে আবার ঘনিয়ে আসছে কোরবানির ঈদ। ফলে আগেভাগেই বাড়ির পথ ধরার কথা ভাবতে হচ্ছে তাকে।

জলিল বলেন, “আমরা তো দিন মজুর। দিনে যা ইনকাম হয় তাই দিয়ে চলি। গত কয়েকদিন ধরে কোনো কাজ নেই। লকডাউনও বেশ কড়কড়ি হচ্ছে। সামনে ঈদের আগে যদি লকডাউন আরও বাড়ে তাহলে হাতের পয়সাও খরচ হয়ে যাবে। তার আগেই বাড়ি চলে যেতে চাই।”

কারওয়ান বাজারে বসুন্ধরা সিটির উল্টো দিকের ফুটপাথে জলিলের সঙ্গে বসেছিলেন ফেরিওয়ালা, ভ্যান চালক, রিকশা চালকসহ বিভিন্ন পেশার স্বল্প আয়ের অর্ধশত মানুষ। তারা সবাই ঢাকা ছাড়তে চান, যেতে চান উত্তরের বিভিন্ন জেলায়।

ঢাকার পোস্তগোলা, যাত্রাবাড়ী, মগবাজার, কারওয়ানবাজার রেলবস্তিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে এসে এখানে জড়ো হয়েছেন তারা।

মানুষকে বিধিনিষেধ মানাতে দিনের বেলা কড়াকড়ি থাকে বেশ; চেকপোস্টে থামিয়ে বের হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়। তবে এত রাতে আশপাশে কোনো পুলিশ দেখা গেল না।

ওই জটলার মধ্যে কথা হল মোবাদুর নামে একজনের সঙ্গে। তার বাড়ি বগুড়ায়, ঢাকার রামপুরার একটি গ্যারেজের রিকশা চালান। তিনিও ট্রাকে চড়ে বাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায়।

এবার লকডাউনে সরকার সব রাস্তায় রিকশা চালানোর সুযোগ দিয়েছে। তাহলে কেন বাড়ি যেতে চাইছেন?

মোবাদুর বললেন, রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামা গেলেও যাত্রী তেমন মেলে না। সারাদিন বসে থেকে আড়াইশ টাকাও ইনকাম হয় না। রিকশার জমা আর দিনের খরচ শেষে পকেটে থাকে না কিছুই। এখন আর ঢাকায় থেকে লাভ কী?

রবিউলের বাড়ি গাইবান্ধায়, রিকশা চালান পোস্তগোলায়। এ বছরের এপ্রিলে যখন লকডাউন হল, সেবার ঢাকায় থেকে বড্ড অর্থকষ্টে পড়তে হয়েছিল। তাই সতর্ক রবিউল এবার আগেভাগেই বাড়ি ফিরতে চান।

“লকডাউন কখন উঠবে তার তো কোনো ঠিক নেই। গতবার ঢাকায় ছিলাম, কোনো আয় ইনকাম করতে পারি নাই। এইবারও সারাদিনে দুইশ টাকা ইনকাম হচ্ছে না। তাইলে ঢাকায় থাকব কেন?”

কিন্তু লকডাউনের বিধিনিষেধ তো সারা দেশে। এভাবে নিষেধ ভেঙে ট্রাকে চড়ে বাড়ি গেলে কাজ জুটবে?

উত্তরে রবিউল বললেন, “বাড়িতে বউ পোলাপান আছে। তাদের সাথে থাকব। একটা না একটা ব্যবস্থা হবে।”

এপ্রিলের দ্বিতীয়ার্ধে যখন লকডাউন জারি হল, অনেক দিনমজুর তখন গাবতলী থেকে রাতের বাসে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন বলে জানালেন রবিউল। কিন্তু এবার সে উপায় নেই। তবে ট্রাকে করে যাওয়া যাচ্ছে শুনে কারওয়ান বাজারে এসেছেন তিনি।

অপেক্ষায় থাকা অনেকেই বললেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সবজি বা অন্য কোনো পণ্য নিয়ে যেসব ট্রাক বা পিকআপ আসছে, সেগুলোর কোনো কোনোটা খালি ফেরার পথে এই জায়গা থেকে ভাড়ায় যাত্রী তুলে নেয়।  এভাবে প্রতি রাতেই কিছু মানুষ যাচ্ছে।

এই জটলার সঙ্গে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই দেখা গেল, একটি পিকআপ এসে হাজির। চালক দরদাম করছেন। জনপ্রতি ৪০০ টাকায় ২০ জন যাত্রী নিয়ে বগুড়া যেতে রাজি তিনি।

কিন্তু যাত্রীরা অত দিতে রাজি না। দরদামের মধ্যেই কয়েকজন যাত্রী দৌড়ে চলে গেলেন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বড় একটি মালবাহী ট্রাকের দিকে। পণ্যের ওপর বসেই গন্তব্যে যাবেন তারা।

পিকআপ চালক শামীম জানালেন, তিনি এমনিতে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে সবজি পরিবহন করেন। ৪০০ টাকার কমে হলে তার পোষাবে না।

“পথে কত জায়গায় যে পলিশকে দিতে হবে তার ঠিক নাই। তার মধ্যে মালিককে না বলে এসেছি এই দিকে। এরা গেলে যাবে, না হয় আমি সবজির খ্যাপ মারবো।”

লকডাউনের মধ্যে দিনের বেলায় ঢাকার রাস্তাঘাটে কয়েক স্তরে কড়াকড়ি চলে। তবে রাত যত গভীর হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকিও শিথিল হয়ে আসে। রাজধানীর মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের তল্লাশি রাত ১১টার পরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ট্রাফিক পুলিশের ধানমন্ডি অঞ্চলের পরিদর্শক (টিআই) জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ট্রাফিকের পর্যাপ্ত তল্লাশি থাকা সত্ত্বেও অনেক দিনমজুর সবজির ট্রাকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে পার হয়ে যান। মাঝেমধ্যে তারা ধরাও পড়েন।”

লকডাউনের মধ্যে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে পুলিশের অপরাধ বিভাগ ও ট্রাফিক বিভাগ রাতের বেলাতেও কাজ করে জানিয়ে তিনি বলেন, “কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে কেউ এভাবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রা করলেও গাবতলী এলাকার তল্লাশিতে ধরা পড়ার কথা।”

গত বছরও মহামারী শুরুর পর দুই মাসের লকডাউনের মধ্যে কাজ হারানো বহু মানুষ পরিবার নিয়ে ঢাকা ছেড়ে গেছে। সেবার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন বা ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ ও খাবার বিতরণ করতে দেখা গেলেও এবার তেমন দেখা যাচ্ছে না।

লকডাউনের মধ্যে দিনমজুরদের পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসের চালক, হেলপার, অটোরিকশা চালক, ফেরিওয়ালা, ফুটপাতের দোকানিসহ বহু মানুষের উপার্জন বন্ধ গেছে।

উত্তরবঙ্গগামী শ্রমিকদের জটলার কাছেই মটরসাইকেল থামিয়ে হেলমেট খুলে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছিলেন সেলিম, যিনি রাইড শেয়ার করেন।

সেলিম জানালেন, তাদের বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জে। দেড় কাঠা একটি জমিতে দুই তলা বাড়িতে স্ত্রী দুই ছেলে মেয়ে ও মাকে নিয়ে থাকেন। ১৮ বছর সৌদি আরবে থেকেও জীবনে কোনো সঞ্চয় করতে পারেননি। সেখানে এক মালিকের প্রাইভেট কার চালানোর চাকরি করতেন, কিন্তু বেতন পেতেন বাংলাদেশি টাকায় ২০ হাজারের কম। বাধ্য হয়ে তাই দুই বছর আগে দেশে ফিরে একটি মটরসাইকেল কিনে রাইড শেয়ার করে সংসার চালাচ্ছেন।

“আমি একদিন বসে থাকলে পরের দিন খরচ করার টাকা পাই না। এই মটরসাইকেল চালানো ছাড়া আমার কোনো ইনকাম নাই। অসুস্থ মায়ের জন্য প্রতিদিনই ওষুধ লাগে। ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসারে প্রতিদিন খরচ আছে। তিন দিন ধরে ঘরে বসা, কী করে চলি বলেন?

“তাই সন্ধ্যার পর সাহস করে রাস্তায় বেরিয়েছি। তিনটা লম্বা ট্রিপ দিয়ে ৬০০ টাকার মত হল। এখন বাসায় চলে যাব।”

কিন্তু এভাবে ঝুঁকি নেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? রাস্তায় পুলিশ তো মোটারসাইকেল চালকদেরও জরিমানা করছে।

সেলিম বললেন, “আজ আর আমার ঘরে থাকার উপায় ছিল না। আমি ঠিক করে রেখেছি, পুলিশে ধরলে জেলে চলে যেতাম। না হয় বলতাম, আমাকে খাবার দেন, খাবার নিয়ে বাড়ি চলে যাব।”