logo

যোগব্যায়ামের অ-আ-ক-খ

লাবণ্য ভৌমিক | Friday, 2 July 2021


প্রতিদিন কত শত অযুহাতে আমরা নিজেদের শরীরের ক্ষতি করে ফেলছি, সেটা আমরা বুঝতেই পারি না। কারো অফিস যাওয়া, কারো সংসারের ঝামেলা, কারোর আবার পড়াশোনার চাপ, কারোর বয়সের কারণে শরীর নিস্তেজ হয়ে যাওয়া- এমন হাজারো ঝক্কিঝামেলা নিয়েই আমাদের জীবন। কিন্ত তাই বলে কি থেমে থাকলে চলবে? যে শরীরের জন্য আমরা কাজ করে খেয়েপরে বেঁচে আছি, সে শরীরের সুস্থতার জন্য একটুখানি সময় যদি বের করে যত্ন নিতে না পারি, তাতে তো নিজেরই ক্ষতি।

যান্ত্রিকতায় ভরা আমাদের এই জীবনে ব্যস্ততা থাকবেই। বর্তমান সময়ে করোনা মহামারী যেভাবে আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে, যে কারণে বেশিরভাগ মানুষ বাসায় সময় পার করছে। এ সময়টায় তাই যোগব্যায়াম সবারই উপকার সাধন করবে। আমরা যারা ব্যস্ততার বাহানায় শরীরের একটুকুও যত্ন নেইনা তাদের জন্য সহজ সমাধান হলো  যোগব্যায়াম বা যোগাসন।

যোগাব্যায়ামের প্রাথমিক ধারণা

সংস্কৃত ‘যোগ' শব্দটিকে ইংরেজিতে বলে ‘ইয়োগা’ (Yoga)। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে উত্তর ভারতে এ অনুশীলনের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে ভারতীয় সন্ন্যাসীদের দ্বারা ১৮৯০ দশকের শেষদিকে পশ্চিম ভারতে এবং ১৯৭০ দশকের মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোতে এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

আমরা অনেকেই ইয়োগা বা যোগ বলতে শুধু ব্যায়ামকেই বুঝে থাকি। শরীর, মন ও আত্মার ক্রম উন্নয়নের পদ্ধতিকেই বলে যোগ। ভয়েস অফ পিপল-এর তথ্যমতে, এই যোগ বলতে আদির সাথে প্রান্তের যোগ, বৃহতের সাথে ক্ষুদ্রের যোগ, সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার যোগ।

ইমেডিসিনহেলথ ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত সংজ্ঞানুসারে, যোগব্যায়াম হলো একপ্রকার নিয়মিত অনুশীলন, যাতে বিভিন্ন প্রকারের শারীরিক কার্যকলাপ, অঙ্গভঙ্গি (আসন), শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল (প্রাণায়াম), চিত্তবিনোদন ও ধ্যান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

যোগব্যায়ামের উপকারিতা

গবেষকদের একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ১০০ জনের মধ্যে ৯৪ জনই শরীরকে ভালো রাখার জন্য যোগব্যায়াম করে। যোগব্যায়ামের বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা রয়েছে, যা আমাদের শরীরের উপকার করে।

প্রথমত, এটি শরীরের মাংসপেশীগুলোর গঠনে সহায়তা করে ও নমনীয়তা বৃদ্ধি করে। শরীরে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থও দূর করতে সাহায্য করে।

দ্বিতীয়ত, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য সংঘটিত কার্যকলাপগুলো আরো উন্নীত করে, রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সহায়তা করে, যার ফলে আমাদের শরীরে শক্তি সরবরাহ বেশি হয় এবং আমরা কর্মোদ্যমী হয়ে উঠি। সেইসাথে এটি আমাদের হৃৎপিণ্ডকেও ভালো রাখে।

তৃতীয়ত, ‘ভয়েস অফ পিপল’ ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, যোগব্যায়ামের মাধ্যনে শরীর, মন ও আত্মার একত্রীকরণের মাধ্যমে একটি বিষয়ের প্রতি একাগ্রতা আনা যায়, যার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল চিন্তার দক্ষতা বাড়ে। সেইসাথে ধৈর্য শক্তি বৃদ্ধি পায়, মনের চঞ্চলতা ও চাপ কমে।

চতুর্থত, যোগাসন আমাদের পেটের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যেমন- পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্র, যকৃতের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং এর ফলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায় ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।

নতুনদের জন্য

যোগব্যায়ামের জন্য কোনো বয়সসীমা নেই। যেকোনো বয়সের ব্যক্তিই যোগাসন করতে পারেন। তবুও নিজের বয়স ও শরীরের প্রতি নজর রেখে যে ব্যায়ামগুলো আপনার শরীরকে সমর্থন করে, সেগুলোই চর্চা করা উচিত। তাই, যোগব্যায়াম শুরুর আগে যদি সম্ভব হয়, তবে একজন বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত, অন্যথায় হিতে বিপরীত হতে পারে।

কখনোই শরীরের উপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে অথবা শরীরে ব্যথা নিয়ে যোগাসন চর্চা করা ঠিক না। বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চলাকালীন বা গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ব্যায়াম করা উচিত নয়। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া, যারা বর্তমানে কোনো চলমান চিকিৎসাধীন প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন, যেমন- হাড়ের ক্ষয়, চোখের অসুখ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণযোগ্য।

নতুনদের সবসময় উন্নত সকল অঙ্গভঙ্গিসমূহ এবং একটু কঠিন কৌশলগুলো, যেমন- হেডস্ট্যান্ড, পদ্মাসন এবং যেসব কৌশলে অতিরিক্ত জোর দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত।

যোগব্যায়াম অভ্যাসকালে কথা বলা বা অন্যমনস্ক হওয়া ঠিক নয়। কারণ, মনের সঙ্গে দেহের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যোগব্যায়ামের মূলমন্ত্র। একাগ্রতাই অভীষ্ট ফল এনে দিতে পারে। যারা নতুন, তাদের এক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগবে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা

এত কিছু দেখে অবশ্যই আমরা চিন্তা করছি, এত সময় কোথায় এগুলো করার? চিন্তা নেই, সময়ের অভাবে যোগাসন করা থেকে বিরত না থেকে আমরা আমাদের কাজের ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা সময় বের করে যদি অনুশীলন করি, তবে সারাদিন চাঙ্গা থাকা যাবে।

যোগবিজ্ঞানের রীতি অনুসারে, সূর্যোদয়ের দু’ঘণ্টা আগে যখন প্রকৃতি শান্ত, পরিশুদ্ধ থাকে এবং আমাদের পাকস্থলী একদম ফাঁকা থাকে, তখনই যোগাসনের জন্য যথার্থ সময়। যোগাসনের জন্য ম্যাট, মোটা কাপড়, কাঁথা বা কম্বল ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু ম্যাট বা জায়গাটি যেন পিচ্ছিল না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

ঘরের বাইরে বা ভেতরে, উভয় স্থানেই অনুশীলন করা যেতে পারে, তবে পরিবেশটি যেন কোলাহলমুক্ত হয়। খুব বেশি গরম বা ঠাণ্ডা জায়গায় যোগাসন অনুশীলন করা অনুচিত। যোগাসন অনুশীলনের সময় বিশ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি আসনের মধ্যে বিশ্রাম নিতে হবে।

সহজ কিছু যোগাসন এবং উপকারিতা

বালাসন (চাইল্ডজ পোজ)- আমরা মাতৃগর্ভে অবস্থান করার সময় যে ভঙ্গিমায় থাকি, তাকে শিশু আসন বা বালাসন ভঙ্গি বলে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদের জন্য এটি দরকারি একটি ব্যায়াম। তাছাড়াও, এটি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে স্থির করে ও পিঠকে আরাম দেয়। যাদের অতিরিক্ত পিঠে ব্যথা বা হাঁটুর যন্ত্রণা রয়েছে, তাদের অবশ্য এটি এড়িয়ে চলতে হবে।

ভুজঙ্গাসন (কোবরা পোজ)- এটি সমস্ত যোগব্যায়ামে পেছনে বাঁকানো অঙ্গভঙ্গিগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। নাম দেখে বোঝা যায়, এটি হলো সাপের মতো ভঙ্গিমা।

কাঁধ ও ঘাড়ের ব্যাথা উপশম করে, পেটের মাধ্যমে পুরো পিঠ ও কাঁধকে শারীরিক দৃঢ়তা প্রদান করে এই আসন। রক্তসঞ্চালনও উন্নত হয়। ক্লান্তি ও চাপ হ্রাস করে, তাই হাঁপানির মতো শ্বাসকষ্টজনিত রোগগুলির জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।

উল্লিখিত আসনগুলো ছাড়াও নৌকাসন (বোট পোজ), বৃক্ষাসন (ট্রি পোজ), টডাসন (মাউনটেইন পোজ) ইত্যাদি মোটামুটি সহজ ও আয়ত্ত করা যায়, এমন আরো আসন রয়েছে।

বিভিন্ন ধরনের যোগব্যায়াম বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে। এগুলো ব্যক্তি তার চাহিদা, প্রত্যাশা ও শারীরিক তৎপরতার উপর নির্ভর করে বেছে নেয়। যোগব্যায়াম শুধু করলেই হবে না, নিয়ম মেনে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের মাধ্যমে এর ফলাফল পাওয়া যায়। সবধরনের যোগব্যায়ামের জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় এবং সেগুলো মাথায় রেখে, নিজের প্রতি আস্থা নিয়ে এগিয়ে গেলেই শরীর ও মন দুটোই সুস্থ-সবল থাকবে। সেইসাথে সাথে সকল রোগবালাইকে বলে দিতে পারবেন ‘টাটা-বাই বাই’।

লাবণ্য ভৌমিক বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।

labanyabhowmik1777@gmail.com