logo

যে হত্যাকাণ্ড বদলে দিতে পারে জাপানকে

এফই অনলাইন ডেস্ক | Saturday, 9 July 2022


প্রশ্নটা ঘুরছিল বিবিসির টোকিও প্রতিবেদক উইংফিল্ড-হায়েসের মনেও। এর উত্তর তিনি খোঁজার চেষ্টা করেছেন এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে।

তিনি লিখেছেন, সহিংস অপরাধ বলে যে একটা বিষয় আছে, জাপানে থাকতে থাকতে সেটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।  

কিন্তু শুক্রবার যিনি খুন হলেন, তার পরিচয় এই হত্যাকাণ্ডের খবরকে অনেক বেশি চমকে দেওয়ার ক্ষমতা যুগিয়েছে।

শিনজো আবে এখন আর জাপানের প্রধানমন্ত্রী নেই, কিন্তু জাপানে তিনি বিরাট এক ব্যক্তিত্ব, ক্ষমতাধর একজন মানুষ। গত তিন দশকের মধ্যে তাকেই জাপানের সবচেয়ে খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ বলা যায়।

কে তাকে হত্যা করতে চাইতে পারে? আর কেনই বা তা চাইতে পারে?

উইংফিল্ড-হায়েস লিখেছেন, একটি দেশের মানুষকে এতটা ধাক্কা দিতে পেরেছে, তেমন আরেকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কথা মনে করার চেষ্টা করছিলেন তিনি। তখন তার মনে পড়ে ১৯৮৬ সালে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ওলোফ পালমেকে গুলি করে হত্যার ঘটনা।

কিন্তু তাই বলে জাপানে? যদি বলা হয় যে জাপানের মানুষ নৃশংস অপরাধের কথা এখন ভাবতেই পারে না, উইংফিল্ড-হায়েসের ভাষায়, সেটা এক বিন্দু বাড়িয়ে বলা হয় না।

“হ্যাঁ, এখানে ইয়াকুজা নামে ভয়ঙ্কর এক অপরাধী চক্র আছে, তা সত্যি। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষকে এসবের মুখোমুখি হতে হয় না।

“এমনকি ওই ইয়াকুজা গ্যাংয়ের লোকজনও বন্দুক হাতে সামনে আসার সাহস করে না, কারণ জাপানে অবৈধ অস্ত্র রাখার যে জরিমানা, সেটা মেটানোর সামর্থ্য সবার হয় না।”

জাপানে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক হওয়াও সহজ বিষয় নয়। কেউ অস্ত্রের লাইসেন্স চাইলে তার অতীত হতে হবে পরিষ্কার, কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকা যাবে না। বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিতে হবে, মানসিক সুস্থতার পরীক্ষা দিতে হবে। আদ্যোপান্ত যাচাই করে তবেই তাকে লাইসেন্স দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হবে। এমনকি পুলিশ ওই ব্যক্তির প্রতিবেশীদের কাছেও তার বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে পারে।

এসব কারণে জাপানে অগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধ হয় না বললেই চলে। গুলিতে নিহতের ঘটনা জাপানে ১০ বছরে ঘটেছে দশটিরও কম। কেবল ২০১৭ সালে এমন ঘটনা ছিল মোট তিনটি।

কিন্তু যে লোকটা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গুলি করে মারল, তার কথা কী কম গুরুত্ব পাচ্ছে? আর যে অস্ত্রটি তিনি ব্যবহার করেছেন সেটি?

কে এই খুনি? কীভাবে তিনি ওই অস্ত্র পেলেন?

জাপানের সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, ৪১ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি জাপানের নৌবাহিনীতে ছিলেন, তবে সেটা মাত্র বছর তিনেক। যে অস্ত্র তিনি ব্যবহার করেছেন, সেটা বরং বেশি আগ্রহ জাগিয়েছে উইংফিল্ড-হায়েসের।

শিনজো আবেকে গুলি করার পর মাটিতে পড়ে থাকা ওই অস্ত্রের যে ছবি সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাতে সেটা হাতে বানানো একটি অস্ত্র বলেই মনে হয়।

দুটো স্টিলের পাইপ কালো টেপ দিয়ে পাশাপাশি জোড়া লাগানো হয়েছে; মনে হচ্ছে ট্রিগারও হাতে বানানো। যতদূর মনে হয়, ইন্টারনেট থেকে দেখে শিখে বানানো হয়েছে ওই অস্ত্র।

তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? এটা কি কোনো পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড? নাকি বিখ্যাত কাউকে খুন করে কোনো উম্মাদের হঠাৎ বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা?

উইংফিল্ড-হায়েস লিখেছেন, “আমরা আসলে এখনও কিছুই জানি না।”

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড জাপানেও ঘটেছে অতীতে। এর মধ্যে ১৯৬০ সালে সে দেশের সোশালিস্ট পার্টির নেতার ইনেজিরো আসানুমাকে খুনের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল সবাইকে। এক ডানপন্থি ফ্যানাটিক সামুরাই দিয়ে তার পেট ফাঁসিয়ে দিয়েছিল।

উগ্র ডান মতবাদ জাপানে এখনও টিকে আছে। শিনজো আবে নিজে একজন ডানঘেঁষা জাতীয়তাবাদী, সুতরাং ডান সন্ত্রাসের শিকার তার হওয়ার কথা নয়।

উইংফিল্ড-হায়েস লিখেছেন, “গত কয়েক বছরে আরেক ধরনের অপরাধ প্রবণতা এখানে চাঙ্গা হতে দেখেছি আমরা; চুপচাপ, একাকী কোনো পুরুষ হয়ত ভয়ঙ্কর ক্ষোভ থেকে কারো বা কোনো কিছুর ক্ষতির করার চেষ্টা করছে।”

২০১৯ সালে কিয়োটো শহরে একটি জনপ্রিয় অ্যানিমেশন স্টুডিওতে আগুন ধরিয়ে দেন এক ব্যক্তি; ওই ঘটনায় মারা যায় ৩৬ জন।

আগুন লাগানো ওই ব্যক্তি পুলিশের কাছে বলেছিলেন, ওই স্টুডিও তার কাজ চুরি করেছিল; সেই ক্ষোভ মেটাইতেই তিনি আগুন লাগান।

২০০৮ সালের আরেকটি ঘটনায় টোকিওর আকিহাবারা জেলায় ভিড়ের মাঝে ট্রাক চালিয়ে দেয় হতাশাগ্রস্ত এক তরুণ। এরপর ছুরি নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। তাতে সাত জন মারা যান।

ওই আক্রমণের আগে অনলাইনে একটি বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, “আমি আকিহাবারায় মানুষ খুন করব। আমার কোনো বন্ধু নেই। আমাকে অবজ্ঞা করা হয়, কারণ আমি দেখতে কুৎসিত। আমি আস্তাকুঁড়ের চেয়েও পচা।”

উইংফিল্ড-হায়েস লিখেছেন, “আবেকে যিনি খুন করেছেন, তার মানসিক অবস্থা উপরের দুটো ঘটনার মধ্যে কোন ধরনে পড়বে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এই একটি হত্যাকাণ্ড জাপানকে বদলে দেবে বলেই মনে হচ্ছে।”

জাপান যতই নিরাপদ হোক, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখানে অনেকটাই শিথিল। নির্বাচনী প্রচারের সময় রাজনৈতিক নেতারা শিনজো আবের মতই রাস্তার কোনায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন, দোকানি ও পথচারীদের সঙ্গে হাত মেলান।

সে কারণেই আবের হত্যাকারী সহজে তার কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন। আবে পরিণত হয়েছেন তার গুলির সহজ শিকারে।

আবের মৃত্যুর পর এই পরিবেশ বদলাতে বাধ্য।