logo

যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলো খাশোগজির চার হত্যাকারী

এফই ডেস্ক | Wednesday, 23 June 2021


ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক জামাল খাশোগজিকে হত্যায় অংশ নেওয়া সৌদি আরবের চারজন আধাসামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে।

এই বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন এমন ব্যক্তি এবং বিভিন্ন নথিপত্রের বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুমোদনেই ওই ব্যক্তিরা সেখানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

২০১৮ সালের ২ অক্টোবর দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে ইস্তাম্বুলে সৌদি আরবের কনস্যুলেটে গিয়েছিলেন খাশোগজি। সেখান থেকে তিনি আর বের হননি। পরে জানা যায় তাকে কনস্যুলেটের ভেতর হত্যা করা হয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুমোদনেই এই হত্যাকাণ্ড হয় বলে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সৌদি রাজ পরিবারের এক সময়ের ঘনিষ্ঠজন থেকে কড়া সমালোচক হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াশিংটন পোস্টের কলামনিস্ট খাশোগজি। বিশেষ করে নিজের শেষ কয়েকটি কলামে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দেশকে আধুনিক করার নানা উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন তিনি।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, খাশোগজিকে হত্যার এক বছর আগে সৌদি আরবের ওই চার এজেন্টকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে আরাকানসাসভিত্তিক সিকিউরিটি কোম্পানি ‘টায়ার ১ গ্রুপ’। এই কোম্পানির মালিক বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা গ্রুপ সারবেরাস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট।

‘টায়ার ১ গ্রুপের’ পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই প্রশিক্ষণে ‘নিরাপদ লক্ষ্যভেদ’ এবং ‘হামলা মোকাবেলার’ মতো বিষয়গুলোও ছিল। চারজনের প্রশিক্ষণে আত্মরক্ষামূলক এবং সৌদি আরবের নেতাদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে তাতে জোর দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া নজরদারি এবং স্বল্প পরিসরে লড়াইয়ের ওপরও তাদের প্রশিক্ষিত করা হয়।

‘টায়ার ১ গ্রুপের’ মালিক সারবেরাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা লুইস বারমার ওই প্রশিক্ষণে তাদের কোম্পানির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পেন্টাগনের একটি শীর্ষ পদে মনোনয়নের সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের কাছে এই তথ্য জানান তিনি।

বারমার নিউ ইয়র্ক টাইমসকে যে নথিপত্র দিয়েছেন সেখান থেকে জানা যায়, খাশোগজি হত্যায় নিয়োজিত দলটির চার জন ২০১৭ সালে টায়ার ১ গ্রুপের প্রশিক্ষণ নেয় এবং তাদের মধ্যে দুই জন এর আগে ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আরেকটি প্রশিক্ষণ নিয়েছিল একই কোম্পানিতেই।

“তাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এর সঙ্গে তারা যে ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার কোনো যোগসূত্র ছিল না,” বলেন বারমার।

তিনি জানান, টায়ার ১ গ্রুপের ২০১৯ সালের মার্চে একটি পর্যালোচনায় বলা হয়, জামাল খাশোগজির হত্যার সঙ্গে তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কোনো যোগ নেই।”

বারমার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কোনো সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণের অনুমোদনের দায় দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এবং অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে টায়ার ১ গ্রুপের প্রশিক্ষণ নিতে হলে আগ্রহী ব্যক্তিকে সরকারের ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হয়।

২০১৯ সালে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রথম দাবি করা হয়, সাংবাদিক খাশোগজিকে হত্যাকারী দলের চার সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। ওই কলামে বলা হয়, সিআইএ তৎকালীন প্রশাসনকে সতর্ক করেছিল, টায়ার ১ গ্রুপ তাদের নিবন্ধন ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের কোনো প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে, যা সন্দেহজনক।

চার সৌদি নাগরিককে টায়ার ১ গ্রুপে প্রশিক্ষণ নেওয়ার নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়ে তারা অবগত ছিলেন কিনা তা নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে সৌদি দূতাবাসের বক্তব্য জানা যায়নি।

তবে সৌদি আরবে শাসকগোষ্ঠী যে দমন-পীড়ন চালিয়ে আসছিল ‘টায়ার ১ গ্রুপের’ কর্মকর্তারা অথবা এই প্রশিক্ষণের অনুমোদনকারী যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কর্মকর্তারা তা জানতেন- এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।

কিন্তু বাস্তবতা হল- যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ের সামরিক প্রশিক্ষণটি অনুমোদন করা হয়েছে, যে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তারা একজন সাংবাদিককে হত্যার অভিযানে অংশ নিয়েছে। আর এই ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, একটি স্বৈরাচারী শাসনাধীন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, যাদের এজেন্টরা এ ধরনের নিষ্ঠুর মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ করতে পারে।

তাছাড়া এই ঘটনায় এটাও উঠে এসেছে, এমন সরকারগুলোর সঙ্গে এ ধরনের সামরিক অংশীদারিত্বের বিষয়ে ওয়াশিংটনের খুব একটা নজরাদারি নেই। বিশেষ করে যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরেছে, তারা আসলে কী করছে, তাদের ক্ষেত্রে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ২০১৪ সালে প্রথম সৌদি রয়াল গার্ড বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ে ‘টায়ার ১ গ্রুপকে’ অনুমতি দেয়। বারাক ওবামার আমলে শুরু হওয়া ওই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তার উত্তরসূরী ডনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে অন্তত প্রথম এক বছর ছিল।