logo

যার হাতে রচিত মারমা ভাষার প্রথম বই ‘মারমা তইরাংস্বা’

মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Tuesday, 7 June 2022


২০২২ সালের ২৯ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে হয় একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান। চারপাশে বিভিন্ন বইয়ের তো অহরহ মোড়ক উন্মোচন হচ্ছেই। তবে এই বইটি অন্য সব বই থেকে আলাদা। কারণ বইটির ভাষা মারমা। এটিই মারমা ভাষায় লিখিত বাংলাদেশের প্রথম বই, নাম 'মারমা তইরাংস্বা’। লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুথোয়াই মারমা বারাঙ।  তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্যায়ে অধ্যয়নরত।

২৫৬ পৃষ্ঠার এই বইয়ে অধ্যায় আছে মোট ১১ টি। এগুলো হলো – রাজোয়াং - ইতিহাস কী, মারমা - মগ জাতিসত্তা, রাখাইন – মারমা - ম্রাইমা, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাক – ব্রিটিশ - পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস, মারমা ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস, বোমাং ও মং সার্কেলের রাজাদের জীবনবৃত্তান্ত ও ইতিহাস, মারমাদের জীবন - জীবিকা, সামাজিক রীতিনীতি, উৎসব -পার্বণ, লোকসাহিত্য, আধুনিক মারমা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবদান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস।

এই ১১ টি অধ্যায়ের শিরোনামগুলোই বলে দেয় বইটিতে মারমাদের উৎপত্তির ইতিহাস থেকে শুরু করে তাদের বিভিন্ন সময়ের জীবনযাত্রা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অবদানের ব্যাপারগুলো উঠে এসেছে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বেশ লেখা হয়েছে। তবে তাদের নিজেদের ভাষায় হয়েছে কম। ম্রো কিংবা চাকমাদের নিজস্ব ভাষায় বই লেখা হয়েছে এর আগে। তবে মারমাদের নিয়ে তেমন কিছু ছিলো না। এর আগে কবি জাহিদ জগত অং মারমার লেখা 'ওয়েথু' গল্পগ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলেন। তবে সেটি ছিলো বাংলা ভাষায় লেখা বই।

নুথোয়াই বেড়ে উঠেছেন বান্দরবানের গহীনে রোয়াংছড়ির আইজাংপাড়ায়। ছয় ভাই বোনের ভেতর পঞ্চম তিনি। সেখানে মূলত জুম চাষ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই চলত তাদের সংসার। চাষের মৌসুমে বাবা চলে যেতেন দূরের কোন গ্রামে। তারপর ফিরতেন হয়ত দেড়- দুইমাস পর। ততদিনে ফুরিয়ে যেত  ঘরের চাল। অনেকদিন একবেলা খেয়ে আধপেটা হয়েই কেটে গেছে তার দিন।

তবে সেসব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার কাছেই তার মারমা ভাষায় হাতেখড়ি৷ এরপর দুবছরের জন্য তিনি বেছে নেন 'শ্রমণজীবন।' মূলত ধর্মীয় শিক্ষা লাভের জন্য তিনি থাকতে যান রোয়াংছড়ি ক্ষেতবন বৌদ্ধ বিহারে। সেখানে অনাথ শিশুদের জন্য আশ্রম রয়েছে। তাদের সাথে আশ্রমে থেকে চলতে থাকে তার শিক্ষালাভ। সেখানে ঊ. পঞ্চ্যানন্দ মহাথেরোর কাছে মারমা ভাষায় পড়েছেন সূত্র পিটক ও লোকনীতি।

রোয়াংছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি ও বান্দরবন সরকারি কলেজ থেকে ২০১৬ সালে এইচএসসি পাশ করেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বোর্ড বৃত্তিও পেয়েছিলেন এত দুর্গম একটি অঞ্চলে পড়াশুনা করে।

এইচএসসি-র পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় ২০১৮ সালেই ভেবেছিলেন মারমা লোকজ সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে একটি বই লেখা দরকার। তিনি বইমেলায় গিয়ে দেখেছিলেন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে বাংলায় লেখা হয়েছে ও হচ্ছে, কিন্তু তাদের নিজস্ব ভাষায় তেমন কিছু নেই৷ একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান বাহন ভাষা, তাই তিনি ভেবেছিলেন তাদের নিজ ভাষাতে অনাগত প্রজন্মকে জানাবেন নিজেদের কথা।

সে সময় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধে বান্দরবান এসে তিনি কাজ শুরু করেন। এছাড়া অন্য দুটি পার্বত্য জেলা - রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও তিনি গেছেন। এক্ষেত্রে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠজন, শিক্ষকবৃন্দ, ধর্মীয় গুরু ও ভিক্ষু এবং বিভিন্ন সামাজিক - সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহায়তা পেয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সংগঠনে যুক্ত আছেন। এতে করে অনেকের সাথে পরিচয় তৈরি হয়। তাদের সূত্রে তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভালো ধারণা রাখেন এমন বিভিন্নজনের সন্ধান পান। তাদের থেকেও অনেক তথ্য জানতে পারেন।

তবে তখন কাজটি করতে হচ্ছিল অনিয়মিতভাবে। ২০২০ সালের মার্চে কোভিড মহামারির ধাক্কায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে ঘরে ফিরে তিনি বসে থাকেননি। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিন জেলা (বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি) ঘুরে তিনি মারমা জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষের সাথে কথা বলেন। তাদের আদি ইতিহাস, জাতিসত্ত্বা, ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস, অন্যান্য নৃ - গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক - সবকিছু সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য পান তিনি।

তারপর কোভিড এর এই সময়ে সেসব রেকর্ড গুছিয়ে নিয়ে অনুলিখন করতে শুরু করেন। তবে এজন্য কোনো ল্যাপটপও ছিলো না তার। রেকর্ড প্লে করে ফোনেই টাইপ করতেন। এভাবে একসময় মোট ১১ টি অধ্যায়ে পঞ্চাশ হাজার শব্দ জড়ো হলো। সম্পাদনা করে তা এলো চল্লিশ হাজারে।  

তবে এরপর বাধলো বিপত্তি। কোনো প্রকাশনা এই বই নিতে চায়না। কারণ, মারমা ভাষার বৃহৎ পাঠকশ্রেণি নেই৷ ব্যবসায়িকভাবে তাদের নেই লাভবান হবার সম্ভাবনা। তাই প্রকাশক পাচ্ছিলেন না তিনি।  

পরে ঠিক করলেন নিজেই প্রকাশ করবেন বই। ছোট ভাই চিংসাথুই মারমা ও বন্ধু থুইনুমংয়ের কাছ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা ধার করলেন। এছাড়া টংসা প্রোডাকশন দিলো আরো কিছু টাকা। তারপর নীলক্ষেতের এক দোকান থেকে কম্পোজ করে বের করলেন তিনশ কপি বই।

এরপর বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে। নুথোয়াই মারমার শিক্ষক ক্য শে প্রু মারমা খোকা বিষয়টি নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। তিনি মনে করেন তার ছাত্রের এই কাজ মারমা ছেলে - মেয়েদের নিজ ভাষা শিক্ষা ও নিজ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে খুব ভালো ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি তারা আত্মপরিচয় সম্পর্কে সচেতন হবে।

নুথোয়াই অনেক পরিশ্রম করে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে এই বইটি লিখেছেন। তিনি চান আরো এগিয়ে যেতে। মারমা জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে করতে চান আরো কাজ। তাদের সুখ - দুঃখ, সংকট, আশা-নিরাশাকে মলাটবদ্ধ করতে চান নিজেদের ভাষায়। প্রত্যাশা করেন, মারমাদের নিজ ভাষায় শিক্ষালাভের প্রসার ও বহুদূর অগ্রগতির।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন৷

mahmudnewaz939@gmail.com