logo

যত্তসব গান-গল্প!

শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য | Thursday, 1 April 2021


ঝুম বৃষ্টির দিনে হাতে কাজ না থাকলে কী করতে ইচ্ছে করে বলুন তো? মোবাইলের সঙ্গে ইয়ারফোন কানেক্ট করেএই মেঘলা দিনে একলা’  কিংবা তেমন কোনো বৃষ্টির গান চালিয়ে দিয়ে জানালার পাশে বসে থাকতে ইচ্ছে করে না? তেমনি বসন্তের খুব রোদেলা কোনো দিনে ঘর থেকে বেরিয়ে মনের আনন্দে হাঁটতে হাঁটতে হেডফোনেআহা কি আনন্দ আকাশে-বাতাসেকিংবাআহা আজি এ বসন্তেশুনতেও ইচ্ছে হতেই পারে।

বা ধরা যাক, সদ্য প্রেমে পড়েছেন, জন ডেনভারেরঅ্যানিস সংকিংবা নচিকেতারসে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনাশুনে মন অনুভবে মেতে উঠতেই পারে। প্রিয় মানুষটার সঙ্গে ঝগড়া করে মিটমাট করে নেবার পর কবির সুমনেরজাতিস্মর’, কিংবা কারও সঙ্গে বিচ্ছেদের পরের দিনগুলোতে অঞ্জন দত্তেরবৃষ্টি’; কিংবা আরও অনেকরকম পরিবেশে আরও অনেকরকম, অনেক ধাঁচের গান শোনার ইচ্ছে তো হতেই পারে, উপরন্তু যারা গাইতে পারেন, তাদের হয়তো গাইবার ইচ্ছেও হতে পারে। কথা হচ্ছে, কেন? গানই কেন? আজকে আমরা এইকেননিয়েই কথা বলব।

আমরা কেন গান শুনি? গান আমাদের কী কাজে লাগে?

পৃথিবীর অধিকাংশ লোকেই কিন্তু গান শোনে, সবারই কিন্তু নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী আলাদা আলাদা গানের তালিকা আছে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের মতে, নিজ নিজ পছন্দের গানটি শোনার সময় সব মানুষের মস্তিষ্ক একই পদ্ধতিতে সাড়া প্রদান করে। আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের যতগুলো অংশের কথা জানেন, গান শোনার সময় এদের প্রত্যেকটিই একই সঙ্গে সাড়া দিতে শুরু করে। আমাদের মস্তিষ্ক, তথা আমাদের চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম এমনকি মানসিক অবস্থার ওপরও গান কিংবা সুরের একটা স্পষ্ট প্রভাব আছে। সেই প্রভাবটা আসলে ঠিক কী? কিংবা কেমন?

গবেষণা বলে, পছন্দের কোনো গান শোনা বা গাওয়ার ফলে আপনার মস্তিষ্কে কর্টিসল নামক হরমোন নিঃসরণ আস্তে আস্তে কমে আসে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই কর্টিসল হচ্ছে স্ট্রেস হরমোন, যা আপনাকে মানসিক চাপ অনুভব করায়। কর্টিসলের নিঃসরণ কমে যাওয়ার কারণেই পছন্দের গান শুনলে আপনি হালকা বোধ করেন, মানসিক চাপ অনেকখানি কমে যায়। তা ছাড়া গান এন্ডরফিন নামের হরমোনটির নিঃসরণ অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়, যেটি আপনাকে আপনার মানসিক বেদনার সঙ্গে যুঝতে সহায়তা করে। পছন্দের গান আপনার মস্তিষ্কে ডোপামিনের উৎপাদন অনেকটুকু বাড়িয়ে দেয়। এই ডোপামিনকে বলা যায় আমাদের মস্তিষ্কে থাকা মোটিভেশনাল রাসায়নিক। অনেক আনন্দের সময় এই ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটে বলে আমাদের মধ্যে ভালো-লাগার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, এবং ঠিক এই ব্যাপারটিই গান শোনার সময়ও ঘটে। তা ছাড়া, আপনি যখন পছন্দের গান শুনছেন, আপনার মস্তিষ্কে তখন বেশ ভালো পরিমাণে অক্সিটোসিন উৎপন্ন হচ্ছে, যা আপনার নৈতিকতার উন্নতি ঘটায়, এবং একই সঙ্গে আপনাকে অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষ হতে সাহায্য করে। সম্ভবত এ জন্যই আমাদের সমাজেযে গান ভালোবাসে, সে কাউকে হত্যা করতে পারে না” ধরনের প্রবাদ প্রচলিত আছে।

গানের আরও উপকারিতা আছে

পছন্দের গান আপনার মনোযোগ বাড়ায়, একই সঙ্গে আপনার কর্মক্ষমতা, সৃজনশীলতাও বাড়ে পাল্লা দিয়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের সময় যারা নিজের ইচ্ছামতো গান শোনার সুযোগ পান, তারা অন্যদের চেয়ে অনেকগুণ বেশি নির্ভুল এবং সৃজনশীলভাবে কাজ শেষ করতে পারেন, অবশ্যই অপেক্ষাকৃত কম সময়ে। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থেকে কোনো কাজ করার সময়ও গান অনেক সাহায্য করতে পারে।

অনেক ডাক্তারই অপারেশন করার সময় নিজের পছন্দের কোনো একটি কোমল গান বাজাতে পছন্দ করেন, তাতে একটু চাপমুক্ত অবস্থায় অপারেশনটা করা যায়। তা ছাড়া একঘেয়ে, কিংবা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ, অথবা কঠিন কোনো শারীরিক কাজ করার সময় হাই-বিটের কোনো গান বেশ ভালো কাজে দেয়। তা ছাড়া এমনিতেও উচ্চ-বিটের গানগুলো আমাদের উৎফুল্ল এবং কর্মক্ষম রাখতে খুব সাহায্য করে।

আবার অনেকেই ভাবেন, দুঃখের গানগুলো আমাদের ভুল রাস্তায় নিয়ে যায়, প্রচণ্ড দুঃখের মধ্যে দুঃখের গান শোনা মানুষকে আরও কষ্টের মধ্যে ঠেলে দেয়। এই ধারণাটি একেবারেই ঠিক নয়। কারও খুব কাছের কেউ অসুস্থ, কিংবা মৃত, কিংবা তার প্রিয়জনের সঙ্গে সদ্যই বিচ্ছেদ হয়েছে, এমনঃ সময়গুলোতে তার অযথা হাই-বিটের খুশির গান শোনার চেয়ে দুঃখের গানগুলোই শোনা উচিত। এর অনেকগুলো উপকারিতা আছে। যেমন ধরুন, দুঃখের গান আপনাকে নস্টালজিক করবে, পুরোনো সুখ-দুঃখের স্মৃতিগুলো অন্তত একবার হলেও মনে পড়বে, যেটা শেষমেশ একটু হলেও শান্তি দেবে।

যখন মনের ভেতরটা গুমোট হয়ে আসে, চাইলেও কাঁদতে পারেন না, তখন দুঃখের গান শুনলে আপনার মস্তিষ্কে প্রোলাকটিন নামক হরমোন নিঃসরিত হবে, যেটা আপনাকে কিছুক্ষণ ইচ্ছেমতো কান্না করতে সাহায্য করবে। তা ছাড়া, দুঃখে থাকা অবস্থায় দুঃখের গান শুনলে সেই গানের সুর, কথা কিংবা গায়কের গলার আবেগ, সবকিছুর সাথেই আপনি নিজের একটা যোগাযোগ খুঁজে পাবেন, যা আপনার নিজের মনের মধ্যেই নিজের প্রতি সান্ত্বনার কাজ করবে।

তাই বলে যে সব সময় দুঃখের গানই শুনতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আমরা দুঃখের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের গান শুনব, খুশির গান শুনব, রৌদ্রের গান, বৃষ্টির গান, বসন্তের গান, পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্রের গান, সব রকম গানই শুনব। গান নানা রোগের ওষুধ হিসেবেও কাজ করে। দুশ্চিন্তা বলুন, হতাশা বলুন কিংবা মানসিক চাপ বলুন; গান শুনলে এসবের উপশম হয় তো বটেই, নানারকম জটিল অসুখেও গান খুব ভালো ওষুধের কাজ করে। পক্ষাঘাত, অটিজম, আলঝেইমার, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায়ও গানের ব্যবহার প্রচলিত। বিশেষত, আলঝেইমার ডিজিজে গান যেন এক মিরাকলের কাজ করে।

যে লোকটা আলঝেইমার পড়ে সব ভুলে গেছে, অতীত জীবনের কোনো কথা যার মনে নেই, সে কথা বলতেও ভুলে গেছে, কাউকে চিনতেও পারে না, তার কানেও হেডফোন লাগিয়ে পছন্দের গান চালিয়ে দিলে একটু পর দেখা যায় সে নিজে নিজেই গুণগুণ করে উঠছে। কী ঐশ্বরিক শক্তি এই গানের!

তবে গান উল্টোদিকে মাঝেমধ্যে ক্ষতির কারণও হতে পারে বৈকি! গানের উপকারিতা নিয়ে বলার সময় একটাটার্ম’ গোটা লেখাটা জুড়েই ব্যবহার করা হয়েছে-‘পছন্দের গান’। এখন কথা হচ্ছে, সবার পছন্দ তো এক নয়। কাজেই জোর করে আপনার পছন্দের গান অন্যজনকে শোনাতে যাওয়াটা কাম্য নয়। জোর করে অপছন্দের গান শুনলে নানা সমস্যায়ই পড়তে হতে পারে, অমনোযোগিতা, বিক্ষিপ্ত মন, কাজে বেশি সময় লাগা, চট করে কিছু মাথায় না ঢোকা ইত্যাদি। অতএব, গানের সুফল পেতে চাইলে নিজের পছন্দের গানটিই শুনুন, অন্যেরটা নয়।

গান সম্ভবত মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন আর সবচেয়ে ধ্রুব ব্যাপারগুলোর একটি। সেই কবে কোনো এক প্রাচীন পৃথিবীতে আমাদের কোনো এক নেংটি পরা পূর্বপুরুষ সুরেলা গলায় কিছু একটা বলে উঠেছিল, সেই তখন থেকে গানের যাত্রা শুরু। গান আজকে আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী, সারা দিন কায়িক বা মানসিক পরিশ্রম করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার পর ইয়ারফোন বেয়ে কানে একটু গান না ঢুকলে দিনটা যেন ঠিকশেষ হয়েও হইলো না শেষ’ ধরনের হয়ে যায়। গান-মানুষের এই বন্ধুত্ব অগ্রাহ্য করার মতো নয় কিন্তু! এই বন্ধুত্ব-ভরসার জায়গাটা সব সময়ই থাকুক, দিন শেষে গানই হয়ে থাকুক শান্তির জায়গা, প্লেলিস্টই হয়ে থাকুক নিজের আপন ঘর।

শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

ইমেইল :shuvodipbiswasturja1999@gmail.com