জাবি অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি
মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে চলা একঝাঁক তরুণ
হাসান সজিব | Tuesday, 1 March 2022
‘আহা! মুক্ত বিহঙ্গের মতো যদি উড়ে যেতে পারতাম ওই সুউচ্চ সাকা হাফং-এর চূড়ায়, জোয়ারভাটায় বারবার ডুবে যাওয়া শ্বাসমূল আর সুন্দরী-গেওয়ার দর্শন পেতাম কিংবা বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির উপর শুভ্র গাঙচিলের মত ডানা মেলে দিতে পারতাম।’- অবসর পেলেই এমন ভাবনায় পুলকিত হয়ে ওঠে ভ্রমণপিয়াসীদের মন।
ভ্রমণপিপাসুদের ভ্রমণস্পৃহায় দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে ভ্রমণ। তবে ভালো একদল ভ্রমণসঙ্গীর অভাব সবসময়ই অনুভব করেন ভ্রমণকারীরা। এজন্য গড়ে উঠছে ভ্রমণ বিষয়ক বিভিন্ন গ্রুপ, সংগঠন ও ক্লাব। এমন একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক ভ্রমণপিপাসুদের সংগঠন হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি।
‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিভিত্তিক সংগঠন আছে শতাধিক। বিতর্ক, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রাচুর্যে ভাটা ছিল শুধু ভ্রমণ বিষয়ক কোনো সংগঠনের। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী মিলে চিন্তা করলেন ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য একটা ক্লাব করলে কেমন হয়?
‘ধরো তক্তা, মারো পেরেক’ - সময়ক্ষেপণ না করে সাঈদুর রহমান সাঈদ, তন্ময় দেবনাথ, জাহিদ হাসান সজীব, কুদরত-ই-এলাহী মিলে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি’ (জেইউএএস)। বর্তমানে ৬৪ জন সদস্য রয়েছে ক্লাবটিতে।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ক্লাবের সদস্যরা দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় ভ্রমণ অ্যাডভেঞ্চারমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে।
ইতোমধ্যে সরকারিভাবে স্বীকৃত দেশের সর্বোচ্চ চূড়া তাজিংডং সামিট করেছে ক্লাবের সদস্যরা। পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া জোতলাং, চতুর্থ সর্বোচ্চ চূড়া যোগী হাফং, পঞ্চম সর্বোচ্চ চূড়া কেওক্রাডংয়েও পা রেখেছে এই ক্লাবের সদস্যরা।
সর্বশেষ ফেব্রুয়ারী মাসেই ক্লাব থেকে ১০ জন সদস্য বান্দরবানে অবস্থিত বাংলাদেশের বেসরকারিভাবে স্বীকৃত সর্বোচ্চ চূড়া সাকা হাফং সামিট সম্পন্ন করেছে। পর্বতশৃঙ্গ জয় করা যেন এই অভিযাত্রীক দলের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।
সেপ্টেম্বর ২০২০, বান্দরবানের জোতলাং সামিটে লাল-সবুজ পতাকা হাতে অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটির সদস্যরা
বিভিন্ন সময়ে তারা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ির পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন ঝর্নাধারা খুঁজে বেরিয়েছে। তরুণদের জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য বান্দরবানের খুমের রাজ্যে (আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম, নাইক্ষ্যংমুখ) একাধিক বার পদচিহ্ন এঁকেছে ক্লাবের সদস্যরা।
ভরা পূর্নিমাতে দুধ-সাদা আলোয় ট্রেকিং করে নাফাখুমের বিস্তৃত জলপ্রপাতের পাড়ে বসে জ্যোৎস্না উপভোগ করার মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও আছে তাদের।
রাঙ্গামাটির গহীনে ঝর্নার খোঁজে ক্লাবের কয়েকজন সদস্য
পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। সেন্টমার্টিন, সোনাদিয়া, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, চর কুকরিমুকড়ি, মনপুরা, মারায়ং তং ইত্যাদি দ্বীপ ও চরাঞ্চলে ক্যাম্পিংয়ের আয়োজন করেছে ক্লাবটি।
বিলাইছড়ি-কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি, সোনাইছড়ি, হরিণমারা-হাটুভাঙ্গা ট্রেইল, রেমা-কালেঙ্গা, হামহাম, শ্রীমঙ্গল, বড় কমলদহ ট্রেইল ও আলীকদমসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ভ্রমণগন্তব্যে কদম ফেলেছে ক্লাবের সদস্যরা।
.jpg)
জনশূন্য আস্ত সোনাদিয়া দ্বীপের মালিক বনে গিয়েছিল সেদিন
ক্লাবটিকে ক্যাম্পাসভিত্তিক স্রেফ ভ্রমণবিষয়ক একটি সংগঠন বলা যেতে পারতো; তবে পরবর্তীতে রানিং, ম্যারাথন, অফরুট সাইক্লিংসহ নানা স্পোর্টস ইভেন্টসমূহের আয়োজন ক্লাবটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
২০২০ সালে ক্লাবটি অ্যাডভেঞ্চার ফেস্টের আয়োজন করে। ফেস্টের অংশ হিসেবে 'বঙ্গবন্ধু ম্যারাথন’ শীর্ষক মিনি ম্যারাথন, ট্রেজার হান্ট প্রতিযোগিতা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও ট্রাভেলিং গিয়ারস বিতরণ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়।
বঙ্গবন্ধু ম্যারাথন ২০২০ এর আয়োজন করে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি
সদস্যদের সরব অংশগ্রহণে নানারকম অ্যাডভেঞ্চারমূলক কর্মকাণ্ড যেমন ট্রেকিং, হাইকিং, ক্যাম্পিং, ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার নানারকম কর্মমুখী শিক্ষা ও উৎসাহ প্রদান করে ক্লাবটি। এছাড়া তরুণদের স্বাস্থ্য ও কারিগরি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে ফটোগ্রাফি, সাঁতার প্রশিক্ষণ, যোগব্যায়াম ইত্যাদির আয়োজন করে আসছে ক্লাবটি।
ক্লাবটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুঃসাহসী সব কর্মকান্ডে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। “চাঁদে যাও কিন্তু মাগরিবের আজানের আগে ফিরে এসো’ - এমন মানসিকতাকে একরকম বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নাফাখুমে জ্যোৎস্না দেখতে যাওয়া, কিংবা ভোলার কোনো দ্বীপে ক্যাম্পিংয়ে অংশগ্রহণ কোনো বড় ব্যাপার নয় তাদের কাছে।
নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে যেখানে অনেকেই ভ্রমণে আগ্রহী হন না; সেখানে ক্লাবের নারী সদস্যরা জয় করে চলেছেন দেশের সর্বোচ্চ সব পর্বতশৃঙ্গ। বর্তমানে সংগঠনটিতে ২১ জন নারী সদস্য রয়েছে। তাদের আত্মরক্ষার জন্য কারাতে বা তাইকোয়ান্দো শেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে ক্লাবটির।
দেশের সর্বোচ্চ চূড়া সাকা হাফং-এ
ক্লাবের সদস্য সুমাইয়া সাদিয়া ভাবনা বলেন, “একটা সময় ছিল যখন মেয়েদের পক্ষে দুর্গম অঞ্চলে ভ্রমণ করা একপ্রকার অসম্ভবই ছিল। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। জেইউএএস একটি সময়োপযোগী ক্লাব। ভ্রমণপিপাসু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এটি একটি বড় প্ল্যাটফর্ম।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ১৮ নং কক্ষ থেকে অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান সজীব ক্লাবের সভাপতি এবং ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এথেনা দাস সৃষ্টি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভ্রমণের ক্ষেত্রে একটি বিশ্বস্ত প্লাটফর্ম, ভ্রমণ ও অ্যাডভেঞ্চার বিষয়ক নানা অভিজ্ঞতা শেয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন গন্তব্যের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা, ভ্রমণকে সহজ ও আনন্দদায়ক করা এবং নানারকম স্পোর্টস ইভেন্টে যুক্ত থেকে তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে তরতাজা রাখার উদ্দেশ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে এই দুরন্ত তরুণ দল।
হাসান সজীব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৩য় বর্ষে অধ্যয়নরত।
sojib.mhs@gmail.com