মানসিক শান্তিতে ‘মেডিটেশন’
তৌসিফা ফারহাত | Friday, 9 July 2021
লকডাউনে ঘরে থাকতে থাকতে আপনাকে মানসিক অবসন্নতায় গ্রাস করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’- এর ঝক্কি, তাই কাজের চাপ কমেনি, বরং কমেছে মানসিক প্রশান্তির সুযোগ। এমন এক দমবন্ধ অবসন্ন পরিস্থিতিতে মেডিটেশন হতে পারে আপনার পরম বন্ধু, যা আপনার ক্লান্তি, অবসাদ দূর করে মনকে করবে চিন্তামুক্ত, প্রসন্ন আর ফুরফুরে।
মেডিটেশন বা ধ্যানের উৎপত্তি হয়েছিল কিন্তু আমাদের ভারত উপমহাদেশ থেকে। সর্বপ্রথম ধ্যানচর্চার কথা উল্লেখ করা হয় প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদে। তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উপমহাদেশের মানুষের সুস্থ জীবনযাপনে ধ্যানচর্চা একটা বড় জায়গা নিয়ে আছে। আধুনিক জীবনে কাজের অতিরিক্ত চাপ, অবসাদ, ক্লান্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শারীরিক আর মানসিক সমস্যা সমাধানে এ প্রক্রিয়ার ভূমিকা অতুলনীয়।
মেডিটেশনের এহেন ইতিবাচক ভূমিকার পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। এটি মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী, কেননা ধ্যানের সময় আমরা চোখ বন্ধ করে রাখি বলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র তখন বিশ্রামে থাকে; যা পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের অক্সিজেন প্রবাহের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সাথে সাথে দেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্তের প্রবাহও বেড়ে যায়, যা স্ট্রেস হরমোন– কর্টিসল ও গ্লুকাগনের নিঃসরণ কমিয়ে দেহ ও মনকে অবসাদমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
ক্লান্তি বা অবসাদ কমানো ছাড়াও মেডিটেশনের রয়েছে আরো কিছু দুর্দান্ত উপকারিতা। মেডিটেশন স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের নিঃসরণ কমিয়ে দেয় বলে অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে এর জুড়ি মেলা ভার। মায়ো ক্লিনিকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, একটানা আট সপ্তাহের ‘মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন’ জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অ্যাংজাইটি কমাতে লক্ষণীয় ভূমিকা রেখেছে। সেইসাথে তাদের আত্মবিশ্বাস আর নতুন ও প্রতিকূল পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও বেড়েছে। মেডিটেশন চর্চা মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও অনেকটাই ফলপ্রসূ।
ধ্যানের ধরন ও নিয়মকানুন
‘ফোকাসড-অ্যাটেনশন’ নামের এক বিশেষ ধরনের মেডিটেশন দীর্ঘ সময় কোনো বিষয়ে আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত ১৩ মিনিটের যোগব্যায়াম মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাকে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত মেডিটেশন মানুষের স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণেও সহায়তা করে, এজন্য আজকাল ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে নিয়মিত মেডিটেশনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন অনেক চিকিৎসক। এতসব সুফলের কারণেই বর্তমানে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে এর কদর বেড়েই চলেছে। তবে এই মেডিটেশন বা ধ্যান করার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন। এ পদ্ধতি থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে চাইলে এগুলো মাথায় রাখা আবশ্যক।
মেডিটেশন আসলে নানা ধরনের হয়ে থাকে, আর প্রত্যেক ধরনের জন্য নিয়মকানুনও আলাদা। যেমন- পশ্চিমা দেশগুলোতে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন’, যা দৈনন্দিন জীবনের দুশ্চিন্তা আর অবসাদ কমানোর জন্য খুবই কার্যকরী। এ ধরনের মেডিটেশনের জন্য ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই, আর প্রশিক্ষক ছাড়াও যে-কেউ এই মেডিটেশন করতে পারে বলেই এর জনপ্রিয়তা এত বেশি বলে ধারণা করা হয়।
ধর্মীয় তত্ত্বজ্ঞান বা স্পিরিচুয়ালিটির বিকাশে হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মে ‘স্পিরিচুয়াল মেডিটেশন’কে দেওয়া হয়েছে বিশেষ স্থান। এ ধরনের মেডিটেশন অনেকটা ধর্মীয় প্রার্থনার মতোই, সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করে দেহমনের প্রশান্তির জন্যই সাধারণ লোকজন এ ধরনের ধ্যানচর্চায় ব্রতী হন।
‘ফোকাস মেডিটেশন’সাধারণত মনোযোগ বৃদ্ধির জন্য করা হয়ে থাকে, পঞ্চেন্দ্রিয়ের যেকোনো একটিকে ব্যবহার করে মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করাই এ ধরনের ধ্যানের মূল উদ্দেশ্য।
‘লাভিং কাইন্ডনেস’ হচ্ছে মেডিটেশনের আরেকটি ধরন, যেখানে নিজের ওপর কঠোর না হয়ে নিজের ও অন্যের ভুলগুলোকে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখা, চারপাশের সবকিছুর প্রতি দয়ার্দ্র হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়।
শুরুর ধাপে ধ্যান
এভাবে মেডিটেশনের নানা ধরন, মানবজীবনের নানা সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে শরীর ও মনের যত্ন নিতে আপনিও নিজের পছন্দসই মেডিটেশন বা ধ্যানচর্চা শুরু করতে পারেন আজ থেকেই। প্রথম প্রথম মনোযোগ ধরে রাখতে না পারলেও ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই, অভ্যাসের সাথে সাথে আস্তে আস্তে আপনি হয়ে উঠবেন দক্ষ।
চাইলে নিতে পারেন ইউটিউবের সহায়তা, সেখানে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন প্রচুর মেডিটেশন উপযোগী সঙ্গীত, গাইডেড মেডিটেশন মিউজিক ট্র্যাক। এছাড়া বাজারে গেলেই মিলবে মেডিটেশন নিয়ে রকমারি বইয়ের সমাহার। চাইলে ঢুঁ মারতে পারেন কোয়ান্টাম মেথড, ইনসাইট টাইমার, হেড স্পেস, স্মাইলিং মাইন্ড প্রভৃতি ওয়েবসাইটে, সেখানেও আপনি পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দের মেডিটেশন কীভাবে করা যায়, সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা।
আর এর পরেও ধ্যানে মনোযোগী হতে না পারলে আপনি নিতে পারেন মেডিটেশন প্রশিক্ষকের সরাসরি সহায়তা। বাংলাদেশে কোয়ান্টাম মেথড অর্গানাইজেশন, ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় মেডিটেশন ও যোগব্যায়াম চর্চার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নিয়মিতভাবে। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো একটি থেকে করে নিতে পারেন মেডিটেশনের শর্ট কোর্স।
তৌসিফা ফারহাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এম এ শিক্ষার্থী। tousifa1995@gmail.com