মানসিক চাপ থেকে মুক্তির ১০টি উপায়
মোঃ ইমরান খান | Sunday, 6 June 2021
অতিরিক্ত কাজ ও দুশ্চিন্তার ফলে মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের জন্ম হয়। জীবন হারায় তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য।একজন সদা প্রাণবন্ত মানুষের মুখও হয়ে যায় মলিন। তাই মানসিকভাবে চাপমুক্ত থাকা জীবন উপভোগের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই স্ট্রেস কমানোর জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে পারি। আজকের লেখায় আলাপ হবে এমনই কিছু সহজ কাজ নিয়ে, যার মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে চাপমুক্তি হবে।
১. রুবিকস কিউব মেলানো
মানসিক চাপের সময় রুবিকস কিউব বেশ উপকারী। রুবিকস কিউব আপনার মনযোগ অন্য দিকে ধাবিত করে। রুবিকস কিউব মেলানোর চেষ্টা শুরু করলে সবগুলো রঙ মেলানোর আগে থামতে পারবেন না যেন। এতে করে অনেকটা সময় আপনার রুবিকস কিউব মেলানোর চিন্তাতেই ব্যয় হয়ে যায়। ইতোমধ্যে মানসিক চাপও ধীরে ধীরে কমে আসে।
২. বাবল র্যাপ ফোটানো
আমরা ছোটবেলায় টিভি, রেফ্রিজারেটর বা যেকোনো ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি কেনার সময়, সাথে ফুটন্ত পানির বুদবুদের মতো একটি মোড়ক লক্ষ করেছি। সাধারণত এই মোড়কটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলোকে সুরক্ষা করার জন্য দেওয়া হতো। আমরা অনেকেই শৈশবে এই মোড়কগুলো ফুটিয়ে আনন্দ পেতাম। আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে, এই কাজটি স্ট্রেস দূর করার জন্য অনেক কার্যকর।
কাজের চাপে বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা হলে হাতের কাছে এই বাবলগুলো ফোটাতে পারেন। এতে করে স্ট্রেস অনেকাংশে কমে যাবে।
৩. গেম খেলা
বিভিন্ন ধরনের খেলা রয়েছে, যা আপনার স্ট্রেস দূর করতে সহায়তা করবে। খেলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্ককে ভিন্নদিকে ধাবিত করা। তাই খেলার মাধ্যমে স্ট্রেস দূর করা সম্ভব।
বিভিন্ন ধরনের খেলা যেমন: ক্যান্ডি ক্রাশ, টেম্পল রান ও সাবওয়ে সার্ফার ইত্যাদি গেম রয়েছে, যা খেললে মনযোগ ভিন্ন দিকে ধাবিত হবে।
তাছাড়া প্লে স্টেশন বা কম্পিউটারে খেলার মতো বিভিন্ন গেইম রয়েছে। এসব গেইমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অ্যাসাসিনস ক্রিড, গড অব ওয়ার, নিড ফোর স্পিড। এই গেইম গুলো খেলেও স্ট্রেস দূর করা সম্ভব। তবে সবসময় খেয়াল রাখতে হবে, গেম খেলার সময়টুকু যেন অতি পরিমিত হয়। নয়তো আসক্তির জন্ম হতে পারে। একটি সমাধান অন্য আরেকটি সমস্যার জন্ম দিক, তা একেবারেই কাম্য নয়।
৪. বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা
গাছ লাগানো এবং গাছের যত্ন নেয়ার রয়েছে নানাবিধ স্বাস্থ্য উপকারিতা। প্রথমত, এ কাজ করলে মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে। বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হবার ঝুঁকিও কমে আসে। তাই এমনিতেই কিছু রোগ নিয়ে দুশ্চিন্তা কমে যায়। দ্বিতীয়ত, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে মনে প্রশান্তি বিরাজ করে। মন প্রফুল্ল থাকে, কাজে উদ্যম ফিরে আসে। এতে করে মানুষ বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
৫. মেডিটেশন বা ধ্যান
মেডিটেশন বা ধ্যান, স্ট্রেস দূরীকরণের অন্যতম একটি উপায়। মায়ো ক্লিনিকের কর্মকর্তার মতে, মেডিটেশন করতে বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় না, বরং খুব সহজেই করা যায়। বাসে কিংবা ট্রেনে অথবা কোথাও অপেক্ষারত অবস্থায় অল্প কিছু সময়ের মেডিটেশন আপনার স্ট্রেস দূর করার ক্ষেত্রে দারুণ ফল বয়ে আনবে।
মেডিটেশনের ফলে উদ্বিগ্নতা কমে যায়, ঘুম ভালো হয়। রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে আসে, মস্তিষ্ক শান্ত হয় এবং সর্বোপরি- মানসিক চাপ কম হয়।
৬. শখের কাজ
প্রতিটি মানুষের কিছু না কিছু শখের কাজ থাকে। যেমন: ছবি আঁকা, গান গাওয়া, রেওয়াজ করা, বাগান করা, নকশা করা ইত্যাদি। ব্যস্ত জীবনে প্রায়ই আমরা নিজেকে বা নিজের শখকে সময় দিতে ভুলে যাই। তবে এসব শখ মাঝেমধ্যে পূরণ করা উচিত। এ কাজে দিনের কিছুটা সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখলে দুশ্চিন্তা আর উদ্বিগ্নতা মনে বাসা বাঁধতে পারে না। ফলে মানসিক চাপ কমে যায়। তাছাড়া আপনি যখন আপনার শখের কাজটি করে শেষ করবেন, তখন মনে আপনা থেকেই আনন্দ আসবে। এই আনন্দই মানসিক চাপ দূর করার জন্য যথার্থ ভূমিকা রাখবে।
৭. গান শোনা
মানসিক চাপ হ্রাস এবং মন-মস্তিষ্কের ভালো থাকার রয়েছে একে অপরের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। তাই মন ও মস্তিষ্কের শান্ত থাকা একটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। সঙ্গীত এক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। বৃষ্টির শব্দ, পাখির কিচিরমিচির, রাবাব, বাঁশি বা দফের সুর ইত্যাদি মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। ইউটিউবে বিভিন্ন ধরনের ‘রিলাক্সিং মিউজিক’ রেকর্ড করা রয়েছে, এগুলো শোনা যেতে পারে।
৮. মুভি-সিরিজ দেখা
বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সিনেমার জুড়ি নেই। কিছু অনুপ্রেরণাধর্মী সিনেমা এক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। ‘পারস্যুইট অফ হ্যাপিনেস’, ‘ফরেস্ট গাম্প’, ‘ট্রুম্যান শো’, ‘শশাঙ্ক রিডেম্পশন’- এধরনের সিনেমাগুলো অনুপ্রেরণা দেয়। জীবন সম্পর্কে ভালো ধারণা সৃষ্টি হয়। আবার হাস্যরস সমৃদ্ধ ক্মেডি সিনেমাও মানসিক চাপ কমানোর জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। চার্লি চ্যাপলিনের স্যাটায়ারধর্মী সিনেমা, ‘হোম অ্যালোন’ বা ‘বেবিজ ডে আউট’-এর মতো সিনেমা; আবার ‘মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো সিরিজ সময় কাটানোর পাশাপাশি স্ট্রেস দূর করতেও সহায়তা করবে।
৯. ঘর গোছানো
একটি সাজানো-গোছানো ঘর আপনার মানসিক অবস্থা তুলে ধরতে পারে, শুধু অন্যের কাছে নয়, নিজের কাছেও। মূলত, অনেক দিন ধরে ঘরের সাজসজ্জায় পরিবর্তন না আনলে সব কিছুতে একঘেয়ে ভাব চলে আসে। এর উপর দৈনন্দিন জীবনের চড়াই-উৎরাই মানুষকে আরো বেশি বিব্রত ও বিরক্ত করে তোলে। এতে করে মানসিক চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই এরকম অবস্থার পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
ধরুন, আপনার কাজ করার টেবিলে বইপত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস গোছানো নেই। আপনি যখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন বা খুব চাপে আছেন বলে অনুভব করেন, তখন এই অগোছালো জায়গাটি গুছিয়ে নিতে পারেন। এতে করে তিনটি উপকার হবে। মনোযোগ পরিবর্তন হবে, অগোছালো জায়গা গোছানো হবে, এবং কাজটি করার পর মনে হবে, আপনি একটি ‘কাজের কাজ’ করেছেন। আর কে না জানে, আত্মতুষ্টির এক ডোজ মানসিক চাপ কমাতে বেশ সহায়ক! এতে করে নতুন ও পুরনো সব ধরনের কাজেই মনোযোগ বসবে।
১০. ডায়েরি পড়া
যাদের ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে, তারা নিজের ডায়েরি পড়ার মাধ্যমে স্ট্রেস দূর করতে পারবেন। ডায়েরিতে আমরা সাধারণত অতীতের কথা পাই। যেমন: বিশেষ কোনো ঘটনা বা স্কুলের শেষ দিনে শিক্ষক বা বন্ধুদের লেখা বিভিন্ন কথা ইত্যাদি। এসব লেখা পড়লে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়। ফলে স্ট্রেস দূর হয়।
তাছাড়া, অনেকে অতীতের ব্যর্থতার কথাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখেন। বর্তমানে কেউ যদি স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যান, তাহলে পূর্বের বাজে সময় পাড়ি দিয়ে কীভাবে বর্তমান পর্যন্ত এসেছেন- ডায়েরিতে এসব পড়ে নিজেকে উৎসাহিত করতে পারেন।
দিনভর অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমরা কতটুকু সফল বা ব্যর্থ, এটি হিসেব করে অযথাই মানসিক চাপ বাড়িয়ে ফেলি। তাই নিজের প্রতি যত্ন নিতে হবে। মানসিক চাপ এড়ানো সম্ভব নয়, তবে নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি আমাদের হাতেই আছে।
মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। ইমেইল—mohd.imranasifkhan@gmail.com