logo

মানবিক কারণেই এবার ইউক্রেইনের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

Friday, 25 March 2022


কোনো চাপের মুখে নয়, মানবিক কারণেই বাংলাদেশ এবার জাতিসংঘে ইউক্রেইনের তোলা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

শুক্রবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এই প্রস্তাবে মানবিক কারণে নির্যাতিত ও আহতদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। যেহেতু আমরা চাই, নির্যাতিত লোকের মঙ্গল হোক। সেই কারণে আমরা এই প্রস্তাবে ইয়েস করেছি।”

মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ডের সফরের আলোচনা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মুখে এই সিদ্ধান্ত কি-না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “না, ওর জন্য হয় নাই।” খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

এ প্রসঙ্গে মোমেনের ভাষ্য, “চাপতো আমাদের কাছে অনেক আছে। কিন্তু চাপে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কখনও ভ্রুক্ষেপ করেন না, এটা আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে, তিনি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর মেয়ে।

“বাংলাদেশের মঙ্গলের জন্য যা যা করার, তিনি তাই করেন। কোনো চাপের বশবর্তী হয়ে শেখ হাসিনা কাজ করে না। আপনারা নানা রকম চিন্তা, হইচই করেন। এগুলো অলীক। শেখ হাসিনা কোনো চাপের মুখে এগুলো দেন নাই। কারণ তিনি তার নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

ইউক্রেইনে রাশিয়ার হামলার কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকটের অবসানে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রমের সুযোগ দিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বৃহস্পতিবার একটি প্রস্তাব পাস হয়।

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের বিশেষ জরুরি অধিবেশনে ইউক্রেইনের তোলা ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১৪০ দেশ।

এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেইনে আগ্রাসনের কারণে রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে সাধারণ পরিষদে আরেকটি প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিল বাংলাদেশ। তবে এবার ইউক্রেইনের মানবিক সঙ্কট অবসানের দাবির পক্ষে ভোট দিয়েছে বাংলাদেশও।

বৃহস্পতিবারের প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়া সাথে পেয়েছে বেলারুশ, ইরিত্রিয়া, উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়াকে। গত মাসের প্রস্তাবেরও বিপক্ষে ছিল এই পাঁচ দেশের অবস্থান।

ভারত, চীন ও পাকিস্তান আগের মত এবারও প্রস্তাবের বিষয়ে ভোটদানে বিরত থেকেছে। ১৪০ দেশের ভোটের পাস হওয়া প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থেকেছে মোট ৩৮ দেশ। ফেব্রুয়ারির প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত দেশের সংখ্যা ছিল ৩৪টি।

এবারের প্রস্তাবের পক্ষে গিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিবর্তন হলো কি-না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, “এটাতে ভোট দেওয়ার কারণ হচ্ছে মানবিক কারণে। আমরা পৃথিবীতে মানবিক দেশ হিসাবে পরিচিত। আমরা হিউম্যানিটারিয়ান ইস্যুর ক্ষেত্রে খুব সোচ্চার। সে কারণে আমরা এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছি।”

ইউক্রেইনের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকাও মানবিক সহায়তা নিয়ে আরেকটি প্রস্তাব বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে তুলেছিল। ওই প্রস্তাবকে ভোটে তোলার প্রস্তাবের পক্ষেও বাংলাদেশসহ ৫০ দেশ ভোট দিয়েছিল।

কিন্তু ৬০টি দেশের বিরুদ্ধ অবস্থানের কারণে ওই প্রস্তাবটির উপরে আর ভোট হয়নি। ইউএন নিউজ বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রস্তাবের রাশিয়ার প্রসঙ্গই আনা হয়নি।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রস্তাবে ভোটদানের ব্যাখ্যায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মোমেন বলেন, “দুটো প্রস্তাব এসেছিল, একটি পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে, আরেকটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে। দুটোই হিউম্যানিটারিয়ান রেজুলিউশান। মানুষের মঙ্গলের জন্য, আর যাতে যুদ্ধবিগ্রহ কমে।

“আমরা দুটোর পক্ষেই ইয়েস বলেছি। তবে যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকার রেজুলিউশনটা পরবর্তীতে আর ভোটে দিতে পারেনি, কারণ তারা যথেষ্ট পরিমাণ সমর্থন পায় নাই। এটার জন্য সাইডলাইনে পড়ে গেছে। আমরা একটা ভারসাম্য রক্ষা করেছি। এটাতে ভোট দেওয়ার কারণ হচ্ছে মানবিক কারণে।”

ফেব্রুয়ারির জরুরি অধিবেশনে জাতিসংঘের পাস হওয়া প্রস্তাবে ভোট না দেওয়ার কারণ এদিন আবার ব্যাখ্যা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষায় ওই প্রস্তাবটি ছিল ‘খুব একতরফা’।

“সেখানে মোটামুটিভাবে রাশিয়াকে শুধু দোষারোপই করা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধতো এক হাতে হয় না, একহাতে তালি বাজে না। কিন্তু অন্যপক্ষের নামই আসেনি।

“তো, আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এটা অত্যন্ত পার্টিজান। এবং এটাতে যুদ্ধ থামবে না। যুদ্ধ থামাতে হলে উভয়কে আন্তরিকতার সাথে সামনে আসতে হবে। কিন্তু ওটাতে দোষারোপের মানসিকতা ছিল। আর যেহেতু আমরা কোনো দলে নাই…।”

পশ্চিমারা অন্যদের ‘জোর করে’ যুদ্ধে অংশীদার করছে- জাতিসংঘে শ্রীলঙ্কার স্থায়ী প্রতিনিধির এমন একটি বক্তব্যে নিজের সমর্থন জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।

তিনি বলেন, “শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধি বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্বের যুদ্ধে আমাদেরকে জোর করে অংশীদার করার চেষ্টা করছে। বলেছেন যে, ড্র্যাগিং আস ইনটু দ্য চেজবোর্ড পলিটিক্স অব দি ওয়েস্ট। বলেছেন, এটা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য না।

“এটা ভালো কথা বলেছেন। এই যুদ্ধ আমরা চাই না এবং এর কোনো অংশীদারও আমরা হতে চাই না। আমরা শান্তি চাই।”

এর আগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ’বাংলাদেশ জেনোসাইড ১৯৭১’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

অন্যদের মধ্যে জেনোসাইড ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যান্টন, জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলেন জারভিস, মুক্তিযুদ্ধ জাদঘুরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বক্তব্য দেন।