logo

মাইকেল জ্যাকসন – ভাইদের মিউজিক গ্রুপ থেকে কিংবদন্তী পপ তারকা

মোঃ ওমর ফারুক তপু   | Sunday, 17 July 2022


“আমি এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছি যেখানে শিশুরা সবকিছু পাবে যা আমি কখনো পাইনি। আপনি সেখানে শিশুদের বিনোদনের জন্য সবকিছুই পাবেন। আমি ছোটবেলায় চাইলেই পার্ক কিংবা ডিজনি ল্যান্ডের মতো জায়গায় যেতে পারিনি, যা ইচ্ছা তা করতে পারিনি। তাই আমি শিশুদের জন্য আমার গেটের ভেতর আমার এ পৃথিবী বানিয়েছি, যাতে তারা সব রকম আনন্দ পেতে পারে।”- লস এঞ্জেলসের এক হোটেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেভারল্যান্ড সম্পর্কে বলেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন।

‘কিং অফ পপ’ খ্যাত মাইকেল জ্যাকসন একাধারে সংগীতশিল্পী এবং নৃত্যশিল্পী হিসেবে সমান খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এখন পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসনের চেয়ে জনপ্রিয় তারকা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু এতো কিছুর পরেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিতর্ক তার সঙ্গী হয়েছে। কখনো শিশু নির্যাতনের মামলা আবার কখনো প্লাস্টিক সার্জারি করে গায়ের রঙ সাদা বানানোর সমালোচনা। কিন্তু এসব ছাপিয়ে যা মাইকেলকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলো তা হলো মাদক।

১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট ইন্ডিয়ানার গ্যারি গ্রামে জ্যাকসন পরিবারে এক ছোট্ট শিশুর জন্ম হয়। নাম রাখা হয় মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন জ্যাকসন পরিবারের ৫ম সন্তান। তারা মোট ১০ ভাই-বোন ছিলেন।

মাইকেলের বাবা জোসেফ জ্যাকসন নিজেও একজন গিটারিস্ট ছিলেন। কিন্তু পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তার ইস্পাত কারখানায় কাজ করতে হতো যার কারণে সে নিজে সংগীতের দিকে অতটা মনোযোগী হতে পারেন নি। আর এ কারণেই সে তার সন্তানদের সংগীতের দিকে ঠেলে দেন। মূলত বাবার উৎসাহেই মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই সংগীতে জ্যাকসনের ক্যারিয়ার শুরু হয়। বলে রাখা ভালো, মাইকেল জ্যাকসন ছাড়াও তার সব ভাইবোনই সংগীতের জগতে নিজেদের ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছিলো।

জোসেফ খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, তার সন্তানদের প্রতিভা আছে এবং এ কারণে সে তাদেরকে দিয়ে একটি গানের দল তৈরি করালেন। এই গানের দলটির নামই ছিলো ‘জ্যাকসন ৫’। মূলত মাইকেল এবং তার বড় চার ভাই মিলে এ গ্রুপ তৈরি করা হয়। আর এ কারণে পাঁচ জনের এ গানের দলের নাম রাখা হয়েছিলো জ্যাকসন ৫। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে মাইকেল জ্যাকসন সে সময় থেকেই জ্যাকসন ৫ এর মূল গায়ক ছিলেন।

জ্যাকসন ৫ এ থাকাকালীন এত অল্প বয়সে তার গানের গলার গভীরতা এবং সুরের পরিসর দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হতেন। তাছাড়া এত অল্প বয়সে দর্শকদের সাথে স্টেজ পারফর্মেন্স দিয়ে যোগাযোগ করা যে কারো কাছেই অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা।

মাইকেল জ্যাকসন এবং তার ভাইয়েরা মিলে ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের গান এবং অভিনয় চর্চা করতেন। তাদের প্রথম মৌলিক গান ছিলো ‘বিগ বয়’ যা সে সময় তেমন একটা সাফল্য পায়নি।

পরবর্তীতে জ্যাকসন ৫ বিভিন্ন শিল্পী এবং ব্যান্ড দলের কনসার্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করা শুরু করে। এভাবেই জ্যাকসন ৫ মোটাউন রেকর্ড লেবেলের প্রতিষ্ঠাতা বেরি গরডির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাদের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে গরডি ১৯৬৯ সালের প্রথমদিকে নিজের লেবেলে তাদের সাইন করে নেন।

এরপর জ্যাকসন এবং তার ভাইয়েরা লস এঞ্জেলেসে চলে যান যেখানে তারা গরডি এবং সুপ্রিমিস ব্যান্ডের গায়ক ডায়ানা রোজের সাথে থাকতে শুরু করেন। ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে জ্যাকসন ৫ কে লস এঞ্জেলেসে প্রথম পরিচয় করানো হয় এবং পরবর্তীতে তারা সুপ্রিমিসের শোগুলোতে পারফর্ম করা শুরু করে।

তাদের প্রথম অ্যালবাম ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় যা তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশেষ করে তাদের একক গান ‘আই ওয়ান্ট ইউ ব্যাক’ কিছুদিনের মধ্যে বিলবোর্ডের হট ১০০ চার্টের মধ্যে প্রথম স্থানে উঠে আসে। পরবর্তীতে ‘এবিসি’, ‘দ্যা লাভ ইউ সেভ’ এবং ‘আই উইল বি দেয়ার’ গানগুলোও হট চার্টের প্রথমদিকের স্থান দখল করতে শুরু করে।

কয়েক বছর পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসন এবং জ্যাকসন ৫ রেকর্ডিং এবং কনসার্ট ট্যুরের জন্য ব্যস্ত শিডিউল পার করেন। জ্যাকসন ৫ নামের এই গানের দল এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে তাদের প্রত্যেকের নামের আলাদা কার্টুন শো চালু হয় যা ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত চলেছিলো। মূলত এ সময় থেকেই জ্যাকসন তার একক ক্যারিয়ার গঠন করার দিকে মনোযোগী হতে থাকেন।

জ্যাকসন ৫ এর দুর্দান্ত সাফল্য সত্ত্বেও আড়ালে আড়ালে বেশ কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছিলো। জোসেফ এবং গরডির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কারণ জোসেফ চাচ্ছিলো তার ছেলেদের ক্যারিয়ারে নিজেদের আরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। জ্যাকসন ৫ ১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মোটাউনের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু মাইকেলের এক ভাই জারমেইন জ্যাকসন মোটাউনের সাথে থেকে যায় কারণ একক ক্যারিয়ার গঠনে সে মোটাউনের সহযোগিতা চাচ্ছিলো। 

এভাবেই ছোটবেলার গানের দল জ্যাকসন ৫ ভেঙে গিয়ে হয়ে যায় জ্যাকসন্স। জ্যাকসন্স এরপর এপিক রেকর্ডসের সাথে একটি নতুন রেকর্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর করে। এপিক রেকর্ডসের সাথে তাদের ৩য় অ্যালবাম ডেস্টিনি ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরে সবাই বুঝতে পারেন যে তারা শুধুমাত্র ভালো গায়ক কিংবা পারফর্মার নয়, একইসাথে প্রতিভাবান গীতিকারও।

১৯৮০ সালে প্রকাশিত অ্যালবাম ট্রায়াম্ফ এর ১০ লক্ষ কপি বিক্রি হয় যা সে সময় রেকর্ড করে। একের পর এক অ্যালবামের অভাবনীয় সাফল্যের পর মাইকেল তার একক আলাদা ক্যারিয়ার কীভাবে গঠন করা যায় সে ব্যাপারে চিন্তা করা শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে মাইকেল জ্যাকসন তার ভাইদের সাথে শেষবারের মতো ট্যুরে যান ‘ভিক্টরি’ অ্যালবামের সাফল্য উদযাপন করতে।

মূলত ১৯৮২ সালে মাইকেলের একক অ্যালবাম থ্রিলার ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত হওয়া অ্যালবামে পরয়ালবামী অ্যালবামের ৭টি গান টপ ১০ হিটের মধ্যে ছিলো যা এর আগে কখনো হয়নি। এ অ্যালবাম টানা ৮০ সপ্তাহ ধরে হট চার্টে ছিলো এবং টানা ৩৭ সপ্তাহ ধরে প্রথম অবস্থানে ছিলো।

থ্রিলার যে মাইকেল জ্যাকসনকে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দিয়েছিলো তা নয়। এ অ্যালবামের জন্য তিনি গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ডে ১২ টি নমিনেশন পেয়েছিলেন এবং এর মধ্যে আটটি জিতেছিলেন যা দুক্ষেত্রেই রেকর্ড ছিল। ত্রিলারের সাফল্যের পরেই মূলত মাইকেল বুঝতে পেরেছিলেন যে ভাইদের গানের দলে থাকলে এরকম অভাবনীয় সাফল্য তারপক্ষে সম্ভব নয়। যার কারণে এরপর থেকে সে একক ক্যারিয়ারের দিকেই মনোযোগী হন।

এরপর থেকে এভাবেই একের পর এক হিট অ্যালবাম তিনি উপহার দিয়ে যেতে থাকেন তার ভক্তদের আর হয়ে উঠেন ‘কিং অফ পপ’।

কিন্তু এত সাফল্য এবং জনপ্রিয়তার পরেও ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশী সুখী ছিলেন না মাইকেল জ্যাকসন। জীবনের শেষ সময়টায় বিষণ্ণতায় ভুগেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, মাইকেল খুব গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন মাদকের গোলকধাঁধাঁয়। প্রতিদিনই তিনি প্রচুর পরিমাণে ড্রাগস নিতেন। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. কনরাড ম্যুরের সহযোগিতায় তিনি প্রতি রাতেই নিদ্রাসহায়ক ড্রাগস নিতেন।

মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

jafinhasan03@gmail.com