মহুয়া রায়চৌধুরীর অমীমাংসিত মৃত্যু রহস্য
মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Thursday, 28 July 2022
১৯৮৫ সালের ১১ জুলাই মাঝরাত। প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী ও চিত্রনায়িকা মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে যাওয়া হলো দক্ষিণ কোলকাতার এক স্বনামধন্য নার্সিং হোমে। গায়ে আগুন লেগে গুরুতর আহত হয়েছেন তিনি। পুড়ে গেছে শরীরের সত্তর শতাংশের বেশি। ঘটনাটি তখনই দাবানলের মত ছড়িয়ে যায় গোটা কোলকাতায়। পরদিন থেকেই পরিণত হয় টক অব দ্য টাউনে।
দশদিন মৃত্যুর সাথে লড়ে ২২ জুলাই সন্ধ্যা রাতে মৃত্যু হয় মহুয়ার। মৃত্যুর পূর্বে তিনি নিজের মৃত্যুকে আত্মহত্যা চেষ্টা বলেছিলেন। পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট এন. সি ব্যানার্জী ও ইন্সপেক্টর এ.এন দুবে তার বক্তব্য রেকর্ড করেন।
মৃত্যুপূর্ব স্বীকারোক্তিকে সই করেন তার দাদা পিনাকী রায়চৌধুরী ও হাসপাতালের সিস্টার ঊষা। উপস্থিত ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী অভিনেত্রী রত্না ঘোষাল।
তবে এই স্বীকারোক্তির পরও ব্যাপারটি এখানে শেষ হয়ে যায়নি। সন্দেহ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। মৃত্যুদিনের বেশকিছু ঘটনা এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে যে, এটি কি আসলেই আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড?
অগ্নিদগ্ধ হওয়ার দিন মহুয়া জনপ্রিয় চিত্রপরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর বাড়িতে এক পার্টিতে যান। ডিনারের পর তারা বাড়ি ফেরেন।
দাদার কীর্তি সিনেমার একটি দৃশ্যে মহুয়া। ছবি: বেঙ্গলিহান্ট.কম
এরপর মাঝরাতে মহুয়াকে এম্বুলেন্সে করে নার্সিং হোমে নিতে দেখে অঞ্জন চৌধুরী অবাক হন। পরে অগ্নিদুর্ঘটনাটির বিষয় জানাজানি হয়।
মহুয়া মৃত্যুশয্যায় বলে গিয়েছিলেন তার আট বছর বয়সী ছেলে গোলার জন্য (পূর্ণ নাম তমাল চক্রবর্তী) কেরোসিনের স্টোভ জ্বেলে দুধ গরম করতে গিয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। কিন্তু সেরকম হলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার কথা। কিন্তু আশেপাশের কেউই তেমন কিছুই শোনেননি।
স্টোভ বিস্ফোরণ হলে আগুন লাগতো সামনে থেকে। কিন্তু মহুয়ার পিঠের দিকে প্রায় পুরোটাই পুড়ে যায়। তলপেট ও উরু ছিলো ভীষণভাবে অগ্নিদগ্ধ।
রান্নাঘরে স্টোভ বিস্ফোরণের কোনো লক্ষণ ছিল না। কেরোসিন ছিল খুব সামান্য। এদিকে শোবার ঘরের বিছানা, তোশক, বালিশ, মহুয়ার পরনের রাত্রিকালীন পোশাক - সবকিছুই ভীষণভাবে পুড়ে গিয়েছিল। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে আদৌ কোন বিস্ফোরণ হয়েছিল কি? নাকি পুরো ব্যাপারটি সাজানো?
কিন্তু কেন এই ব্যাপারটি সাজাতে হবে? কী আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে এখানে?
মহুয়ার বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী জানিয়েছিলেন তার মেয়ে শিপ্রাকে (মহুয়ার জন্ম নাম, মহুয়া নামটি দেন তরুণ মজুমদার) বাঁচানোর চেষ্টা করেন তিনি ও তার জামাই তিলক। কিন্তু তারা কোনোরকম আঘাত বা আগুনের সংস্পর্শ পাননি। তিলককে শুধু খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা যায়।
মহুয়া তিলককে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন পরিবারের অমতে। ব্যাংকের চাকুরে তিলক ভালো গান করতেন। চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। ১৯৮০-র পর মহুয়া তার অভিনয়গুণে খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন। তিলকের ক্যারিয়ার সেভাবে আগায়নি। এই হতাশা তাকে আগ্রাসী করে তোলে। মহুয়া নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হতেন। প্রখ্যাত অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়, মাধবী মুখোপাধ্যায় ও রত্না ঘোষাল ব্যাপারগুলো জানতেন।
একদিকে অভিনয়জীবনে তুঙ্গস্পর্শী খ্যাতি, আরেকদিকে ব্যক্তিজীবনে ভালোবাসাহীনতা মহুয়ার জীবনের ভারসাম্য নষ্ট করে। তিনি মানুষ হিসেবে ছিলেন প্রচণ্ড সংবেদনশীল। স্টুডিওর সব পথশিশুদের খোঁজ নিতেন। নিজে রান্না করে নিয়ে আসতেন তাদের জন্য। এমনকি সব কুকুরকে নিজ হাতে খাওয়াতেন।
সহশিল্পীদের প্রতিও ছিলেন উদার। দেবশ্রী রায় যখন একেবারে নবীন, তখন বড় দিদির মত তাকে আগলে রেখেছেন। তাপস পালকে উৎসাহিত করেছেন। শ্রীলা মজুমদারকে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের গাড়িতে করে শুটিংয়ে নিয়ে গেছেন।
তবে বাইরের মানুষের প্রতি তিনি সহানুভূতিশীল হলেও ব্যক্তিজীবনের ঘাত-প্রতিঘাত তাকে মদ্যপানে আসক্ত করে তোলে। তখন তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। দুবার আত্মহত্যাও করতেও উদ্যত হয়েছিলেন তিনি। শেষ সিনেমা 'আশীর্বাদ' এর একটি দৃশ্যে যেমন সহশিল্পী তাপস পালকে বলছেন, 'আমি ভালো নেই, তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও।' এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাকে মদ্যপানে ও পরপুরুষে আসক্ত করেছিলো বলে মনে করেন রত্না ঘোষাল, যাকে তিনি মাটু বলে ডাকতেন।
তার সব সংকটে পাশে থাকতেন তার প্রিয় বান্ধবী মাটু ( অভিনেত্রী রত্না ঘোষালের ডাকনাম)। তিনি তার মৃত্যুশয্যায় প্রতিটি দিন পাশে ছিলেন। মহুয়া তার পুত্র গোলাকে দেখে রাখার দায়িত্ব তাকেই দিয়ে যান। তিনি এই মৃত্যুকে অবশ্য আত্মহত্যাই মনে করেন।
তবে প্রথিতযশা অভিনয়শিল্পী মাধবী মুখোপাধ্যায় মনে করেন এটি নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা চেষ্টা নয়। তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছিলেন।
মহুয়ার শরীরের বেশকিছু জায়গায় মারধোরের কালশিটে দাগ ছিলো। মুখের ডানদিকে ব্লেড দিয়ে কাটা ছিলো। তাছাড়া, স্টোভের কোনো ক্ষতি না হওয়া ও বোতলে সামান্য কেরোসিন থাকা ছিলো সন্দেহজনক। তার পুড়ে যাওয়া বিছানা ও নাইটি থেকে আসছিলো কেরোসিনের গন্ধ। মাধবী আশংকা করেছিলেন, কেরোসিন ঢেলে কোনোভাবে মহুয়ার আগে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিলো কিনা!

বিখ্যাত টেলি সিনেমা 'আদমি অউর আওরাত' এর একটি দৃশ্যে মহুয়া। ছবি: গেটবেঙল.ইন
তথ্য-প্রমাণ বলে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। সে সময় মহুয়ার বাংলাদেশে কাজ করতে আসার কথা ছিলো মমতাজ আলীর পরিচালিত 'উসিলা' সিনেমায়। বিপরীতে ছিলেন চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল। ৩ জুলাই তার ভিসা পাওয়ার কথা থাকলেও ভিসা পেতে দেরি হয়।
ভিসা আসে ১২ তারিখ, যখন তিনি মৃত্যুশয্যায়।
তার বাংলাদেশে কাজ করতে যাওয়া নিয়েও ছিলো পরিবারের বিশেষত স্বামীর হীনমন্যতা। বাংলাদেশের একজন প্রযোজকের সাথে তার সম্পর্কের গুঞ্জন রটে। মহুয়ার হাতে তখন কোলকাতারই ২০ - এর অধিক চলচ্চিত্রের কাজ। এর ভেতর তিনি বাংলাদেশের সিনেমায় নিয়মিত হতে পারেন, এমন কথাও শোনা যাচ্ছিলো।
তিলক কি তার হীনমন্যতার চূড়ান্ত করেছিলেন মহুয়ার যাওয়া আটকাবার জন্য? এজন্য কি তাকে চিরতরে পৃথিবী ছেড়েই চলে যেতে হলো?
উত্তরগুলো এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটুকু পরিষ্কার যে, মহুয়ার মৃত্যুর পেছনে কোন স্টোভ বিস্ফোরণ দায়ী নয়। তার বাবা নীলাঞ্জন ব্যাপারটি নিয়ে কখনোই মুখ খোলেননি। মহুয়ার মৃত্যুর সময় উপস্থিত থাকার শক্তি তার ছিলো না। মহুয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রত্না ঘোষালই হয়ত সবচেয়ে ভালো জেনে থাকবেন আসল ব্যাপারটি। তবে সহোদরপ্রতিম প্রিয় বান্ধবীকে মৃত্যুশয্যায় দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনিও ব্যাপারটি নিয়ে অন্যরকম কোনো মন্তব্য করেননি।
সবমিলিয়ে সাঁইত্রিশ বছর পরও ধোঁয়াশা হয়ে রয়েছে এই রহস্যময় মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। mahmudnewaz939@gmail.com