মহালয়ার মহাক্ষণে বেজে ওঠা সুরে
অনিন্দিতা চৌধুরী | Wednesday, 6 October 2021
‘আশ্বিনের এই শারদপ্রাতে…’নেপথ্যে ঢাকঢোল-শঙ্খধ্বনির সাথে সাথে বেজে ওঠা এই প্রারম্ভিকাতেই যেন বহু বছরের দুর্গোপুজোর ভূমিকা ফুটে ওঠে। যে মানুষ কখনো ঘুম থেকে সকালে উঠতে পারে না, তাকেও জবুথবু করে বসিয়ে দেয়া হয়। ছেলেবুড়ো সকলেই বিপুল আগ্রহে একটি ক্ষণের প্রতীক্ষা করে। যে ক্ষণের উদযাপনকে ঘিরে আছে একটি নির্দিষ্ট আয়োজন। মহালয়ার মাহেন্দ্রক্ষণের বহু বছরের সাথী এক অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানটির ইতিকথা
দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনে রচিত হিন্দু ধর্মের ‘চণ্ডী’ নামক গ্রন্থটি। আর সে চণ্ডীর বিভিন্ন শ্লোক পাঠের মাধ্যমেই দেবীকে আবাহন করা হয় স্তুতিতে, ভক্তির স্মৃতিতে। আকাশবাণী থেকে প্রথমদিকে সরাসরি সম্প্রচারিত হতো এ অনুষ্ঠান, এর আয়োজনে যে নামটি সর্বাগ্রে শোনা যায়- তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ নামক মূল অনুষ্ঠানটি যদিওবা ওপার বাংলা, অর্থাৎ ভারতীয় বাঙালিদের দিক থেকে শুরু হয়েছে, তবু এর উদযাপনের স্মৃতি সমান্তরালভাবেই অনুরণিত হয় এপার বাংলার হিন্দু সমাজেও। বাংলাদেশ টেলিভিশন তথা বিটিভিতেও নিয়মিত আয়োজিত হয় এই অনুষ্ঠানটি; নেপথ্যে স্তবের সাথে এর নাট্যরূপে। ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন কুশীলবদের নিয়ে আয়োজিত হলে এর মূল সুরটি ঠিক থাকে, আবেদনে পড়ে না ভাটা।
দিনবদলের গল্প
সময়ের সাথে সাথে ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যম, নতুন নতুন বিনোদনের প্ল্যাটফর্মের প্রভাব যে এ রীতিতেও পড়েনি, তা বললে ভুল হবে। আবহমান বহু অভ্যাসই সময়ের ছাঁচে পালটে যায়। এখনকার শিশু-কিশোরেরা কি কর্মব্যস্ত মা-বাবার রুটিনের সাথে খাপ খাইয়ে ভোরবেলা শুনতে বসে মহালয়ার অনুষ্ঠান? পুজো পুজো আমেজে কি তাদের মনটাও কেমন করে ওঠে?
এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরাও কি ছেলেবেলার কথা মনে রেখে ডিজিটাল যুগে একটু অ্যানালগ হয়ে ওঠে? নাকি ওটা শুধু আগের প্রজন্ম পর্যন্তই নিজের জাদু ধরে রাখতে পেরেছে?
সেসব জানতেই কথা হয়েছিল বিভিন্ন বয়সের, প্রজন্মের ব্যক্তিদের সাথে। যাদের কারো স্মৃতিতে মহালয়া এখনো বর্তমান, তবু ঠিক ঠিক সেই সময়টিতে আর শোনা হয় না দেবীবন্দনা। তবু তারা পুজো পালন করেন, এখনকার মতো করেই। আবার কেউ কেউ এখনো ধরে রেখেছেন বছরপুরনো রীতিনীতি, বয়েসের ভাঁজে নুয়ে পড়লেও ভক্তির আঁচটি নিভে যায়নি। আত্মতৃপ্তির জন্য হলেও সময় করে শুনতে বসেন চেনা আর প্রাচীন সেই স্তুতিবাক্যগুলো, নতুন বছরে, নতুন পুজোয়।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী প্রতিমা দত্ত মহালয়ার অনুষ্ঠান নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। যখন বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না, তখন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রেডিওর সামনে সবাই জড়ো হতেন। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনেও নিয়মিত দেখেছেন এ অনুষ্ঠান। টিভি বনাম রেডিওতে তিনি এগিয়ে রাখবেন টিভিকেই, কেননা তাতে তাঁর কল্পনার দৃশ্যমান রূপ ধরা পড়ে।
তাঁর সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে দেবী দুর্গার মহিষাসুরকে বধ করার দৃশ্যটি। এ অনুষ্ঠান যে সবসময়ই তাঁর জন্য পুজো পুজো আমেজ বয়ে এনেছে। গত বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে শরীর খারাপ থাকায় খুব ভোরে উঠতে পারেননি, তবে পরে ঠিকই দেখে নিয়েছেন। এবারও দেখার আশা রাখেন। এত বছরেও পুজোর এই একটি বিষয় তাঁর জন্য পাল্টায়নি, স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে গেছে বর্তমান।
‘আইডিয়া’র (এনজিও) প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সুদীপ্ত চৌধুরী ছেলেবেলার স্মৃতি হাতড়ান মহালয়ার কথা শুনে, “ছেলেবেলায় পূজা দেখার মতো মহালয়া শোনাটাও একটা উৎসবের মতোই ছিল। অন্ধকার ভোরে পরিবারের সবাই ঘুম থেকে উঠে মহালয়া শুনতে বসতাম। এমনকি আশেপাশের বাসাগুলো থেকেও শোনা যেত, উচ্চধ্বনিতে মহালয়া বাজছে।”
“আমার ১৪/১৫ বছর বয়স পর্যন্ত মহালয়া রেডিওতেই শোনা হয়েছে। ১৯৯৪ সালের পর বাবা বাসায় টিভি কিনলেন, তখন থেকে ডিডি-১ ও বিটিভি চ্যানেলে মহালয়া দেখেছি। এমনকি প্রতিবেশীরাও আমাদের বাসায় আসত মহালয়া দেখার জন্য।”
সুদীপ্তের কথা থেকে যেন চোখে ভেসে ওঠে এক একান্নবর্তী পাড়াপড়শির কথা, যেখানে বিভিন্ন ঘরের দেয়ালগুলো শুধু ইটকাঠের দেয়ালই ছিল, মনের দেয়াল হয়ে উঠতে পারেনি। সময়ের সাথে সাথে আত্মকেন্দ্রিকতায় কোথাও না কোথাও এই ভাগ করে নেয়ার প্রবণতা কমে আসছে হয়তো-
“সময়ের স্রোতে আমরা যেমন যান্ত্রিক হচ্ছি, একইভাবে হারাচ্ছি সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন বা সম্পর্কগুলো। আগে সবকিছু ছিল অপ্রতুল, তাই একে অপরের উপর নির্ভরশীল ছিল কিন্তু এখন সবাই ভিন্ন বা নিউক্লিয়ার হয়ে উঠেছে। আগের একসাথে মহালয়া দেখার আনন্দও আর নেই। তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এখন হয়ত অনেকেই যেকোনো দিন যেকোনো সময় মহালয়া শুনে বা দেখে নেয়।
আজ থেকে ৬/৭ বছর আগেও বাবা-মা ভারতীয় বাংলা চ্যানেলে মহালয়া দেখতেন বেশ উচ্চ ভলিউমে এবং ঐ শব্দেই আমার ঘুম ভেঙে যেত এবং উঠে গিয়ে তাদের পাসে বসতাম। আমার মা এখনও আগের মতই নিয়ম করে ভোরে উঠে মহালয়া দেখেন। ইন্টারনেটের বদৌলতে এটা সহজলভ্য হওয়ায় আমি মাঝে মাঝে ইউটিউবে সার্চ করে শুনি।”
এদিকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আঁখি দাশগুপ্তা চিহ্নিত করেন সময়ের সাথে আসা মহালয়ার অনুষ্ঠানের ধরন ও উপস্থাপনের পার্থক্য, “আসলে ছোটবেলায় দেখা মহালয়ার অনুষ্ঠানগুলোই ভালো ছিল, সেখানে অযথা নাচ-গানের পরিমাণ কম থাকত৷ আর এখনকার মহালয়ার টিভি অনুষ্ঠানগুলাতে মূল কাহিনির চেয়ে অদরকারি নাচ-গান দিয়ে ভরপুর থাকে। তাছাড়া এত এত কাহিনি আর চরিত্র নিয়ে আসেন নাট্যকাররা, এসব দেখতে দেখতে মূল কাহিনি দেখার মতো আর ধৈর্য হয়ে ওঠে না।”
আঁখির বাবা আর ঠাম্মাকে নিয়েই তাঁর মহালয়ার স্মৃতি জড়ানো। তাঁর বাবা বেঁচে থাকতে ভোরবেলা সবাইকে জাগিয়ে দিতেন শুধু এই অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য। পড়াশোনার সূত্রে বাড়ির বাইরে থাকেন। তবে এখনো বাড়িতে থাকলে আঁখি প্রতিবার এ অনুষ্ঠান দেখার চেষ্টা করেন। তাঁদের এলাকায় এদিন ভোরবেলা মাইকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে স্তবস্তোত্র বাজানো হয়, যা শুনলেই তাঁর মনে পুজো পুজো আবহ জন্ম নেয়।
শ্রীমঙ্গলের নটরডেম স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষিকা তিথি দেব পূজার জন্য মহালয়া আর আগের মতো রঙিন নেই। ছোটবেলায় ভাই মহালয়া দেখার জন্য না ডাকলে কান্নাকাটি করতেন আর এখন- “মহালয়া টিভিতে দেখা হয় না প্রায় দু’বছর হয়। কিন্তু ঘরের কাজের মধ্যে হাঁটাচলার মধ্য দিয়ে ঠিকই কানে আওয়াজ আসে। আগে খুব আনন্দ নিয়ে দেখতাম। ছোট ছিলাম, হয়তো তাই রঙিন সব পরিবেশনা মনোমুগ্ধকর লাগত। কিন্তু এখন কেমন জানি অতিরঞ্জিত করে ফেলে সবকিছু। তাই হয়তো আর আগ্রহ লাগে না।”
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফাল্গুনী দত্ত অর্ণার জন্য এখনো আমেজ কেটে যায়নি, বরং নতুন রূপে সে আনন্দ গ্রহণ করেন তিনি- “গত দু’বছর যাবত পড়ালেখার জন্য হোস্টেলে আছি। আগের মহালয়া দেখার স্মৃতিগুলো খুব মনে পড়ে। মহালয়ায় ছুটি না থাকায় বাড়ি যেতে পারি না। তবু মহালয়া দেখা বাদ দিইনি। দুই বছর ধরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইনে যে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়, সেই অনুষ্ঠানই দেখি। এগুলো সাধারণত যেকোনো সময় দেখা যায়, কিন্তু ভোরবেলায় দেখার মজাই আলাদা। তাই হোস্টেলের বান্ধবীরা মিলে ভোর-ভোর উঠে মোবাইল হাতে মহালয়া দেখতে বসে যাই।
আমরা মোট ছ'জন বান্ধবী একসাথে বসে দেখি। এখানেও দারুণ মজা হয়। বাড়িতে যখন আবার মহালয়া দেখতে বসব আগের মতো, তখন এই দুই বছরের কথা খুব মনে পড়বে।”
যেকোনো উৎসবের সাথে যতটা না জড়িয়ে থাকে আয়োজন, তার চেয়ে বেশি বোধহয় মেখে থাকে আবেগের আবরণ। দুর্গাপুজোর আবাহনী ক্ষণের একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের সাথে বিভিন্ন প্রজন্ম, ক্ষেত্র কিংবা বয়সের জড়িয়ে থাকা আবেগেরই অনুসন্ধান করা হয়েছে এ লেখায়। আবেগ বেঁচে থাকুক, মানুষ আনন্দ করুক, অতীতে ও বর্তমানের সাঁকো নড়বড়ে না হয়ে গড়ে দিক ভবিষ্যতের পদক্ষেপ।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। anindetamonti3@gmail.com