মহামারীর দিনে আশুরা, কারবালার স্মরণ
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম | Friday, 20 August 2021
করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে এবারও রাস্তায় তাজিয়া মিছিলের অনুমতি নেই, তবে পুরান ঢাকার হোসেনী দালান প্রাঙ্গণে কারবালার রক্তাক্ত স্মৃতির স্মরণে মানুষের ঢল নেমেছিল ঠিকই।
শুক্রবার আশুরার দিন সকাল থেকেই হোসেনী দালান চত্বর ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে।
ইমামবাড়া প্রাঙ্গণে খালি পায়ে মিছিল করে বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন! হায় হোসেন’ বলে তাজিয়ার মর্সিয়ায় মিলেছেন তারা। অনেকের হাতে ছিল লাল-কালো আর সবুজের সমারোহে নানা অক্ষর খোচিত নিশান।
হোসেনী দালানে শিয়া মুসলমানদের এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সকাল ১০টায়। তার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থেকে হাজারো নারী, পুরুষ ও শিশু ইমামবাড়ায় ভিড় করতে শুরু করে।
কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনী আর তল্লাশি পেরিয়ে সবাইকে ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। মুখে মাস্ক না থাকালে কাউকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার জসিম উদ্দিন মোল্লা বলেন, “আর্চওয়ের ভেতর দিয়ে সবাইকে ঢুকতে হচ্ছে। ভেতরে ঢোকার ও বের হওয়ার পথও আলাদা।
মুসলমানদের মহানবী হযরত মুহাম্মদের (স.) দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) হিজরি ৬১তম বর্ষের (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ১০ মহররম ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে শহীদ হন।
বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও শিয়া মুসলমানরা ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে দিনটিকে পালন করেন ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে।
এবার সারা দেশে আশুরা পালিত হচ্ছে শুক্রবার। ফলে আশুরার সরকারি ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলে গেছে।
ঢাকায় এক সময় তাজিয়া মিছিলে ছোরা, কাঁচি, বর্শা, বল্লম, তরবারি, লাঠি হাতে যুবকদের দেখা যেত। ইমাম হোসেনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মরণে তারা নিজের শরীরে আঘাত করে নিজেকে রক্তাক্ত করতেন।
কিন্তু ২০১৫ সালে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির মধ্যে ইমামবাড়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনার পর থেকে আশুরায় নিরাপত্তার কড়াকড়ি বাড়ানো হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ তাজিয়া মিছিলে ধারালো অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করে।
এই দিনে প্রতিবছর ইমামবাড়া থেকে বের হত আশুরার প্রধান তাজিয়া মিছিল। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে ধানমণ্ডিতে প্রতীকী ‘কারবালা’প্রাঙ্গণে তা শেষ হত।
কিন্তু মহামারীর কারণে গণজমায়েত নিষিদ্ধ থাকায় গত বছর খোলা স্থানে তাজিয়া মিছিল ও সমাবেশ না করে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে ঘরোয়াভাবে আশুরার আনুষ্ঠানিকতা সারতে বলেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ। এবারও একই নিয়ম।
ভক্তরা এবার হোসেনী দালানের ভেতরেই খোলা জায়গায় চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে কারবালার ঘটনাপ্রবাহরের স্মৃতি তুলে ধরে ধরেছেন শোকগীতিতে। ইমামবাড়ার ভেতরে সুসজ্জিত সমাধিগুলোতেও অনেককে প্রার্থনা করতে দেখা গেছে। তাদের অনেকে বিভিন্ন মানত ও নিয়ত করে এখানে এসেছেন।
কারবালার স্মরণে কালো চাঁদোয়ার নিচে ইমাম হোসেনের প্রতীকী কফিন আর ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের দুটি প্রতীকী ঘোড়াও ছিল।
ইমামবাড়ার তত্ত্বাবধায়ক এমএম ফিরোজ হোসেন জানালেন, বেলা ১টা পর্যন্ত ভেতরেই তাজিয়া মিছিল হবে। তারপর হবে বিশেষ আমল হবে।
বিকালে তবারক খাওয়ানোর পর মাগরিব শেষে হবে বয়ান। সেই বায়ানের মধ্য দিয়েই ইমামবাড়ায় আশুরার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।
সরকারের তরফ থেকে রাস্তায় তাজিয়া মিছিলে নিষেধ থাকলেও পুরান ঢাকার অলিগলিতে শিশুদের দৌড় ঝাঁপ থেমে নেই। বাঁশি বাজিয়ে নিশান হাতে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে তারা আনন্দে মেতেছে।
বড়কাটারা, পল্টন, মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ, মিরপুর কারবালা ইমামবাড়া ছাড়াও পুরান ঢাকায় ছোট ছোট ইমামবারায় আশুরা পালিত হচ্ছে।