ভিশন ২০৪১: ডিজিটাল বিভাজন দূরীকরণ
মিনহাজুর রহমান শিহাব | Tuesday, 21 September 2021
৪০ বছর বয়সী মাসুদ সাহেব সরকারি এক কর্মকর্তা যিনি গ্রামে থাকেন। করোনা ভাইরাসের টিকা দিতে ইচ্ছুক হলেও রেজিষ্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে তিনি বেশ জটিল মনে করাই এখনো টিকা দিতে পারেন নি। যদিও তিনি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। মাসুদ সাহেবের মত এমন অনেকে আছেন যারা তথ্য প্রযুক্তির সুফল ব্যবহারে এখনো পিছিয়ে। অথচ যেকোনো স্মার্টফোন থেকে খুব সহজেই যে কেউ এই রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করে টিকা নিতে পারেন।
আধুনিক বিশ্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ( আইসিটি) অনেক সুবিধা প্রদান করছে, তথ্যে অধিকতর প্রবেশাধিকার, শ্রম খাতে ব্যয় ও কর্মঘন্টা হ্রাস, গোটা বিশ্বের মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন প্রভৃতি ।যাইহোক, ডিজিটালাইজেশন সমগ্র বিশ্বে সমানভাবে ঘটছে না যার একটি উদাহরণ শুরুতে দেয়া হয়েছে। কারণ এই ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান যা ডিজিটাল ডিভাইড নামে পরিচিত। ইন্টারনেট এবং আইসিটি অ্যাক্সেসের অসমতা ডিজিটাল বিভাজন হিসাবে পরিচিত এবং বিশ্বব্যাপী ৫২% নারী এবং ৪২% পুরুষ এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে । অঞ্চলগুলির দিকে তাকালে এই ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়: ইন্টারনেট পোর্টাল ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটাস থেকে ২০২০ সালের মে মাস পর্যন্ত নেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার ৩৯.৩% ইউরোপীয় ৮৭.২%, এশিয়দের ৭৬% এবং ৯৪.৬ % আমেরিকানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল। সাম্প্রতিক এক বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে শহরে বসবাসরত পরিবারের মাত্র ৫০ শতাংশের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, গ্রামাঞ্চলে যা ৩০ শতাংশেরও কম।
প্রথমত, দারিদ্র্য ডিজিটাল বিভাজনেও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ যাকে টেকসই উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে দেখা হয়।এই সংকট বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক অসমতার উন্মোচন করছে যা করোনাকালে প্রতীয়মান হয়েছে। অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে অনলাইনে শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্রডব্যান্ড এবং ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ায়, জনসংখ্যার একটি বড় অংশের ইন্টারনেট এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ অপ্রতুল। উন্নয়নশীল অঞ্চল হিসাবে এখানে অনেক শিক্ষার্থী অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র পরিবার থেকে আসে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা বিশেষত পিছিয়ে পড়া এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মাঝে দৃশ্যমান । যথাযথ শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না। করোনাকালীন শিক্ষাখাতে ডিজিটাল বিভাজনের প্রভাব বিশেষভাবে দেখা দিয়েছে, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা এর প্রধান ভুক্তভোগী। করোনার স্থবির অবস্থায় যেহেতু অনলাইনে সমস্ত কার্যক্রম চলেছে তাই ডিজিটাল বিভাজনের ফলে অনেক শিক্ষার্থী সুবিধাবঞ্চিত হয়ে তাদের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। এছাড়া অনেকে অপব্যবহারের দিকেও ঝুঁকে পড়ে।
তৃতীয়ত, আইসিটি অবকাঠামোর ঘাটতির মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক সংযোগ, সর্বত্র ভারসাম্যপূর্ণ ইন্টারনেট গতি না থাকা, ডিভাইস ও সফটওয়্যার এবং অ্যাপ্লিকেশনগুলিতে অ্যাক্সেসের অভাব। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে উদীয়মান অর্থনীতিতে, বিশেষ করে গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে, চার বিলিয়নেরও বেশি মানুষ এখনও ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত নয়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে, যেখানে সমগ্র বিশ্ব ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং এর অবকাঠামো উন্নয়নে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে একটি অঞ্চলের জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সেবার সংকট অনাকাঙ্ক্ষিত।
ইউনেস্কোর তথ্য মতে, বিশ্বে প্রায় ৮২৬ মিলিয়ন শিক্ষার্থী কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে না এবং ৭০৬ মিলিয়ন শিক্ষার্থীর বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই। এটি অবকাঠামো উন্নয়নের অভাবের সাথে সম্পর্কিত। জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ), ২০১৯ সালের শেষের দিকে সতর্ক করেছিল যে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা (প্রায় ৬ বিলিয়ন মানুষ) ইন্টারনেটে প্রবেশের সুযোগ পাবে না। সংকটকালীন মুহূর্তে ডিজিটাল বিভাজনের নেতিবাচক রূপ বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় গত দেড় বছরে প্রস্ফুটিত। শিক্ষার্থীদের কাছে উপযোগী ডিভাইস, পর্যাপ্ত ইন্টারনেট বা নিরবিচ্ছিন্ন গতি, বিদ্যুৎ সমস্যা প্রভৃতির কারণে দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বিত ও অভিন্ন পরীক্ষা পদ্ধতির উপায় বের করতে পারেনি।
এ ধরণের পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে এসডিজি'র অভিষ্ঠগুলো (বিশেষত এসডিজি-৪ ও এসডিজি-৯) পূরণ বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।