ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধ
ফরহাদুর রহমান | Friday, 26 March 2021
১৯৭১ বাঙালির কষ্ট, আবেগ, উচ্ছ্বাস আর গৌরবের বছর। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি অর্জন করে স্বাধীনতা। আর বাংলাদেশের সেই স্বাধীনতাযুদ্ধকে স্মরণ করতে ও স্বাধীনতার চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জিইয়ে রাখতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু ভাস্কর্য। এমনকি বাংলাদেশের বাইরে, বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলেও রয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধের এসব ভাস্কর্য। আজ পাঠকদের সামনে এমনই কিছু ভাস্কর্য সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
জাগ্রত চৌরঙ্গী
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল গাজীপুর থেকেই। সেই ইতিহাসকে ধরে রাখতে ১৯৭৩ সালে ভাস্কর আবদুর রাজ্জাক নির্মাণ করেন জাগ্রত চৌরঙ্গী। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য।
জাগ্রত চৌরঙ্গী গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর চৌরাস্তার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। ভাস্কর্যটি একজন ব্যক্তির অবয়বে নির্মিত। তার ডান হাতে আছে একটি গ্রেনেড, বাম হাতে রাইফেল। লুঙ্গি পরা, খালি গা, খালি পা আর পেশিবহুল একজন ব্যক্তি। বেদিসহ জাগ্রত চৌরঙ্গী
অপরাজেয় বাংলা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সবার সম্মিলিত প্রতিরোধ ও আক্রমণে পাকবাহিনী পরাজিত হয়। সব শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহণেরই প্রতীক অপরাজেয় বাংলা। ভাস্কর্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অবস্থিত। ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ এটি নির্মাণ করেন। আর এটির নামকরণ করেন মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী।
অপরাজেয় বাংলা নির্মাণ শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। নির্মাণ শেষে ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়। ৬ ফুট বেদীর ওপর নির্মিত ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট ও ব্যাস ৬ ফুট। ভাস্কর্যে তিনজন ব্যক্তির অবয়বে একজনের ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এর মডেল ছিলেন আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে সাবলীল ভঙ্গিতে দাঁড়ানো অবয়বের মডেল ছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে। আর নারী অবয়বের মডেল ছিলেন হাসিনা আহমেদ।
সাবাশ বাংলাদেশ
‘সাবাশ বাংলাদেশ
এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়
জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
কবিতার লাইনগুলোরই যেন বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ ভাস্কর্যে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ভাস্কর্য ‘সাবাশ বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতীক এই ভাস্কর্যটি। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। ভাস্কর নিতুন কুণ্ডু ১৯৯১ সালে ভাস্কর্যটি নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৯২ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হলে শহীদজননী জাহানারা ইমাম এটি উদ্বোধন করেন।
ভাস্কর্যটির পাদদেশে রয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ। ৪০ বর্গফুট জায়গার ওপর নির্মিত ভাস্কর্যের ঠিক পেছনেই ৩৬ ফুট লম্বা দেয়াল। দেয়ালের ওপরের দিকে বৃত্ত যা দ্বারা স্বাধীনতার সূর্যের প্রতীককে বোঝানো হয়েছে। সাবাশ বাংলার দুই পাশে আয়তাকার দুটি দেয়াল আছে। একটি দেয়ালে কয়েকজন বাউলগান করছে যা বাঙালি জাতির গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। অন্য দেয়ালে একজন মায়ের কোলে শিশু ও দুই তরুণী যাদের একজনের হাতে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সেই পতাকার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক কিশোর যা আজ বাঙালির প্রেরণার বাতিঘর হয়ে গৌরবের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ চালালে অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সে সময় শহীদ হন। তাঁদের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে ভাস্কর্য সাবাশ বাংলাদেশ নির্মাণ শুরু হয়।
বিজয় ৭১
মুক্তিযুদ্ধে বাংলার সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মূর্তপ্রতীক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য বিজয় ৭১। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের সামনে ‘বিজয় ৭১’ নির্মাণ করেন শ্যামল চৌধুরী। ২০০০ সালে এটি নির্মিত হয়।
ভাস্কর্যে একজন নারী, একজন কৃষক ও একজন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধার নজরকাড়া ভঙ্গিমা যেন বারবার মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে নিয়ে যায় দর্শনার্থীদের। একজন কৃষক মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছে আকাশের দিকে। তার ডানপাশেই শাশ্বত বাংলার সর্বত্যাগী ও সংগ্রামী নারী দৃঢ়চিত্তে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আছে রাইফেল। অন্যদিকে একজন ছাত্র গ্রেনেড ছোঁড়ার ভঙ্গিমায় বাম হাতে রাইফেল নিয়ে তেজোদীপ্ত চিত্তে দাঁড়িয়ে আছেন।
ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত। ইমেইল- farhadrahman702@gmail.com