ভারতের মিজোরামে ট্রান্সশিপমেন্ট: বাংলাদেশের বিবেচনায় বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়
সাইফুল ইসলাম | Sunday, 15 August 2021
ভারতের স্থলবেষ্টিত রাজ্য মিজোরামে পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যেই মূলত থেগা নদীতে সেতু নিমার্ণের যে প্রস্তাব নয়াদিল্লি ঢাকাকে দিয়েছে,সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেবার আগে ঢাকা এর সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করতে চায়।
এই পথে যোগাযোগ স্থাপন হলে প্রতিবেশি দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণের জন্যই এই স্টাডি সম্পন্নের বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ।
কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের এই রাজ্য মিজোরাম একসময় ছিল সংঘাতসঙ্কুল। আর তাই এই রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের (কানেকটিভিটি) ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিও সর্বোচ্চ বিবেচনায় রাখছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি আয়োজিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে রাঙ্গামাটির থেগামুখ দিয়ে সীমান্ত খুলে দেবার ভারতীয় প্রস্তাব পর্যালোচনার পর সম্ভাব্যতা নিরূপণের সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দূরবর্তী রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মধ্য দিয়ে কানেকটিভিটি জোরদার করতে চাচ্ছে।
সুত্রমতে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পর সেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি-বাণিজ্যে যে প্রভাব পড়বে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এই দুটি সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। রপ্তানির উপর যেসব প্রভাব পড়তে পারে সেগুলোর মূল্যায়ন করতে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি হওয়া দরকার বলে মত দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি।
চলমান কোভিড মহামারীতে সবকিছু বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে থেগামুখ-ডেমাগিরি সীমান্তে যৌথ পরিদর্শনের পরিকল্পনা আপাতত মুলতবি রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, ওই এলাকায় সীমান্ত-হাট স্থাপনের জন্য মিজোরামের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বাংলাদেশ সম্মতি দিয়েছে। সীমান্ত-হাটের মাধ্যমে দুটি দেশের মধ্যেকার প্রাতিষ্ঠানিক সীমান্ত-বাণিজ্য সহজতর হবে।
সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত রামগড় ও রাঙ্গামাটি জেলার থেগামুখে শুল্ক স্টেশন স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, এ অঞ্চল ঘিরে বাণিজ্যিক লেনদেন নেই বলে এ-যাবত সেখানে কোনো ধরনের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
সভায় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি বলেন, থেগা নদীতে সেতু নির্মাণের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সংযোগ রুট স্থাপন করা হলে কোলকাতা থেকে সরাসরি কম খরচে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে মালামাল পরিবহন সম্ভব হবে। তাঁর মতে, এর ফলে এসব রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমে যাবে বলেই বিষয়টি নিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি হওয়া জরুরি।
ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা রয়েছে বলেই আখাউড়া ও বিবিরবাজার স্থলবন্দর দিয়ে বর্ধিত পরিমাণে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। দেশের অন্যান্য স্থলবন্দরের ক্ষেত্রে পণ্য আমদানির তুলনায় রপ্তানি অনেক বেশি পিছিয়ে রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি এ-প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরে বলেন যে, আখাউড়া থেকে ভারতের রাজ্যগুলোর ভেতর দিয়ে মিয়ানমার হয়ে সড়কপথে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রস্তাবে ভারত এখনও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
২০২০ সালের আদমশুমারি অনুসারে মিজোরামের জনসংখ্যা মাত্র ১৩ লাখ— এ-কথার উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি বলেন, “এত অল্প জনসংখ্যার এই ভারতীয় রাজ্যটিতে বাংলাদেশের বাণিজ্যের যে বৃদ্ধি ঘটতে পারে, সেটির সঙ্গে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আনুপাতিক হিসাবটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিচার করতে হবে।”
প্রস্তাবিত এলাকাটি বন্যহাতির চলাচলের রুট এবং প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হলে সেখানে বন্যপ্রাণির স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, মহামারী পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হলেই মিজোরামের সঙ্গে কানেকটিভিটি স্থাপনের প্রেক্ষিতে রপ্তানির উপর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাইয়ের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু করা হবে।
তবে, তিনি বলেন, ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম এবং এ অবস্থায় থেগামুখ অঞ্চল দিয়ে সংযোগ স্থাপন আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও সঙ্কুচিত করে ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ভারতকে স্থল ও জলপথে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দিয়েছে।
সেই সঙ্গে, ভারত তাদের নিজস্ব পণ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পরিবহনের সুবিধার জন্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো ব্যবহারের অনুমোদনও পেয়েছে।
syful-islam@outlook.com