বৈদ্যুতিক গাড়ি: খুলে যাচ্ছে অসীম সম্ভাবনার দরজা
এফই অনলাইন ডেস্ক | Monday, 11 October 2021
গাড়ির জগতে রূপবদলের পালা চলছে প্রায় ঝড়ের বেগে। তবে ঝড়ো গতি উৎপাদনকে ব্যাহত করার আমন্ত্রণ হয়েও দেখা দিতে পারে। অন্তর্দহন গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়ির নকশা প্রণয়ন এবং নির্মাণ অপেক্ষাকৃত সহজ। এ কারণে এককালে দুর্ভেদ্য হিসেবে আখ্যায়িত শিল্পক্ষেত্রে এখন ঢুকতে পারা তুলনা বিচারে যেন ডালভাত হয়ে গেছে।
পুরানো এবং প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতাদেরকে বাধার দুই দানবের মুখে ঠেলে দিয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। দুই বাধা ডিঙ্গিয়ে তারা সফলভাবে মুনাফার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে কিনা এখন সে প্রশ্ন নিয়েই জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে। প্রথম বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে টেসলা থেকে শুরু করে গাড়ি শিল্পে নবাগত কোম্পানিগুলো। আর দ্বিতীয় বাধা হলো, গাড়ি শিল্পে ব্যাপকসংখ্যক চীনা প্রতিযোগীদের এগিয়ে আসা এবং বাজারের হিস্যা পাওয়ার জন্য দুর্দমনীয় ওঠা।
বিগত দুই বছরে টেসলা একের পর এক শক্তি সঞ্চয় করেছে। তবে সম্প্রতি টেসলা থেকেও গাড়ি নির্মাতাদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সূচনায় টেসলা দক্ষ দৌড়বিদের দ্রুততায় প্রযুক্তিখাতে বিকাশ ঘটিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতাদের আস্তাবল থেকে প্রথমদিকে যেসব বিদ্যুৎ গাড়ি বের হয়েছিল সেগুলো ছিল বড়ই দুর্বল। পাল্লা ছিল কম। পাড়ি দিতে পারত অল্প দূরত্ব। আর চার্জ করতে লাগত ক্লান্তিকর দীর্ঘসময়। ২০১২-তে বাজারে এলো টেসলা মডেল এস। এক চার্জে এ গাড়ি ২৬০ মাইল পাড়ি দেয় বলে দাবি করা হলো। আর এ পথ পাড়ি দেওয়াই বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে আদর্শ মাপকাঠি বা মান হয়ে দাঁড়াল। সম্প্রতি জাগুয়ার এবং অডির সর্বশেষ গাড়িগুলো এ মান অর্জন ছুঁয়েছে। তবে দাম, পাল্লা এবং দক্ষতার দিক থেকে বড় বড় খেলোয়াড়দের নতুন নতুন মডেলের গাড়ি অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী।
আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানো খুবই ফূর্তির বিষয় বলে উল্লেখ করেন পোলস্টারের যুক্তরাজ্যের প্রধান জোনাথন গুডম্যান। তিনি আরো বলেন, “দেখুন রেনাল্ট এবং নিশানের সাবেক প্রধান কার্লোস গোসেন বলেছিলেন, বিদ্যৎ গাড়ি আরো ১০ বছরের দূরের ভবিষ্যতে রয়েছে। তিনি ভুল করেছিলেন। ওসব গাড়ি এখনই মিলছে।”
নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গেল প্রথমদিকে কিছু অনিবার্য সংকটের ঘোলাপানিতে পড়তে হয়। যেমন, ভক্সওয়াগানের প্রথম একমাত্র বিদ্যুৎশক্তিতে চলার উপযোগী গাড়ি ছিল ভিডব্ল্বিউ আইডি৩। এ গাড়ির সফটওয়্যার নিয়ে সমস্যার বেড়াজালে আটকে যাওয়ায় গাড়ি সরবরাহের সময় ঠিক রাখা যায়নি। বরং খুবই দেরি হয়েছে। গাড়ি নির্মাতারা এরই মধ্যে নতুন পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। কাজেই ভবিষ্যতে এমন সব সমস্যায় আর নাকাল হতে হবে না তাদের।
প্যানকেক তৈরি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণে বেশ মিল আছে! জেফারিজের মোটর গাড়ি বিষয়ক বিশ্লেষক ফিলিপ হাউচোইস বলেন, “গাড়ি শিল্পে একটি রসিকতা প্রচলিত আছে -- বিদ্যুৎ গাড়ি হলো প্যানকেক বানানোর মতো। প্রথমটা ভালো হবে না, দ্বিতীয়টা প্রথমটার চেয়ে ভালো হবে এবং তৃতীয়টা এক্কেবারে ঠিকঠাক হবে। (বাংলাদেশে চিতই, এমনকি ভাপা পিঠা নিয়েও প্রায় একই লোককথা রয়েছে।)
বিদ্যুৎ গাড়ি নিয়ে একজাতের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে মনে করছে পুরানো এবং প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতারা। তাদের ভাষ্য হলো, এক হাত পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে তাদেরকে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কেবল বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতে নিয়োজিতরা ব্যাপকহারে টাকা তুলতে বা তহবিল জোটাতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিরা এ থেকে বঞ্চিত। তহবিল জুটাতে যেয়ে তাদের ঘাম ছুটে যায়।
চীনের এনআইও নামের কোম্পানির কথা এখানে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। সদ্য আগত এ কোম্পানির মোট মূল্য এখনই ফেরারি গাড়ি কোম্পানির দ্বিগুণ হয়েছে।
এ বছর এমন কাণ্ড আরো ঘটেছে। যুক্তরাজ্যে অ্যারাইভাল নামের ভ্যান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান একটি বাহনও না বানিয়ে বিপরীত একত্রীকরণের মাধ্যমে ১৩.৬ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়েছে। অন্যদিকে নতুন এবং অপরীক্ষিত মার্কিন বৈদ্যুতিক ট্রাক নির্মাতা রিভিয়ানের মূল্য মোটামুটি ৮০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ভক্সওয়াগান গোষ্ঠীর প্রধান নির্বাহী হার্বার্ট ডাইস বলেন, নবাগত গাড়ি কোম্পানিগুলো নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকার নেই। গণউৎপাদনের জটিলতা এবং হাঙ্গামা সামাল দেওয়ার মতো ঝামেলায় এসব কোম্পানিকে পড়তে হবে। পাশাপাশি নতুন ক্রেতাদের খুশি রাখার জন্য যথাযথ সেবা কেন্দ্র তৈরির বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে তাদের। সব মিলিয়ে তিনি বলেন, “বৈদ্যুতিক গাড়িকে ভিত্তি করে কোনো সমীক্ষা গাড়ি মেলায় তুলে ধরা সহজ। কিন্তু গাড়ি তৈরির কারখানা তৈরি করতে যেয়ে তারা পুরানো গাড়ি নির্মাতাদের তুলনায় ধীরগতির মুখে পড়বে।”
চীনের এনআইও গাড়ি সরবরাহ করতে যেয়ে দেরির জটাজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের নথি থেকে জানা যায়, মাত্র ৪০০ গাড়ি রপ্তানি করতে পেরেছে এ সংস্থা।

বেলজিয়ামের একটি শো-রুমে চীন থেকে আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি
আগে টেসলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ডাইস। কিন্তু সেই টেসলাকেও বর্তমান অবস্থায় আসতে ১৫ বছর লেগেছে। তাও এখনো বিশ্বের গাড়ির বাজারের প্রায় ১ শতাংশ মাত্র দখল করতে পেরেছে টেসলা। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন নতুন কোম্পানিগুলো বড় কোনো হুমকি হয়ে দেখা দেবে না। বরং হুমকি হয়ে দেখা দেবে চীন।
ইঞ্জিন গাড়ির যুগে আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে পেরে উঠেনি চীনের নিজস্ব কোম্পানি এসএআইসি এবং ফার্স্ট অটোওয়ার্কস। কিন্তু বিদ্যুৎ গাড়ির দিকে ঝোঁকার সাথে সাথে মাঠ বদলে গেছে। ঐতিহ্যগতভাবে জার্মানি, জাপান এবং আমেরিকার মতো পাকা, পুরানো খেলোয়াড়দের মাঠছাড়া করার দিকে হয়ত ঠেলে দেবে এ দুই কোম্পানি।
এদিকে, চীনের তৈরি বিদ্যুৎগাড়ি এরই মধ্যে ইউরোপের শো-রুম গুলোতে উঁকি দিতে শুরু করেছে। এসএআইসি’র মালিকানাধীন এমজি ব্রান্ড এবং এনআইও এবং আইওয়েজের মতো নতুন গোষ্ঠীগুলোর গাড়ি এভাবে ইউরোপে ঢুকছে।
তবে নবাগত এসব গাড়ির যাত্রাপথ মোটেও ফুল দিয়ে সাজানো নয়। প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতারা নতুন নতুন মডেলের গাড়ি বাজারে ছাড়তে শুরু করেছে। কাজেই বলা যায়, সামনে আছে জোর লড়াই। এসব গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে নতুনদের। গত বছর পশ্চিম লন্ডনের রিডিং ডিলারশিপ থেকে প্রতি ১০টি গাড়ির মধ্যে নয়টি ছিল পেট্রল বা ডিজেলচালিত। এখন, অর্ধেক গাড়িই হয় শঙ্কর আর না হয় পুরোপুরি বিদ্যুৎ প্রযুক্তির।
বার্কশায়ার সাইট পরিচালনাকারী ওয়েল্যান্ডস অটোমোটিভের প্রধান জন ও'হ্যানলন বলেন, “গত ছয় মাসে ক্রেতাদের সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে, আমরা দেখতে পেয়েছি। মানুষ আমাদের কাছে এসে সত্যিই জানতে চাইছে বৈদ্যুতিক গাড়ি তার জন্য কাজে লাগবে কি না। আর অনেকেই এ গাড়ি চালিয়েই ফিরে যাচ্ছেন, এটি তার জন্য কাজ করবে ধরে নিয়েছেন।”
ইংল্যান্ডের ছোট গ্রাম লিটল ফন্টে ভক্সওয়াগন ডিলার আইডি৩ গাড়ি কেনার বিপুল সংখ্যক ক্রেতা পাচ্ছে। স্থানীয় এই গাড়ি ক্রেতাদের বেশি ঘোরাফেরা করার কোনো দরকার পড়ে না। গাড়ি চার্জ করা নিয়ে ঝামেলাও পোহাতে হবে না। নিজেদের চলার পথেই প্রয়োজনে গাড়ি চার্জ করাতে পারবে।
ডিলার গোষ্ঠী সিটি গেটের প্রধান জনাথন স্মিথ বলেন, “অসম্ভব সম্ভাবনার দরজা খুলে যাচ্ছে, ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে বিদ্যুৎ গাড়ি। কেবল গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থা করা গেলে একে ঠেকাতে পারবে না কেউই।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
আরো পড়ুন: