বেগম রোকেয়াঃ বাংলা সাহিত্যে নারী
মোজাক্কির রিফাত | Thursday, 9 December 2021
পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডি কেরানি হইতে আরম্ভ করিয়া লেডি ম্যাজিস্ট্রেট, লেডি ব্যারিস্টার, লেডি জজ সবই হইব!... উপার্জন করিব না কেন? (সুলতানার স্বপ্ন)
- বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
‘সুলতানার স্বপ্নে’ লেখা উপরের কথাগুলোকে এখন আর স্বপ্ন মনে হয় না। এই পথের পাথেয় এভাবেই এই বইটিতে লিখে দিয়েছিলেন ‘মিসেস আর এস হোসেন’; লেখক হিসেবে গ্রন্থের কভারে নাম লিখেছেন সবসময় তিনি। আজ ৯ ডিসেম্বর এই মহিয়সী ক্ষণজন্মা নারীর জন্ম এবং মৃত্যুদিন।
বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাবার অন্যতম সিড়ি ছিল তার সাহিত্যকর্ম; যদিও তা পরিমাণে বিপুল নয়। শুধুমাত্র ৫টি গ্রন্থ রচনা করেই বাংলা সাহিত্যে প্রথম সফল নারী হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছেন তিনি।
পুরনো বাংলার ইতিহাস ঘেটে নারীদেরকে ‘দেবী’সম্বোধনের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু সে অর্থে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ধারায় নারীদের বিশেষ কিছু করতে দেওয়া হয় নি সহস্র বছর। বাংলার মুসলিম সমাজে এ অবস্থা আরো শোচনীয় ছিলো। একাধারে প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক বেগম রোকেয়া নানান প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক কুসংস্কার থেকে মুসলিম নারী সমাজকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন।
১৯০২ সালে পিপাসা নামক গদ্য রচনায় সাহিত্য জীবন শুরু হয়। এরপর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ তো বিশ্ব নারীবাদী সাহিত্যের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়। তার লেখায় বিজ্ঞান সম্পর্কে অবাধ আগ্রহের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। আবার একই সাথে তৎকালীন নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থানের কথাও উঠে এসেছে তারসাহসী হাতে। তার লেখাগুলো গ্রন্থাকারে আসার আগেনবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
‘সুলতানার স্বপ্ন’ প্রথম কোনো বাঙালি নারী সাহিত্যিকের লেখা সফল উপন্যাস। এটি বেগম রোকেয়া রচনা করেন ইংরেজি ভাষাতে। ১৯০৫ সালে ‘সুলতানাস ড্রিম’ মাদ্রাজের দ্য ইন্ডিয়ান লেডিস পত্রিকাতে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯০৮ সালে পুস্তিকা এবং ১৯২২ সালে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাকারে ‘মতিচুর’ দ্বিতীয় খন্ড হিসেবে আসে। ‘সুলতানার স্বপ্ন’সে সময়ের বাঙালি নারীদের প্রেক্ষিতে গভীর কাল্পনিক শক্তির প্রতিফলন। রোকেয়ার প্রাথমিক জীবনের শিক্ষার পথে বাধা তার এই মনঃসমীক্ষণের জন্ম দেয় বলে ধারণা করা যায়।
এই উপন্যাসে রোকেয়া কল্পনার চোখে দেখা এক দেশের বর্ণনা দিয়েছেন যার নাম নারীস্থান। যেখানে শ্রেণীবদ্ধকরণ সমাজে নারী-পুরুষের যে সাধারণ সরলীকৃত ধারণা তা বদলে গেছে। নারীরা হয়ে উঠেছে পুরুষের চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ সব কিছুই নারী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আর সেখানে পুরুষেরা ঘরে থাকেন। একই সাথে তিনি দেখিয়েছেন এই সমাজে অপরাধ নেই ;এখানকার ধর্মই সত্য, সুন্দর আর মঙ্গলের। ভালোবাসা ও সত্যই এখানে সময়কে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। সে সময়ের প্রেক্ষিতে এ গ্রন্থের ভাষ্য ছিল যুগান্তকারী সাহসী লেখা।
‘সুলতানার স্বপ্নে’র সাফল্যের সূত্র ধরে ১৯৩১ সালে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তি ‘অবরোধবাসিনী’। মুসলিম সমাজে নারীদের ঘরে অবরুদ্ধ থাকার সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে লেখা গল্পের সমাহার এটি। মোট ৪৭টি বাস্তব ঘটনাকে অণুগল্প আকারে লিখে স্থান দিয়েছেন এ গ্রন্থে। পর্দাপ্রথার দুর্ভোগ আর এ নিয়ে নারীদের মানসিক অবস্থান গ্রন্থটির মাধ্যমে সকলের সামনে উন্মোচিত হয়।
এ ছাড়াও সামজিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে লেখা প্রবন্ধ সংগ্রহ মতিচুর (২ খন্ড) ও ১৯২৪ সালে‘পদ্মরাগ’ নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন। সেগুলোও ব্যপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।
ব্যাক্তিজীবনে নিজের প্রচন্ড সংগ্রাম এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইতে ঘাত-প্রতিঘাতের শিকার হয়েছেন বারবার। তবে মাথা নত করেন নি কোন অন্যায় প্রথার সাথে। আমৃত্যু করে গেছেন মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং তা ছড়ানোর প্রচেষ্টা।
১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণকারী বেগম রোকেয়া সাখওয়াত হোসেন ঠিক ৫২ বছর পর ১৯৩২ সালের৯ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিবছর এ দিন রোকেয়া দিবস হিসেবে পালন করে বাংলাদেশ সরকার,দেওয়া হয় বেগম রোকেয়া পদক। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ জরিপে বেগম রোকেয়া অধিষ্ঠিত হন ষষ্ঠ স্থানে।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anmrifat14@gmail.com