logo

বৃত্তের বাইরের ভাবনা ও স্টার্টআপ

অনিন্দিতা চৌধুরী | Wednesday, 22 December 2021


চাকরি নামের সোনার হরিণের পেছন ছুটে ছুটে ক্ষয়ে যাচ্ছে জুতোর শুকতলা। ‘কর্ম খালি নাই’ নোটিসে নিভে যাচ্ছে অনেকেরই আশার বাতি। অনেকটা পড়াশোনা করেও নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার অনেক নিচের মাপকাঠিতে মানিয়ে চলতে হচ্ছে, অনেকটা সমঝোতা করেই কাটিয়ে দিতে হচ্ছে জীবনের স্বর্ণালি সময়টুকু। কিন্তু এক দল তরুণ এই ‘রেস’ থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছেন। নিজের ভাগ্যের চাবিকাঠি তুলে নিয়েছেন নিজেরই হাতে। বৃত্তের ভেতরেই সীমাবদ্ধ না থেকে নিজের চিন্তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, বিস্তৃত করেছেন নিজের চলার পথ।

বর্তমান যুগে বেশ পরিচিত শব্দ ‘স্টার্টআপ’, বাংলা পরিভাষায় ‘উদ্যোগ’। এই স্টার্টআপের মূল হোতা, অর্থাৎ উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল কেন ও কীভাবে তারা এই পথ বেছে নিয়েছেন। কিছু প্রাপ্তি, কিছু বন্ধুর পথ- আলাপে থাকছে সবটাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে সদ্য মাস্টার্স শেষ করলেন মামুনুর রহমান। বিভিন্ন কাস্টমাইজড উপহার সামগ্রী নিয়ে শুরু করা তার এই উদ্যোগটির নাম ‘গিফটিজম’। নিজের উদ্যোগ নিয়ে মামুনুর জানান,

“অনেকেই উপহারসামগ্রী নিয়ে ব্যবসা করে। আমি ভেবেছি, যদি প্রিয় মানুষের ছবি বা তার জন্য কোনো লেখাই যদি উপহার হিসেবে চলে যায়- তাহলে কেমন হয়! তাই আমি কাস্টোমাইজড প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ শুরু করি। লেদারের ডায়েরি নিয়ে যাত্রা শুরু। কাস্টোমাইজড লেদারের ডায়েরি বাংলাদেশে আমরাই প্রথম তৈরি করে থাকি, এবং বাকি পণ্যগুলোর ক্ষেত্রেও মানের দিক দিয়ে আপোস করি না।”

ব্যবসা না চাকরি?- এমন প্রশ্নের উত্তরে নিজের দৃঢ় সংকল্পের পাশাপাশি মামুনুর তুলে আনেন সমাজের এক কঠোর বাস্তবতার কথাও,

“চাকরি করার কোনো ইচ্ছে নেই। এখন অব্দি কোনো চাকরির জন্য ফরম তুলিনি। ব্যবসায় আমি খুব সন্তুষ্ট। নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করতে পারছি। চাকরি মানেই ‘সফল’, তা আমি মনে করি না। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমি প্রায়ই প্রশ্ন শুনি, ‘চাকরি না করে ব্যবসা কেন?’ আমারও মনে প্রশ্ন জাগে, যারা চাকরি করে, তাদের কি কখনো প্রশ্ন করা হয়- ‘ব্যবসা না করে চাকরি কেন?’ চাকরির পড়াশোনা বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীকে সবাই যেমন সাহস দেয়, সমর্থন করে, তেমনি উদ্যোক্তাদেরকেও মনোবল যোগানো উচিত।”

এই উদ্যোক্তা মনে করেন, ব্যবসা সম্পর্কে জানা বা শেখার কোনো শেষ নেই। নির্দিষ্ট সময়ে লক্ষ্য পূরণ হলে নিতে হবে নতুন লক্ষ্য, পূরণ না হলে তাতে আরো বেশি পরিশ্রম ঢেলে দিতে হবে। মামুনুর বিশ্বাস করেন, ব্যবসায় যত বাধা, তত সাফল্য। নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি তিনি তিনি স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার আহ্বান জানান, “উদ্যোগ যত ছোটই হোক, তা নিয়ে চিন্তাটা বড় রাখুন।”

একই বিভাগের শিক্ষার্থী; সদ্য অনার্স শেষ করেছেন শেহেরিন আমিন সুপ্তি। তিনি করোনাকালে নিজের ব্যবসার পত্তন ঘটান। তার উদ্যোগ ‘খুশ’-এর মাস্কগুলো পরে ‘খুশ’ হওয়া গ্রাহকদের ছবি দিয়ে ভরে ওঠে পরিচিতদের সামাজিক মাধ্যমের নিউজফিড। ক্রমেই মাস্ক পরিহিত খুশের হাসি ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। এই পণ্য বেছে নেবার পেছনের গল্পটা জেনে নিই সুপ্তির মুখেই,

“করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে শুরু থেকেই সচেতন ছিলাম। কিন্তু সার্জিক্যাল বা অন্যান্য মেডিকেল মাস্কগুলো পরে আরাম পেতাম না, বেশিক্ষণ পরে থাকতে পারতাম না৷ ধুয়ে আবার ব্যবহার করারও সুযোগ ছিল না। তখন আমার মা আমাদের জন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী কাপড়ের মাস্ক বানিয়ে দেন। এই মাস্কগুলো সারাদিন পরে থাকতেও কষ্ট হতো না, আর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি ছিল বলে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে চিন্তাও থাকতো না। বর্তমানের অপরিহার্য অনুষঙ্গটিকে সবার কাছে আরামদায়ক ও সহজলভ্য করতেই এ পণ্য বেছে নিয়েছি।”

মুমতাহিনা মাহবুব তিরানা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে বিএসসি সম্পন্ন করেছেন। নিজের নামের সাথে মিল রেখে তিনি প্রিয় উদ্যোগটির নাম রেখেছেন ‘তিরুয়ানা’। তার ঝাঁপিতে আছে ছিমছাম সব গয়নার সমাহার। নিজে গয়না কম পরলেও লোকে বেশি পরে- এমন মজার ভাবনা থেকেই মূলত হাতে তৈরী গয়নার কাজ শুরু করেছিলেন তিনি।

অনলাইন ব্যবসায় আসা বেশ কিছু বাধার দিকে আঙুল তোলেন তিরানা, “বাধা বা ঝামেলা শুরুর দিকে ছিল টুকটাক। সোর্সিংয়ের ব্যাপারটা ঠিকঠাক বুঝে গুছিয়ে উঠতে সময় লাগে। আশেপাশে প্রচুর আজেবাজে সোর্স, ঠিকটা বের করা লাগে। অন্যের কথাকে পণ্যের গুণগত মানের মাপকাঠি না ধরে নিজেরই অভিজ্ঞতাটাই কাজে লাগে শেষমেশ। এগুলা কারো জন্য খুব দ্রুত হয়, কারো জন্য সময়সাপেক্ষ ব্যাপার৷ ধৈর্য থাকতে হবে। আরেক বড় বাধা আমাদের ডেলিভারি সার্ভিসগুলোর সেবামান। সেক্ষেত্রে এখনো ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছি।”

তবে তিনি তার এ উদ্যোগ নিয়ে বেশ আশাবাদী, “নির্দিষ্ট ধাঁচের গয়না পেতে গ্রাহকেরা বারবার তিরুয়ানায় ফিরে আসে, এটাই আমার সাফল্য। এছাড়া, পরিকল্পনামাফিক পরিশ্রম করতে পারলে আসলে চাহিদামতো মোটামুটি উপার্জন আসে অনলাইন উদ্যোগে।”

অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। anindetamonti3@gmail.com