বিষাদ ও বিদ্রোহের কবি সুফিয়া কামাল
মোজাক্কির রিফাত | Saturday, 20 November 2021
এক একটা দেশ থাকে মানচিত্রেই শুধু রাখা
কারুর নয়নে থাকে স্বদেশের ছবিখানি আঁকা
আমি সেই স্বদেশের ছবি দেখি আপনার মুখে
সুফিয়া কামাল মানে বাংলাদেশের ছোঁয়া বুকে
-কবীর সুমন
কবীর সুমনের এই গীতি কবিতায় স্পষ্ট হয় বাংলাদেশের সাথে সুফিয়া কামাল নামটি কতটা নিবিড়ভাবে জড়িত। সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের নারী জাগরণের অন্যতম প্রধান অগ্রদূত। একইসাথে প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবেও শ্রদ্ধার আসনে বিরাজমান তিনি।
১৯৯৯ সালের ২০শে নভেম্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান ‘সাঁঝেরমায়া’ কাব্যগ্রন্থের লেখিকা, সুফিয়া কামাল। অপরিসীম ধৈর্য ও সাহসে প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করে এতদূর পথ এসেছিলেন; সর্বাধিক পরিচিতি পেয়েছিলেন জননী সাহসিকা নামে।
কবি বড় হয়েছিলেন নবাবী ঐশ্বর্যের মাঝে; যা সুবিধার পরিবর্তে অসুবিধা ই করেছে ঢের বেশি। তখনকার দিনে উচ্চবিত্ত সমাজে নারীদের বাইরে পড়াশোনা শেখার সুযোগ ছিলোনা। আবার নবাবী পরিবারে অন্দরমহলে বাংলা পড়ার ও সুযোগ ছিলোনা। প্রথম স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাহায্যে জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হন সুফিয়া কামাল। স্বামীর উত্সাহ ও অনুপ্রেরণায় বালিকাবধূ সুফিয়ার লেখার গতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
১৯৩২ সালে স্বামীর অকাল মৃত্যুতে তার জীবনে নেমে আসে চরম দুর্যোগ ও দুর্ভোগ। এর ও আগে মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার নিরুদ্দেশ যাত্রা সুফিয়া কামালের মনোজগতে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলে। এই মনোজাগতিক যন্ত্রণা, একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা আর সংগ্রামের কথা বারবার উঠে এসেছে তার গল্পে, কবিতায়।
মনের গহীন প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে থাকা দুঃখবোধকে ধরে রাখেন অনেকেই; কেউ কেউ যত্ন করে পরিচর্যাও করেন। তবে প্রকাশের বেলায় অনন্য হয়ে উঠেছেন কবি সুফিয়া কামাল। বিষাদের উদাস করা বাতাস মেখে লিখেছেন,
শেষ রশ্মি করে তব বিদায়ের ব্যথিত চুম্বন
পাঠায়েছ। তরু শিরে বিচিত্র বর্ণের আলিম্পন
করিয়াছে উন্মন অধীর
মৌনা, বাক্যহীনা, মূক বক্ষখানি স্তব্ধ বিটপীর।
- (সাঁঝের মায়া)
প্রচলিত মত বলে, সময় আর নদীর স্রোতকে আটকে রাখা যায়না। তবে সাহিত্যশিল্পে সেকথা মানেননি শিল্পী সুফিয়া কামাল। বিষাদের তুলির আঁচড়ে এঁকে শব্দ গেঁথে ধরে রেখেছেন সময়কে, কাছের মানুষকে।
এরপর সময় পেরিয়েছে; কবিতায় প্রশংসা ও আশীর্বাদ পেয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সান্নিধ্য পেয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও। সময়ে সময়ে অগ্নিমূর্তিরুপে কবিতায় জায়গা পেয়েছে সময় আর রাজনীতিও। এরই মধ্যে স্বামী মৃত্যুর শোককে ধরে লিখেছেন,
কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারিনা
কোনমতে।
- (তাহারেই পড়ে মনে)
এই বিষাদপর্বের পর সুফিয়া কামালের জীবনে রাজনৈতিক সাহিত্য সৃষ্টিতে সবথেকে বড় নাড়া দিয়েছে ভাষা আন্দোলন। তার সাহিত্যজীবনে এত বেশি লেখা আর কোন বিষয় নিয়ে লেখেননি তিনি। বাংলা একাডেমি ১৯৯১ সালে ‘একুশের সংকলন: গ্রন্থপঞ্জি’নামে একটি বই প্রকাশ করে, যেখানে সুফিয়া কামাল রচিত একুশের ৬৫ টি কবিতা স্থান পায়।
সাহিত্যের পাশাপাশি সেই পাকিস্তান আমল থেকেই মৌলবাদ আর অপশক্তির বিরুদ্ধে রাজপথে, কলমে সোচ্চার জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল। এর জন্য রোষের মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। ১৯৬৫ সালে সরাসরি বিরোধিতা করেছেন ইয়াহিয়া খানের। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকায় অনুষ্ঠিত মহিলা সমাবেশের। সর্বশেষ নব্বই দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
২২ বছর আগে এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটলেও তারই লেখার স্বর ধরে কালের যাত্রার ধ্বনি হিসেবে বাংলাসাহিত্যে, নারীজাগরণে, মননের অবদানের বিষাদময় বিদ্রোহী ডাক প্রতিধ্বনিত হয়; জননী সাহসিকা সুফিয়া কামালের নাম অমর হয়ে রয়ে যাবে এভাবেই।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথমবর্ষে অধ্যয়নরত।
anmrifat14@gmail.com