logo

বিশ্বের একমাত্র হাতেলেখা পত্রিকা, দাম ৭৫ পয়সা

হাসান সজিব | Tuesday, 11 January 2022


সংবাদপত্র বলতে আমরা বুঝি ছাপাখানার মুদ্রণযন্ত্র থেকে সাদার উপর কালো অক্ষরে ছেপে আসা একগুচ্ছ কাগজ, যেখানে বিভিন্ন পাতায় দেশ-রাজনীতি-অর্থনীতি-খেলাধুলার দৈনিক তামামি বর্ণনা করা হয়।

একবিংশ শতাব্দীর গত দশকের শুরু থেকে বিজ্ঞানের দ্রুত বিকাশ-- ছাপাখানা থেকে বের হয়ে আসা এসব কাগুজে পত্রিকার প্রতি মানুষের অনাগ্রহের সৃষ্টি করেছে।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপের স্ক্রিনই হয়ে উঠেছে সংবাদপ্রাপ্তির প্রথম পছন্দ। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সকল সংবাদপত্রও চলে এসেছে ডিজিটাল মাধ্যমে।

আজকাল আর স্টাডি টেবিলে পেপারওয়েট বা পানিতে ভিজিয়ে রাখা স্পঞ্জ পাত্রের দরকার হয় না, দরকার হয় না পাতা উল্টানোর। কারণ এক ক্লিকেই প্রয়োজনীয় যেকোন নিউজ চলে আসে হাতের মুঠোই থাকা ফোন/ট্যাবলেটের স্ক্রিনে।

তবে প্রযুক্তির এত এত বিকাশকে একরকম বুড়ো আঙুল দেখিয়েই সম্পূর্ণ হাতে লেখা একটি পত্রিকা গত ৯৪ বছর ধরে আজ অবধি চলে আসছে। সম্ভবত এটিই বিশ্বে টিকে থাকা একমাত্র হাতে লেখা পত্রিকা। বলা হচ্ছে ভারতের চেন্নাইভিত্তিক পত্রিকা 'দ্য মুসলমান' (The Musalman) এর কথা।

দোয়াত কলমে উর্দুভাষার চমৎকার ক্যালিগ্রাফিতে লেখা এই পত্রিকার পাঠকসংখ্যা একুশ হাজার। চার পাতার সান্ধ্যকালীন এই পত্রিকাটি ছাপা হয় প্রতিদিন, দাম মাত্র ৭৫ পয়সা (.৭৫ ভারতীয় রুপি)

বঙ্গোপসাগরের তীরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪ মিটার উপরে অবস্থিত চেন্নাইয়ের ট্রিপলিকেইন মহল্লায় ১৯২৭ সালে সৈয়দ আজমতউল্লাহ এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনা করেন। পূর্বে মুসলমানদের কোন পত্রিকা ছিল না, তাই এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করার সময় তিনি ভেবেছিলেন মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দ্দশা এবং সকল আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে 'দ্য মুসলমান'। ট্রিপলিকেইন মহল্লা আজও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে চেন্নাইয়ে সুপরিচিত।

আজমতউল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র সৈয়দ ফয়জুল্লাহ পত্রিকাটি সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। বর্তমানে সৈয়দ পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম, আজমতউল্লাহর নাতি, ফয়জুল্লাহর ছেলে, সৈয়দ আরিফুল্লাহ পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছেন।

সান্ধ্যকালীন পত্রিকা হওয়ায় আরিফুল্লাহ প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলোকে নির্বাচন করেন। জাতীয়, আন্তর্জাতিক, ধর্মীয় বা বিশেষ ঘটনার নিউজগুলো আলাদা করা শেষে দুইজন অনুবাদক সেই নিউজগুলোকে উর্দুতে অনুবাদ করেন। অনুবাদ করা খসড়া নিউজগুলো চলে যায় ক্যালিগ্রাফারদের কাছে।

'দ্য মুসলমান' পত্রিকায় ২ জন নারী ও একজন পুরুষ ক্যালিগ্রাফার কাজ করেন, যাদেরকে 'কাতিব' সম্বোধন করা হয়।

কাতিবরা ব্রডশীটে নিজ হাতে দোয়াত কলমের অসাধারণ ক্যালিগ্রাফিতে উর্দু ভাষায় ফুটিয়ে তোলেন সবগুলো সংবাদ। এই অনন্যসাধারণ ক্যালিগ্রাফিই হল 'দ্য মুসলমান' পত্রিকার প্রাণ।

শ্রমসাধ্য এই ক্যালিগ্রাফি শেষ হলে, তাতে ছবি যুক্ত করে ব্রডশীট থেকে নেগেটিভে রূপান্তর করা হয়। এরপর তা চলে যায় ছাপাখানায়। প্রতিদিন ছাপানো প্রায় একুশ হাজার সংখ্যক, যা সন্ধ্যার মধ্যে চলে যায় পাঠকদের হাতে হাতে এবং মূল্য রাখা হয় মাত্র ৭৫ পয়সা (ভারতীয় রূপি)। এটিই ভারতের; সম্ভবত বিশ্বেরও সর্বনিম্ন মূল্যের কোন পত্রিকা।

সবধরণের নিউজের পাশাপাশি মুসলিম ও ইসলাম ধর্মভিত্তিক নিউজগুলো অগ্রাধিকার পায় 'দ্য মুসলমান' পত্রিকায়। চেন্নাই, দিল্লী, কলকাতা তথা সারা ভারতব্যাপী, মুসলিম-অমুসলিম অনেকেই দ্য মুসলমান পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। দূরবর্তী পাঠকদের জন্য প্রতিদিন কুরিয়ার করে দেয়া হয় পত্রিকাটি।

পত্রিকাটি ইংরেজি ও উর্দুভাষায় অল্প কিছু বিজ্ঞাপন ব্যতিত একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ অনুসরণ করে চলে। যেমনঃ প্রথম পাতায় কিছু আন্তর্জাতিক খবরের পাশাপাশি প্রধান খবরগুলো ছাপা হয়, দ্বিতীয় পাতায় সম্পাদকীয়, বাকি দুই পাতায় আঞ্চলিক সংবাদ আর বিজ্ঞাপন। তবে সোমবারের সংখ্যায় আলাদা করে কোরান ও ইসলামের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়।

এভাবেই গত ৯৪ বছর ধরে প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে 'দ্য মুসলমান'। এমনকি দেশভাগের সময়ও পুরোদমে কাজ করে গেছে পত্রিকাটি। 'দ্য মুসলমান' এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর হাতে লেখা অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি। এই অনন্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় পত্রিকাটিকে অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমে আনতে এখনো অনাগ্রহী 'দ্য মুসলমান' এর কর্তাব্যক্তিরা।

ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া ক্যালিগ্রাফি, ভারতে দিন দিন উর্দুভাষার চর্চায় ভাটা পরা আর প্রযুক্তিনির্ভর পরবর্তী প্রজন্মদ্য মুসলমান-এর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কতটুকু ধরে রাখতে পারবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

sojib.mhs@gmail.com