বিশ্ব শরণার্থী দিবস - যেই হোক, যেখানেই হোক, যখনই হোক
মোঃ ওমর ফারুক তপু | Monday, 20 June 2022
২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট, গভীর রাত তখন। আচমকা বাংলাদেশ সীমান্তে ঢল নামে মিয়ানমার থেকে আসা একদল মানুষের। সে রাতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা তাদের ঠেলে পাঠিয়ে দেন আবার মিয়ানমার সীমান্তের দিকে। তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি পরদিন সকাল থেকে কী হতে যাচ্ছে।
ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৫ আগস্ট, ২০১৭ থেকেই সীমান্তে ঢল নামে হাজারো মানুষের। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বোঝা হয়ে গেছে যে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে আসা রোহিঙ্গাদের কথা বলা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছে।
আজকে বিশ্বব্যাপী পালিত হওয়া শরণার্থী দিবস তো তাদেরই জন্য। কিন্তু শরণার্থী কাদের বলা হয়ে থাকে? চাইলেই কী যে কাউকে শরণার্থী বলা যাবে?
জেনেভা কনভেনশন থেকে শরণার্থীর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি তার জাতি, ধর্ম, নাগরিকতা, বিশেষ সম্প্রদায়, অথবা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে নিপীড়নের সম্মুধীন হন এবং নিজ দেশ থেকে পলায়ন করে অন্য দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন তবে সে শরণার্থী হিসেবে গণ্য হবেন।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন। শরণার্থী সমস্যার মূল কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বৈরিতা। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে শরণার্থী হিসেবে যারা আছেন তাদের বেশিরভাগেরই নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের জের ধরে নতুন করে লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হচ্ছে। এছাড়া ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে বেশ কয়েক বছর ধরেই লাখো ফিলিস্তিনি নাগরিককে কিছুদিন পরপরই বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে হয়।
কয়েক বছর আগ পর্যন্ত শরণার্থী সমস্যা নিয়ে শুধুমাত্র অন্যান্য দেশের খবর শোনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও শেষ ৫ বছরে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের চিত্র সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দিয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যা। কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রায় ৫ বছর ধরে বসবাস করে আসছে যা সেখানকার স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।
সরকার বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠানোর চেষ্টা করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের নিয়ে যেন এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় পড়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও এক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, ইউএনএইচসিআর বারবার বলছে যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে পুনরায় পাঠাতে হলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি জোরদার করতে হবে এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের প্রতি তাদের ভূমিকা একদমই দৃঢ় নয়। ফলে বারবার চেষ্টা করেও রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারো আজকের এ দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে। এ দিনটি পালিত হয় যাতে করে শরণার্থীদের অধিকার নিশ্চিতে সবাই সচেষ্ট হয়, তাদের মানবেতর জীবনযাপন না করতে হয়। এ বছরের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য - “যেই হোক, যেখানেই হোক, যখনই হোক। প্রত্যেকের নিজের সুরক্ষা চাওয়ার অধিকার রয়েছে।“
অর্থাৎ যে কেউ হোক না কেনো, প্রত্যেক শরণার্থীর সম্মানের সহিত বাঁচার অধিকার রয়েছে। যে কেউ সুরক্ষা চাইতে পারে, তার বিশ্বাস যাই হোক না কেনো। সুরক্ষা চাওয়া প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার।
তারা যেখান থেকেই আসুক না কেন, পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আন্তরিকতার সাথে আশ্রয় দেয়া উচিৎ। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য অনুকরণীয়।
পৃথিবীতে চলমান শরণার্থী সংকট দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহল থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো না। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যদি শরণার্থী সমস্যা দূর করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসে তবেই কেব এই দিবসটি সার্থক হবে।
মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com