logo

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তুষ্ট করতে আইনে পরিবর্তন আনছে সৌদি আরব

এফই অনলাইন ডেস্ক | Monday, 8 November 2021


বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ দূর করতে যারপরনাই চেষ্টা চলছে- সৌদি আরবের কর্তারা এমন দাবি প্রায়ই করেন। বিনিয়োগকারীরা যদি সৌদি আরবে বসবাস করতে চায়, তাদের সন্তানরা কোথায় শিক্ষা লাভ করবে? দেশটিতে পশ্চিমা মানদণ্ডে খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আকাল রয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশটিতে শাখা খুলতে প্রলুব্ধ করছে। যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ রিয়াদে একটি শাখা খুলতে সম্মত হয়েছে। স্পেনের নামজাদা এসইকে এডুকেশন গ্রুপও একইভাবে সম্মত হয়েছে। কিং আবদুল্লাহ ফিনান্সিয়াল ডিসট্রিক্ট (কেএএফডি) এ সব প্রতিষ্ঠান শাখা খুলবে। 

রিয়াদ ১৫ বছর আগে কেএএফএডি-র প্রথম ঘোষণা দেয় এবং এর নির্মাণ তৎপরতা এখন শেষ পর্যায় পার হচ্ছে। একে এখন তুলে ধরা হয় রিয়াদের উন্নয়নের দর্শনীয় আদল হিসেবে। বিদেশি গোষ্ঠীগুলোকে আকর্ষণ করার জন্য একে বিশেষ বিনিয়োগ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার নকশা আঁকা আছে। আর কর দেওয়ার দৃষ্টি থেকে দেখলে উপকূলীয় কেন্দ্রগুলো (অফসোর সেন্টার) কর রেয়াতের যে সব সুযোগ করে দেয় এখানে তেমন সুবিধার ঘাটতি হবে না। দেওয়া হয়েছে এমন সব আশ্বাস। এদিকে, কেএএফডি-র পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইন-কানুন এখনো সৌদি কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত করেনি। কিন্তু রিয়াদের জন্য ২৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে ছয় লাইনের মেট্রোও রয়েছে।  কাজটি এখন শেষ হওয়ার পথে। তবে ঠিকাদারদের টাকা মিটিয়ে দেওয়া নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলা চলছে। আর মেট্রোর কাজের গতি গেছে কমে। এ সব কথা শোনান প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ।

রিয়াদের আকাঙ্ক্ষায় স্থান করে নিয়েছে বড় মাপের কোম্পানিগুলো। মোটর গাড়ি নির্মাতা, বিমান নির্মাতা, ভোগ্যপণ্য নির্মাতা, জৈবপ্রযুক্তি, ওষুধ এবং সবুজ জ্বালানির সঙ্গে জড়িতরা কেএএফডি-তে তশরিফ আনুক। এমনই আকাঙ্ক্ষা রিয়াদের। তাদেরকে প্রলুব্ধ করে এখানে নিয়ে আসতে গেলে অনেক তেল পোড়াতে হবে। বাংলা প্রবাদে রাধার নাচ দেখতে যে পরিমাণ তেল পোড়ানোর  কথা বলা হয়েছে তাকেও ছাড়িয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞজনরা বলেন, এটাই হবে রিয়াদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সৌদি বিনিয়োগ মন্ত্রী খালিদ আল ফালিহ মনে করেন, সৌদি আরবে বিস্তর সুযোগ সুবিধা রয়েছে। যেমন, পর্যাপ্ত ভূমি, সস্তা জ্বালানি, লোহিত সাগরের বন্দর- এই বন্দর ব্যবহার করে মালবাহী জাহাজ ভিড়ের হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যাতায়াত করতে পারবে। এ ছাড়া সৌদি আরবে রয়েছে তেলরাসায়নিক শিল্পমালা বা পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস। এ  শিল্পের কল্যাণে অনেক নির্মাণ কারখানার কাঁচামালের যোগান নিয়ে ভাবতেই হবে না। গোটা সৌদি আরব জুড়ে মুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার ছকও তৈরি করা হয়েছে। আগে, এ ধরণের সফল মুক্ত অঞ্চলের আদল (মডেল) কে কাজে লাগিয়েছে আমিরাত। এদিকে বিদ্যুৎ-গাড়ি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান লুসিড ২০২৪’এর মধ্যে সৌদি আরবে গাড়ি উৎপাদন করতে সম্মত হয়েছে। তবে এ কোম্পানির বেশির ভাগের মালিক হলো সাড়ে চারশ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে গঠিত সৌদি স্বতন্ত্র সম্পদ তহবিল পাবলিক ইনভেসমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ)।

রিয়াদে আলোচনার সময় সৌদি বিনিয়োগ মন্ত্রী বলেন, কোম্পানি কিনে কেএএফডি-তে নিয়ে এসে স্থাপন করার আদল (মডেল) খোলা রাখা হয়েছে। তবে একগুচ্ছ সুযোগ-সুবিধা এবং প্রণোদনা যুগিয়ে কোম্পানিগুলোকে সৌদি আরবে আসার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরবের আকর্ষণীয় মূল্যবান প্রস্তাবে কোম্পানিগুলোকে রাজি করানোর চেষ্টায় কোনো খামতিই রাখবে না রিয়াদ। সৌদিতে কারখানা স্থাপন করলে আমদানির হাঙ্গামা থেকে বাঁচা যায়। কেবল এই উচ্চাভিলাষ নয় বরং সৌদি আরবকে বৈশ্বিক সরবরাহ শিকলের অংশ হিসেবে মানুষ দেখতে শুরু করুক তাই কামনা রিয়াদের।

মন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয় যে আমিরাত আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণের কাজ কয়েক দশক আগেই শুরু করেছে সে অবস্থায় দেশটির সাথে প্রতিযোগিতায় নামার কথা কি করে চিন্তা করতে পারছে সৌদি আরব? জবাবে মন্ত্রী ফালিহ বলেন, আমিরাতের সাথে পাশাপাশিই বাড়তে পারে সৌদি আরবও। তা ছাড়া, সৌদি আরব সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থানে রয়েছে। একবার শুধু  ভালো করে মানচিত্রের দিকে তাকান। 

সুযোগ-সুবিধা এবং প্রণোদনা পর্যাপ্ত মাত্রায় হলে সৌদি আরবের পক্ষেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। এমন মন্তব্য করে পশ্চিমা এক নির্বাহী। তিনি আরো বলেন, সস্তা বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের অবকাশ থাকতে হবে। করের হার থাকতে হবে কমমাত্রায় এবং নিত্যপণ্যে ভর্তুকি দিতে হবে। তবে এর মধ্যেই ওসব সুযোগের অনেকাংশই তুলে নেওয়া হয়েছে। ভর্তুকি বাতিল করা এবং বিদেশি শ্রমিকদের বদলে ব্যয়বহুল এবং কখনো কখনো কম দক্ষ সৌদিদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য কোম্পানিগুলোর ওপর সৌদি কর্তৃপক্ষ যে চাপ দিচ্ছে তার প্রতি ইঙ্গিত করেই এ সব কথা ব্যক্ত করা হয়।

তিনি আরো বলেন, যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) পরিকল্পনার এবং স্বপ্ন ধারণ করে  সৌদি মন্ত্রণালয়গুলো বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করছে। কিন্তু এক মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে আরেক মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রার ঠোকাঠুকি হচ্ছে।

তিনি জানান, সৌদি সরকারের কথা ও কাজে অনেক অসঙ্গতি রয়েছে। বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বললে মনে হবে দেশটি বিনিয়োগের স্বর্ণভূমি। সৌদি আরবে কর্মরত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কথা বললে মনে হবে নরক গুলজার! তিনি বলেন, এই দৃশ্যপটের কোনো কোনো অংশ চমৎকার। সৌদি আরবের কোনো কোনো সংস্কারকে খুবই উত্তম বলতে হবে। কিন্তু পাওনা মেটাতে দেরি করা, অহেতুক আমলাবাজি বা আমলাদের ঝামেলা করার মতো পুরানো মানসিকতা এবং বদ অভ্যাসগুলো এখনো এঁটে আছে দেশটিতে।

এদিকে, আমিরাতও হাত-পা গুটিয়ে বসে নেই। তারা রিয়াদের পরিকল্পনা কোন দিকে যায় তা দেখার জন্য অপেক্ষার ধার ধারছে না। নতুন প্রতিযোগিতার মুখে দাঁড়িয়ে দেশটির কর্তারা এরই মধ্যে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রবাসীদের দীর্ঘ মেয়াদি ভিসা দেওয়া, বিদেশিদের কোম্পানির পুরোপুরি মালিক হতে দেওয়ার মতো নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে আমিরাত। এদিকে, বিদেশিদের তুষ্ট করার জন্য লোহিত সাগরের পর্যটন প্রকল্প এবং কেএএফডি’র মতো অঞ্চলগুলোসহ সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে মদের অনুমতি সৌদি আরবে দেওয়া হবে বলে জোর গুজব। ওদিকে, বিদেশিদের মনতুষ্টিতে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে আমিরাত বিবেচনা করবে না বলেও গুজব উড়ছে। এ ছাড়া, কার্য সপ্তাহ রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পরিবর্তন করে সোমবার থেকে শুক্রবার করার কথাও ভাসছে বাতাসে ।

পশ্চিমা সাবেক এক কূটনীতিবিদ বলেন, যুবরাজ মুহাম্মদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে চোখে একরাশ উদ্বেগ নিয়ে সে দিকে নজর রাখছে সৌদি পড়শিরা।

অ্যারাব গাল্ফ স্টেটস ইন্সটিটিউটের সিনিয়র রেসিডেন্ট স্কলার ক্রিস্টিন স্মিথ দিওয়ান বলেন, “সৌদি আরব ভেঙ্গে পড়লে তার পরিণতি কি হবে তা নিয়ে এককালে দুঃচিন্তায় ভুগেছে প্রতিবেশী দেশগুলো। কিন্তু সৌদি আরব যদি গায়ের জোরে দেখাতে শুরু করে তখন কি হবে- এখন এ নিয়ে তারা মাথা ঘামাচ্ছে।” তিনি আরো বলেন, নিশ্চিত ভাবেই সবাই বুঝতে পারছে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে দৃঢ় ভূমিকা নিতে সৌদি নেতারা দ্বিধা করবে না। বা ভয় পায় না।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা ]


আরো পড়ুন:

অর্থনৈতিক বাহুবল খাটাতে চাইছে সৌদি আরব

সৌদিতে বিদেশি বিনিয়োগ: সামাজিক দায়ের টানাপড়েন