বাড়তি তারল্য সরিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
আজ ৩০-দিন মেয়াদী বিলের নিলাম
সিদ্দিক ইসলাম | Wednesday, 11 August 2021
প্রণোদনা গুচ্ছ বা প্যাকেজ থেকে বাজারে অর্থের বিপুল প্রবাহ ও বেসরকারি বিনিয়োগে অচলাবস্থার প্রেক্ষিতে, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার অন্যতম উপায় হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত তারল্য ব্যাপকহারে তুলে নেওয়ার কাজটি আবার শুরু করেছে।
তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বিল’-এর নিলাম স্থগিত থাকার পর এটি আবার চালু করে এর মাধ্যমে গত সোমবার থেকে তারল্য তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু করা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর ফলে প্রথম দিনেই বাজার থেকে দুই হাজার ৬০৫ কোটি টাকা তুলে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতে যথাযথ তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য এই বিল বিক্রির প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। নিজেদের গৃহীত সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাকায় তাদের প্রধান কার্যালয়ে ৭-দিন ও ১৪দিন মেয়াদী বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের নিলাম করে বাজার থেকে এই পরিমাণ অর্থ (২,৬০৫ কোটি টাকা) তুলে নিল।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, সোমবার নিলামের প্রথম দিনে ৭-দিন মেয়াদী বাংলাদেশ ব্যাংক বিলে ইল্ড (সাধারণভাবে যা বিল বা বন্ডের সুদহার হিসেবে পরিচিত) বেঁধে দেওয়া হয় ০.৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৪-দিন মেয়াদী বিলে ইল্ড ছিল ০.৭৫ শতাংশ।
আরও জানা গেছে যে, নিলামে অংশগ্রহণকারীরা ৭-দিন মেয়াদী বিলের ক্ষেত্রে ০.৪৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২.৭৫ শতাংশ পরযন্ত হার সুদ দিতে চেয়েছিল। ১৪ দিন মেয়াদী বিলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ০.৬৪ থেকে ২.৯৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “নিলামে অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ছয় হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার নিলাম থেকে আমরা দুই হাজার ৬০৫ কোটি টাকার দরপত্র গ্রহণ করেছি।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তা আজ বুধবার অনুষ্ঠেয় ৩০ দিন মেয়াদী বিলের নিলামে দরদাতার সংখ্যা বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন। ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আরফান আলী দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা, আগামী নিলামে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিলের সুদহার আরও বেশি হবে।”
ঊর্ধ্বতন এই ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আগামী নিলামগুলোতে বিলের সুদহার বাড়ানো হলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিলামে অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়বে। আরফান আলী বলেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান খোলা-বাজার কার্যক্রমে সাফল্য আসবে যদি তারা বিলের নিলামের সময় সুদের হার যুক্তিসঙ্গতভাবে বাড়ায়।”
ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এমরানুল হক দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিলের সুদহার যদি আন্তঃব্যাংক কল-মানি বাজারের ‘ওয়েইটেড এভারেজ রেইট’ (ডব্লিউএআর) অতিক্রম করে, তবেই ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত তারল্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিলে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, গত বৃহষ্পতিবার আন্তঃব্যাংক কল-মানির গড় হার এর আগের কর্মদিবসের ২.২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.২৬ শতাংশ হয়েছে।
তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহকে বর্তমানের অবস্থায় না রেখে একটি ‘গ্রহণযোগ্য স্তরে’ রাখার চেষ্টা হিসেবে বাজার থেকে তারল্য তুলে নেবার কাজটি শুরু করেছে।
এ-বছরের ৩০ জুনের হিসাবে ব্যাংকগুলোর বাড়তি তারল্য ছিল সর্বকালের সর্বোচ্চ, প্রায় দুই লাখ ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতে নিম্ন ঋণ-প্রবৃদ্ধির ফলে তারল্যের এই বৃদ্ধি ঘটে যা দেশের স্থবির বিনিয়োগ-পরিস্থিতিরও নির্দেশ করে। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, সরকারের প্রণোদনা গুচ্ছ বা প্যাকেজ বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি ব্যাংকিং খাতে তারল্যের বৃদ্ধি ঘটিয়ে অর্থের প্রবাহে স্ফীতি এনেছে।
তাছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ক্রমাগতভাবে মার্কিন ডলার ক্রয় করে বাজারে নগদ তহবিলের জোগান দেবার ফলেও অতিরিক্ত তারল্য দেখা দিয়েছে বলে জানালেন ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রায় ৭৭০ কোটি মার্কিন ডলার ক্রয় করে ব্যাংকিং খাতে ৬৫ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার তহবিল সঞ্চার করেছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন যে, নিকট ভবিষ্যতে এই অতিরিক্ত তারল্য যদি অনুৎপাদনশীল বা কম-উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হয় তবে অর্থনীতির উপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।
siddique.islam@gmail.com