বাস্তবের অপরাধ জগতের ঘটনার ওপর নির্মিত সাত চলচ্চিত্র
সিরাজুল আরিফিন | Monday, 4 July 2022
আধুনিক জীবনের শিল্প সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ সিনেমা একদিকে যেমন বিনোদনের উৎস, অপরদিকে প্রতিবাদের ভাষাও বটে। চলচ্চিত্র নির্মাতারা জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে উপলব্ধি করে পর্দায় ফেলে উপস্থাপন করেন গোটা দুনিয়ার সামনে।
ভালো প্লটের ক্রাইম জনরার সিনেমা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় সবসময়ই। আর দারুণ একটা সিনেমার রোমাঞ্চ শতগুণে বেড়ে যায় যখন তা সত্য ঘটনাকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়।
অ্যামেরিকান গ্যাংস্টার (২০০৭)
এই সিনেমার প্লট যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার গ্যাংস্টার ফ্রাংক লুকাসের উত্তাল জীবন। ভিয়েতনামের যুদ্ধফেরত মার্কিন সামরিক বিমানে করে মাদক পাচার এবং দেশে মাদক ব্যবসার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা - এরই মধ্যে দিয়ে সময়ের সাথে ফ্রাংকের জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে সিনেমার পর্দায়।
ফ্রাংকের জীবনভিত্তিক এ চলচ্চিত্রের মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ডেনজেল ওয়াশিংটন। রিডলি স্কট পরিচালিত সিনেমাটি বক্স অফিসে দারুণ আলোড়ন তুলে প্রায় ২৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘরে তোলে।
বনি অ্যান্ড ক্লাইড (১৯৬৭)
হলিউড চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অন্যতম মাইলফলক এই সিনেমা। যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ আর্থিক মন্দার মধ্যে টেক্সাসের এক ক্যাফের পরিচারিকা বনির সাথে পরিচয় হয় টেক্সাসেরই আরেক তরুণ, ক্লাইডের। জীবনের উদ্দামতায় দুজন নেমে পড়ে ব্যাংক ডাকাতিতে।
প্রথমে ছোটোখাটো ডাকাতি করলেও ধীরে ধীরে আরো আগ্রাসী হয়ে টেক্সাসে বিভিন্ন ব্যাংকে ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডে যুক্ত হয় বনি এবং ক্লাইডের দল। সত্য ঘটনা অবলম্বনে ত্রিশের দশকের যুক্তরাষ্ট্রের ডাকাত দম্পত্তি ক্লাইড ব্যারো এবং বনি পার্কারের জীবন নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন আর্থার পেন।
সাইলেন্স অব দ্যা ল্যাম্বস (১৯৯১)
জনাথন ডেম পরিচালিত এই সিনেমাটি ক্রাইম ঘরানার সর্বকালের সেরা সিনেমাগুলোর একটি। গল্পটা হ্যানিবাল লেকটার নামক অত্যন্ত মেধাবী একজন জেলবন্দী সাইকিয়াট্রিস্টকে কেন্দ্র করে। খুন ও নরমাংস ভক্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত এই সাইকোপ্যাথের সাহায্য নিয়ে একটি খুনের তদন্ত করতে আসেন নারী এফবিআই এজেন্ট স্ট্যারলিং, আর তা নিয়েই এগিয়ে চলে গল্প।
গা ছমছমে এই থ্রিলারের মূল চরিত্র, ড. লেক্টারকে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কিছু সিরিয়াল কিলারের জীবনের ওপর ভিত্তি করে। এদের মধ্যে মেক্সিকান সিরিয়াল কিলার এবং সার্জন আলফ্রেদো বাল্লি ত্রেভিনোর ছাপ সবচেয়ে স্পষ্ট।
এম (১৯৩১)
জার্মানির ডুসেলডর্ফ শহরে ১৯২৯ সালে ক্রমাগত ঘটতে থাকা শিশুহত্যার নেপথ্যে থাকা ‘ভ্যাম্পায়ার অব ডুসেলডর্ফ’ নামে পরিচিত পিটার কুর্তেনকে কোনোভাবেই ধরতে পারছিল না পুলিশ। তখন পুলিশকে সাহায্য করতে একজোট হয় শহরের অন্যান্য অপরাধীরা এবং অবশেষে ধরা পড়ে ‘ডুসেলডর্ফ মনস্টার’।
এমনই প্লট নিয়ে চাঞ্চল্যকর ক্রাইম থ্রিলার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন জার্মান পরিচালক ফ্রিৎজ ল্যাং। আই এম ডিবি রেটিং এ ৮.৩ পাওয়া এই সিনেমায় আলো ছায়া এবং কাচের ওপর প্রতিবিম্বের কাজ একে করেছে আরো রোমাঞ্চকর।
মেমোরিজ অব মার্ডারস (২০০৩)
১৯৮৬-১৯৯১ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার হাসাং শহরের সিরিজ হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয় মেমোরিজ অব মার্ডারস। পার্ক এবং চো নামের হাসাং শহরের পুলিশের দুই গোয়েন্দার হাতে ১৯৮৬ সালে প্রথম দেয়া হয় একটি জোড়া খুনের তদন্তের ভার। আর সেটিই হয় ‘দ্যা হাসাং মার্ডারস’ এর সূচনা।
এই সিরিজ হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন যাবৎ অমীমাংসিত ছিল এবং সেটিই অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক বং জুন হু। ১৩২ মিনিটের এই সিনেমা যেকোনো দর্শকের মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বইয়ে দিবে নিজের অজান্তেই।
ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান (২০০২)
অপরাধের সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রের তালিকায় বেশ উপরে থাকা এ সিনেমায় লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও অভিনয় করেন এক সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রাখা চেক জালিয়াত ফ্রাংক অ্যাবাগনেইল জুনিয়রের চরিত্রে। আর তাকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা এফবিআই এজেন্ট কার্ল হেনরেটির চরিত্রে ছিলেন টম হ্যাংকস।
চেক জালিয়াতি ছাড়াও উকিল, ডাক্তার বা প্যান-অ্যামের পাইলট সেজে প্রতারণার জাল বোনা ফ্রাংক হাতিয়ে নিয়েছিল প্রায় আড়াই মিলিয়ন মার্কিন ডলার; ঘুরেছিল ২৬ টি দেশে। ফ্রাংকের জীবনের উত্থান-পতন নিয়ে বাস্তবের ওপর সিনেমার রং মিশিয়ে এই দারুণ সিনেমাটি পরিচালনা করেন স্টিভেন স্পিলবার্গ।
তলভার (২০১৫)
সত্য ঘটনা অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের দৌড়ে পিছিয়ে নেই বলিউডও। ২০০৮ সালের সাড়া জাগানো নয়ডার তলওয়ার পরিবারের জোড়া খুনের অমীমাংসিত ঘটনার চরিত্রগুলোর নামে পাল্টে মেঘনা গুলজার পরিচালনা করেন তলভার নামের সিনেমাটি।
সিনেমায় কিশোরী শ্রুতি টেন্ডন ও গৃহকর্মী খেমপালের হত্যাকাণ্ডের পর তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রুতির বাবা-মাকেই খুনী হিসেবে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবুও এক পুলিশ কর্মকর্তার এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং প্রশাসন ও বৈচারিক আদালতের নানান ঘুরপ্যাঁচে এগিয়ে যায় সিনেমাটি।
সিরাজুল আরিফিন বর্তমানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
sherajularifin@iut-dhaka.edu