logo

বাসের মধ্যে ‘ধর্ষণও’ করে সেই ডাকাতেরা

এফই অনলাইন ডেস্ক | Monday, 7 February 2022


ডাকাতদের কবলে পড়া বাসযাত্রী এক চিকিৎসকের ফেইসবুক পোস্টের সূত্র ধরে পুলিশি তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসছে; গ্রেপ্তার ডাকাতদের বরাতে ‘ধর্ষণের’ একটি ঘটনার কথাও বলছেন গোয়েন্দারা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ছয়টি থানায় বাস ডাকাতির সাতটি মামলায় এখন পর্যন্ত ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন তারা।

তারা বলছেন, মহাসড়কে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা সামনে এসেছে। এগুলোর মধ্যে গত ১৪ জানুয়ারি বগুড়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী সোনারতরী পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতির সময় ধর্ষণের ওই ঘটনা ঘটে বলে গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে এখনও ঘটনার শিকার নারীর সন্ধান মেলেনি।

ওই ডাকাতিতে অংশ নেওয়া কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ।

ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ওয়াহেদুল ইসলাম রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাস ডাকাতির সাতটি মামলায় আমরা ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। ওদের মধ্যে একজন ডাকাত গত মাসে টাঙ্গাইলের দিকে একটা বাসের মধ্যে যাত্রীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। তবে আমরা এখনও নির্যাতিতকে পাইনি।“

সোনার তরী পরিবহনে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত গ্রেপ্তার ছয়জন হলেন- নাঈম হোসেন (২০), রাসেল আকন্দ (২৭), রফিকুল ইসলাম (২১), মজিদুল ইসলাম (৩৮), আবদুল মজিদ (৩৮) ও আলমগীর প্রধান (৩২)।

এ গ্রুপের হোতা সুমন ও শাহীন নজরদারীতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সোনার তরী পরিবহনে ডাকাতির এ ঘটনার পর শুরুতে মামলা দিয়ে গিয়ে ঝামেলায় পড়েন বাস কর্তৃপক্ষ। ওই বাসের সুপারভাইজার শহীদুল ইসলাম তিন দিন ঘুরেও টাঙ্গাইলে কোনো থানায় মামলা করতে পারেননি।

চিকিৎসক শফিকুলের পোস্টের পর সামনে আসা এ ডাকাতির বিষয়ে ২৪ জানুয়ারি সুপারভাইজার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “টাঙ্গাইলের পুলিশ মামলা নেয়নি। তারা সাভারে যেতে বলে। তিন দিন ঘুরে পরে সাভার থানায় মামলা করি।”

এ ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদেরই সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ, যারা তাদের সহযোগীদের ধর্ষণের ঘটনা সামনে আনেন।

ডাকাতির শিকার বাস চালক ও হেলপার এবং পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ডাকাতদের দেওয়া ঘটনার বর্ণনা থেকে জানা যায়, সোনার তরী পরিবহনের বাসটি ১৪ জানুয়ারি বিকেল ৫টার দিকে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। বাসে আগে থেকেই ৩৮ জন যাত্রী ছিলেন। যমুনা সেতু পার হয়ে টাঙ্গাইলের অ্যালেঙ্গা থেকে ৭-৮ জন যাত্রী তোলা হয়। তাদের কয়েকজন ইঞ্জিন কাভারে বসেন।

বাসটি সাভার এলাকায় আসার পর ডাকাতরা বাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর তারা বাসটি ইউ টার্ন নিয়ে আবারও টাঙ্গাইলের দিকে চালাতে থাকে। সারারাত চলার পর ভোরের দিকে তারা বাসটি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এলাকায় ফেলে পালিয়ে যায়।

চালক ও হেলপারের ধারণা অ্যালেঙ্গা থেকে ওঠা যাত্রীরাই ডাকাত। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাসে দুজন নারী যাত্রী ছিলেন, একজন বয়স্ক, একজন কম বয়স্ক। তবে বাস ফেলে ডাকাতেরা পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি ওই যাত্রীদের দেখতে পাননি।

চালক মো. পাভেল বলেন, অ্যালেঙ্গা থেকে প্রতিজন ১০০ টাকা দরে তারা ৭-৮ জনকে বাসে তুলেছিলেন। ওই যাত্রীদের ঢাকায় আসার কথা ছিল। বাসে আগে থেকেই ৩৮ যাত্রী ছিলেন। চন্দ্রা, বাইপাইল এলাকায় বেশ কয়েকজন যাত্রী নেমে যান।

“সাভারের গেণ্ডা এলাকায় দুজন যাত্রী নামার পর হেলপার দরজাটা লাগানো মাত্রই ডাকাতেরা স্বরূপে আবির্ভূত হন। তখন রাত সোয়া ১১টার মতো বাজে।”

চালকের ভাষ্য, “হেলপার দুয়ারটা লাগাইছি, আমি খালি গিয়ার লাগাইছি। ওমনি একজন আইসা আমারে ছুরি ধরল। বাসে তখন ডাকাতরাসহ ২০-২৫ জন যাত্রী। আমাদের তিন স্টাফকে (চালক, হেলপার, সুপারভাইজার) হাত বাইন্ধ্যা, চোখ বাইন্ধ্যা, মুখে টেপ মাইরা পিছনে ফালায়া রাখে।

“এরপর রাতভর গাড়ি চলছে। গাড়ি নিয়া তারা কই কই গেছে তা আমরা কইতে পারি না। ভোর বেলায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ডাকাতরা গাড়ি রাইখা পলায়া যায়। তহন ওই মহিলা যাত্রীদের আর পাই দেহি নাই। সুপারভাইজার শহীদও হ্যাগোরে খুঁইজ্জা পাইলো না।’

মামলার তদন্তে যুক্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, ওই বাসে ডাকাতি করতে অ্যালেঙ্গা থেকে উঠেছিলেন ১০ জন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, ডাকাতির এক পর্যায়ে বাসে থাকা তরুণীকে পেছনের আসনে নিয়ে ধর্ষণ করে পেট কাটা শাহীন ও জাকির নামে দুজন। তারা দুজনই পলাতক।

গ্রেপ্তার ডাকাতরা পুলিশকে বলেছে, শাহীনের পেটে একটা অস্ত্রপচারের পর তার শরীরের বর্জ্য বের হওয়ার জন্য চিকিৎসকেরা স্যালাইনের ব্যাগের মতো একটি ব্যাগ তার পেটের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। ওটা সব সময়ই ওর শরীরে ঝুলতে থাকে। ওই অবস্থাতেই শাহীন একাধিক ডাকাতিতে ছিলেন। সর্বশেষ সোনার তরী পরিবহনে ধর্ষণ করেছেন বলেও দাবি তার সহযোগীদের।

সোনার তরীতে ডাকাতিসহ সাতটি মামলার তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা ডিবির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহাদাৎ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের প্রচুর অভিযান হচ্ছে। রাত জেগে জেগে তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছেন কর্মকর্তারা। এর মধ্যেই ৪০ জনের মতো ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে তাদের অন্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।”

সোনার তরী বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে ১৪ জানুযারি। এক সপ্তাহ পর ২১ জানুয়ারি ডাকাতির শিকার হন ফেইসবুকে পোস্ট দেওয়া সেই চিকিৎসক।

এরপর ডাকাতির ঘটনায় মামলা নেওয়া ও না নেওয়া নিয়ে থানা পুলিশের পেরেশানির সংবাদ সামনে এলে তদন্ত ও অভিযানে নামে পুলিশ। তখন জানতে পারে ওই সময়ের আশেপাশে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

এসব ডাকাতির মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ৪০ জনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আগের অপরাধের মামলা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডাকাতি, অস্ত্র, খুন এমনকি জোড়াখুনের মামলার আসামিও রয়েছেন এদের মধ্যে।

মামলার তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, সোনার তরী বাসের ডাকাতি ঘটনার অন্যতম হোতা সুমন একজন পোশাক কর্মী, থাকেন আশুলিয়ায়। তাকে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছে। আশুলিয়ায় তার বাসায় একাধিকবার অভিযানও হয়েছে।

বছর দেড়েক আগে বাসযাত্রী এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে অন্য মালামালের সঙ্গে ওয়্যারলেস সেটটিও লুটে নিয়েছিল সুমন ও তার সহযোগীরা। ওয়্যারলেস হারিয়ে ওই পুলিশ সদস্য এখন পর্যন্ত বরখাস্ত হয়ে রয়েছেন।

সেটটি উদ্ধারের ওই মামলায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর তারা সুমনের বাসার হদিস দেন। সেখানে তল্লাশী চালিয়ে একটি নকল ওয়্যারলেস উদ্ধার করা গেলেও আসলটি এখনও মেলেনি।