বাস ডাকাতিতে ঘুরে ফিরে একই ব্যক্তিরা
এফই অনলাইন ডেস্ক | Wednesday, 2 February 2022
সাভারে পড়ে থাকা এক লাশের সূত্র ধরে ২০২০ সালের অক্টোবরে একটি বাস ডাকাত চক্রের নয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট পিবিআই। তখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ২৯ বছরের পরিবহনকর্মী আল আমিন। গত বছর জামিনে বের হন তিনি। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
পুলিশ বলছে, জামিনে বেরিয়ে আবারও অপকর্মে যুক্ত হয়েছেন আল আমিন। সঙ্গে কিছু পুরনো সহযোগীও রয়েছে।
বাস ভাড়া নিয়ে যাত্রী তুলে ডাকাতির অভিযোগে গত ৩০ জানুয়ারি যে আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ, তার মধ্যে সেই আল আমিনও রয়েছেন।
শুধু আল আমিন নয়, ২০২০ সালে ডাকাতি ও হত্যার অভিযোগে পিবিআই যাদের শনাক্ত করেছিল, তাদের অনেকেই সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ডাকাতিগুলোতে যুক্ত বলে তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তাদের ধরতে অভিযানে মঙ্গলবার আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এ নিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা ডাকাতির মামলায় মোট ১৪ জন গ্রেপ্তার হল।
উত্তরা পশ্চিম থানায় গত রোববার রাতে ওই মামলাটি করেন টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম।
গত ২০ জানুয়ারি রাতে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর থেকে বাসে টাঙ্গাইলে যাওয়ার পথে ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন তিনি।
এরপর ওই চিকিৎসক ছাড়াও বাসে ডাকাতির শিকার হওয়ার পর ‘ঘটনাস্থলজনিত জটিলতায়’ পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার আরও অভিযোগ করেন কয়েকজন।
তা গণমাধ্যমে আসার পর সাম্প্রতিক সবগুলো বাস ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জ থানায়, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, টাঙ্গাইলের সদর ও মির্জাপুর থানায়।
১৪ জনকে এই ছয় থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর ডিবি।
এর মধ্যে রোববারে গ্রেপ্তার আটজনকে ইতোমধ্যে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।
এরপর আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে ডিবির তেজগাঁও জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহাদাৎ হোসেন মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চক্রটির অন্য সদস্যদের সন্ধানে আরও অভিযান চলছে।
নতুন গ্রেপ্তার ছয়জন হলেন- মজিদ, রাসেল, নায়েম, রফিক, আলমগীর ও মহিবুল।
ডিবি কর্মকর্তা শাহাদাৎ বলেন, “এরা আশুলিয়া, টঙ্গী এলাকায় থেকে বিভিন্ন পরিবহনে, কখনও পোশাক কারখানায় কাজ করছিল। ডাকাত দলের নেতারা ডাকলে এরা ডাকাতিতেও ভিড়ে যায়।”
ডিবির তেজগাঁও জোনাল টিমই রোববার আটজনকে গ্রেপ্তার করেছিল।
ওই টিমের প্রধান এডিসি শাহাদাত বলেন, আল আমিন ২০২০ সালের অক্টোবরে পিবিআিইর হাতে একই রকমভাবে ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সেই সময়ে তাদের হাতে ঢাকার এক রেস্তোঁরা ব্যবসায়ী খুন হয়েছিলেন।
একইভাবে বাস ‘রিজার্ভ’ নিয়ে ডাকাতি
২০২০ সালের ৬ অক্টোবর সাভারের বলিয়ারপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে ঢাকার মিরপুরের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী লস্কর রবিউল ইসলামের (৪১) লাশ পাওয়া যায়।
সেই হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আল আমিনসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পিবিআই। ওই চক্রটির নেতা হিসেবে বছির মোল্লা নামের একজনের কথা বলা হয়েছিল।
পরিবহনকর্মী আল আমিন থাকেন রাজধানী সংলগ্ন আমিনবাজার এলাকায়। গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোংলায়।
ডাকাত দলের নেতারা বিভিন্ন সময় আল আমিনের মতো লোকদেরই ঘুরে ফিরে ডাক দেন বলে জানান ঢাকা মহানগর ডিবির কর্মকর্তারা।
২০২০ সালে রেস্তোঁরা ব্যবসায়ী খুনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে পিবিআইর প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেছিলেন, ওই বছরের ৪ অক্টোবর এই ডাকাত চক্রটি কুয়াকাটা যাওয়ার কথা বলে ৩০ হাজার টাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটের নিরালা পরিবহনের একটি বাস তিন দিনের জন্য ভাড়া নেয়। চক্রে ছিলেন মোট ২২ জন। এদের বেশিরভাগ পেশায় পরিবহন শ্রমিক। সাভারসহ আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন। ডাকাতির জন্য তারা একত্রিত হন।
নিরালা পরিবহনের বাসটি রিজার্ভ নিয়ে প্রথম দিন তারা মানিকগঞ্জ থেকে যাত্রী তুলে ঢাকা আসার পথে যাত্রীদের কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। দ্বিতীয় দিনও এভাবে ডাকাতির এক পর্যায়ে রবিউলকে বাসে তোলেন তারা।
বনজ মজুমদার বলেছিলেন, বাসে উঠে রবিউল টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করায় কয়েকজন মিলে তাকে বাসের মধ্যে ফেলে হাত-পা চেপে ধরে মাথায় চাকা খোলার হুইল রেঞ্চ দিয়ে আঘাত করে। এতে রবিউল মারা গেলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে তার লাশ ফেলে যায় তারা। পরদিন বাসটি ফেরত দেয় তারা।
একইভাবে আরকেআর পরিবহনের একটি বাস রিজার্ভ নিয়ে গত ২০ জানুয়ারি রাতে যাত্রী তুলছিল একদল ডাকাত। রাতে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর থেকে টাঙ্গাইল যাওয়ার জন্য বন্ধুসহ সেই বাসে উঠে ডাকাতদের কবলে পড়েছিলেন চিকিৎসক শফিকুল।
ওই চক্রটির আট সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হাফিজ আক্তার বলেন, চক্রটি সাভার, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় একইভাবে ডাকাতি করত। তাদের নামে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে।
ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি যে ডাকাতির ঘটনাগুলো যারা ঘটিয়েছে তারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এদের বেশ কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে। সপ্তাহান্তে গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বাড়বে।
গত বছর পুলিশের এক সদস্যও এ ধরনের ডাকাতদের খপ্পড়ে পড়েন। কিছু জিনিসপত্রের সঙ্গে তার ওয়্যারলেস সেটটিও ডাকাতরা নিয়ে যায়। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হলেও সেই লুট হওয়া ওয়্যারলেস ও জিনিসপত্র আজও উদ্ধার হয়নি।