logo

আফগানিস্তান থেকে প্রায় নজিরহীন বিশৃঙ্খলার মধ্যে উড়োজাহাজের বহরে করে হটে এসেছে আমেরিকা। এরপরই সামরিক শক্তির আরো সংযত প্রয়োগের আভাস ব্যক্ত করল ওয়াশিংটন

বাইডেন তত্ত্ব: আমেরিকার সামরিক শক্তি সংযতভাবে প্রয়োগের আভাস

এফই অনলাইন ডেস্ক | Friday, 10 September 2021


মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির নতুন অধ্যায়ের ঘোষণা দিলেন। আফগানিস্তান থেকে মারাত্মক গোলযোগ এবং প্রাণঘাতী প্রত্যাহারের ২৪ ঘণ্টার কিছু বেশি সময় যাওয়ার পরই এ ঘোষণা দেওয়া হলো।

৭৮ বছর বয়সী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “আফগানিস্তান সম্পর্কে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা কেবল আফগানিস্তানকে নিয়েই নেওয়া হয়নি। এর মাধ্যমে অন্য দেশ গড়ে তুলতে বড় সামরিক অভিযানের যুগের সমাপ্তি টানা হলো।” হোয়াইট হাউজের রাষ্ট্রীয় ভোজকক্ষ বা স্টেট ডাইনিং রুম থেকে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে এ ঘোষণা দেন তিনি।

বাইডেনের এ ঘোষণাকে একদম নতুন বলার জো নেই। আফগানিস্তানে চলমান মার্কিন লড়াই নিয়ে বাইডেন সংশয় প্রকাশ করেছেন সেই বারাক ওবামার সরকারের আমলেই। ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারে আফগান যুদ্ধের ইতি টানার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন তিনি। আর জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে ঢোকার পর একেই অগ্রাধিকার দিলেন তিনি।

তারপরও আফগানিস্তান থেকে হট্টগোল ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে হটে আসা এবং বৃহত্তর ক্ষেত্রে এ সরে আসার গুরুত্ব তুলে ধরে বাইডেনের ঘোষণা ওয়াশিংটনসহ গোটা দুনিয়াজুড়ে নানা সুর তুলতে থাকে। গত কয়েক বছরব্যাপী সামরিক শক্তির সংযত প্রয়োগের দিকে আমেরিকার সরে আসার প্রয়াস ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে থাকে। গত কয়েক দশকের ব্যয়বহুল এবং বিফল লড়াইয়ের পর মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নীতি নতুন করে সাজানোর সময় অনেক আগেই উৎরে গেছে। বাইডেন সমর্থকরা মনে করেন, তার তৎপরতায় দীর্ঘ প্রতীক্ষ সে কাজ শুরুর প্রতিফলনই ঘটল। সমর্থকরা আরো মনে করেন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই রূপবদলের পালা আমেরিকার কর্তাব্যক্তিদের ও দেশটির সামরিক বাহিনীর সামনে নতুন সুযোগ হয়ে দেখা দিয়েছে। তাঁরা এখন  চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতাপশালী প্রতিপক্ষগুলোর সাংঘর্ষিক বড়মাপের কৌশলমালার দিকে গভীর মনোনিবেশ করতে পারবেন। এ ছাড়া, তাঁরা এখন  জলবায়ু সংকটের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের প্রতি নজর দিতে পারবেন। তাদেরকে আর, উন্মুক্ত সংঘাতের, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো পরিস্থিতির চোরাবালিতে আটকে পড়তে হবে না।

এদিকে অন্যপক্ষের লোকেরা ভাবছেন, আমেরিকার জন্য সংকোচনের বিপজ্জনক যুগকে স্বাগত জানাতে চলেছেন বাইডেন। এই তৎপরতা মার্কিন শক্রদের শক্তি যোগাবে, সবচেয়ে বিপদের মোকাবেলা করছে যে সব মিত্র তাঁরা সাহস হারাবে। আমেরিকার মানবাধিকার নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে প্রয়াস চালায় তার ভূমিকা এবারে খাটো হয়ে যাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের রাজত্ব শেষে আমেরিকাকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে ফিরিয়ে আনার যে আশাবাদ ফুটে উঠেছিল তা হয়ত ঝরে যাবে।

ইউরোপের এক কূটনৈতিক বলেন, “অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকার শক্তি দেখানোর একটি রাস্তা খুঁজে বের করতেই হবে। না হলে, রাশিয়া এবং চীন স্বয়ংক্রিয় ভাবেই ধরে নেবে এটি এমন এক শতাব্দী যখন চীন নিজের মতো এগিয়ে এসেছে। আর বেইজিংয়ের নিজের এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সফলতা আসবে। এটা ভীষণ বিপজ্জনক।”

মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের শাসনামলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী উইলিয়াম কোহেন বলেন, “এখন আমার প্রধান মাথাব্যাথা হলো, বাদবাকি দুনিয়া আমেরিকাকে কী নজরে দেখছে? কী হিসাব কষছে চীন ও আমেরিকা? একই ভাবে, মার্কিন মিত্ররাই বা কষছে কোন অঙ্ক?”

হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনখানে

মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির দোলক গত এক শতাব্দীতে এক এক প্রজন্মে এক এক দিকে গিয়েছে। কখনো বাহুবল দেখিয়েছে। আবার কখনো সেনা পিছিয়ে আনার প্রান্তে চলে গেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বড়ধরণের সামরিক মোতায়েনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল আমেরিকা। এ রকম প্রতিবাদ এরপরে আর হয়নি। এ লড়াইকে কেন্দ্র করে গোটা আমেরিকাজুড়ে দেখা গিয়েছিল যুদ্ধবিরোধী প্রচণ্ড বিক্ষোভ। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন মার্কিন  প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানান যে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন মুক্তবিশ্বের গোটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজের ঘাড়ে’ তুলে না নেয়।

তাঁর এ আহ্বান জানানোর মাত্র এক দশকের কিছু পরে রোনাল্ড রিগ্যান ওভাল অফিসে ঢোকেন। বড়ো ধরণের সামরিক শক্তি ব্যবহারে মার্কিন অনীহাও একই সাথে বিলীন হতে থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এইচডব্লিউ বুশ এবং বিল ক্লিনটন উভয়েই যথাক্রমে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকে এবং কসভোয় বিশাল সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের শায়েস্তা করতে এ দুই অভিযান চালানোর দাবি করে আমেরিকা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডব্লিউ বুশ ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার জবাবে আফগানিস্তান এবং ইরাকে সামরিক অভিযান নামেন। এই হামলা প্রকৃতিগতভাবে চক্ষুলজ্জা বা শরমের পরোয়া করেনি। জটিল এবং রক্তক্ষয়ীও ছিল। ধীরে ধীরে এবং অবিরাম গতিতে যুদ্ধের প্রতি মার্কিন মানুষের সমর্থন কমতে থাকে। আর দুনিয়াজুড়ে মার্কিন মিত্ররা ক্রমাগত চাপের মুখে পড়তে থাকে।

ঐ মঙ্গলবারে (৩১ আগস্ট) দেওয়া ভাষণে বাইডেন বলেন, “আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান – সন্ত্রাসীদের হামলা ঠেকানোর জন্য- জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানে রূপ নেয়। সেখানে দেশ গড়ার, গণতান্ত্রিক, সুসংহত এবং একতাবদ্ধ আফগানিস্তান গড়ার তৎপরতায় রূপ নেয়।” তিনি আরো বলেন, “এ ধরণের মনোভাব থেকে বের হয়ে এলে এবং বিশাল সংখ্যক সেনা মোতায়েন থেকে সরে এলে তা আমেরিকাকে আরো শক্তিশালী করবে, আরো কার্যকর এবং স্বদেশকে আরো নিরাপদ করবে।”

ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমন সব বক্তব্য দেওয়ার পরু প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের অনেক সুযোগ বাইডেনের থাকবে। বারাক ওবামার আমলের মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা টম ডোনিলটন বলেন, “আমি মনে করি না, আফগানিস্তানের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নিজ স্বার্থে শক্তি প্রয়োগে বিন্দুমাত্র ইতঃস্তত করবে আমেরিকা। আফগানিস্তানের দুই দশকের পুরানো যুদ্ধ আর চালাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেন বাইডেন। সেখানে লড়াইয়ে আমেরিকার অর্থ এবং জীবনের অপচয় ঘটছিল কিন্তু স্বার্থ বজায় থাকছিল না।” তাছাড়া এখন আমেরিকার অগ্রাধিকার আফগানিস্তান নয় অন্য জায়গায় রয়েছে বলেও জানান সাবেক এই মার্কিন কর্তা।  

মার্কিন থিংকট্যাংক র‌্যান্ড কর্পোরেশনের সিনিয়র ফেলো এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সাবেক কর্তা জিম ডোবিন্স বলেন, বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান থেকে দূরে থাকার সে সব সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নিয়েছেন সেগুলোর আয়ু বেশি হয়নি। ঘটনাক্রমে সে সব সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থাবলীকে এবং আমেরিকার হস্তক্ষেপের বিষয়টি এমন সঙ্কীর্ণ সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ রাখাকে একধারে ইতিহাস সমর্থন করে না, অনুরূপ ভাবে এটি অসম্ভব।”

(ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]