logo

বাংলাদেশে মিঠাপানির একমাত্র বন রাতারগুল জলাবন

মিনহাজুর রহমান শিহাব | Tuesday, 19 July 2022


প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশে একমাত্র মিঠাপানির বন রাতারগুল জলাবন। চায়ের শহর সিলেট থেকে এটি ২৬ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত। গোয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত এরূপ জলমগ্ন বন বাংলাদেশে একটিই রয়েছে, যেখানে এ ধরনের মিঠাপানির বন গোটা পৃথিবীতেই আছে কেবল ২২টি ।  

অপরূপ সুন্দর বিশাল এ বনের তুলনা চলে একমাত্র আমাজনের সঙ্গে। আমাজনের মতো এখানকার গাছগুলো বছরে ৪ থেকে ৭ মাস পানির নিচে থাকে। এই জলাবনের আয়তন প্রায় ৩,৩২৫.৬১ একর, তিন দিক দিয়ে এই বনে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। এর ৫০৪ একর এলাকাকে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়াও ২০১৫ সালের ৩১ মে বন অধিদপ্তর ২০৪.২৫ হেক্টর বনভুমিকে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে ।

বর্ষাকালে এই বনটি প্রায় ২০-৩০ ফুট পানির নীচে নিমজ্জিত থাকলেও শীতকালে এটি প্রায় ১০ ফুট পানির নিচে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে বেড়াতে আসা ভ্রমণকারীদের তখন পায়ে হেঁটে কিছু কিছু পথ পাড়ি দিতে হয়। জলজ প্রাণীরা তখন আবাসস্থল পরিবর্তন করে অন্যত্র খাপ খাইয়ে নেয়।

বনটিতে দুই স্তরের উদ্ভিদ সাধারণত দেখা যায়। উপরের স্তরে বৃক্ষ যা প্রায় ১৫ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত যেতে পারে। আর নিচের স্তরে সাধারণত গুল্ম ও বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ থাকে। এখানকার বেশিরভাগ বৃক্ষই হচ্ছে করচ। অন্যান্য বৃক্ষের মধ্যে বেত, বরুণ এবং হিজল প্রধান। বনের পাড় ঘেঁষে কিছু জারুল গাছও চোখে পড়ে। সব মিলিয়ে সেখানে প্রায় ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের দেখা মিলে। প্রাণীদের মধ্যে বানর, কিছু সাপ ও আঁচিল প্রায় সবসময়ই চোখে পড়ে। তবে শীতকালে বকসহ অসংখ্য অতিথি পাখির আনাগোনাও থাকে ।

এই বনের উদ্ভিদগুলো কোনভাবেই ম্যানগ্রোভ জাতীয় নয়, অর্থাৎ তাদের কোনো শ্বাসমূল নেই। পানির নীচে মাসের পর মাস উদ্ভিদের এভাবে টিকে থাকাটা তাই একটু অদ্ভুতও বটে।

পর্যটকদের জন্য এই বনে নৌকা ছাড়া ভ্রমণের কোনো সুযোগ নেই, তাও আবার বৈঠা চালিত নৌকা। সাধারণত পর্যটনের সম্ভাবনাময় জলমগ্ন স্থানগুলোতে ভ্রমণের জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকার দেখা মিললেও এই বনটিতে তার সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি।

ইঞ্জিনচালিত নৌকার তেমন চলাচল না থাকায় এই বনে ঢুকতেই মনে হবে কোন এক শান্ত সুনিবিড় প্রকৃতি জলে ভাসছে। মাঝে মাঝে পাখিকূলের কলকাকলীতে স্নিগ্ধ পরিবেশে স্তব্ধতা ভাঙে। এমন অনিন্দ্যসুন্দর বন বাংলাদেশের সুন্দরবন ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না। সেই দিক বিবেচনায় সোয়াম্প ফরেস্ট পর্যটকদের জন্য সৌন্দর্য অবলোকনের অন্যতম এক দর্শনীয় স্থান। সারাদেশে যেখানে প্রাকৃতিক বনভূমির সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, সেখানে এরূপ বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক বনভূমি সংরক্ষণ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের একদল শিক্ষার্থী রাতারগুল জলাবনে শিক্ষা সফর সম্পন্ন করেন। রাতারগুল জলাবন ও এর সম্ভাবনা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক ড. দানেশ মিঞা বলেন, রাতারগুল বন এলাকায় অরক্ষিত ভূমিকে পরিকল্পিতভাবে বনায়ন সৃজনের মাধ্যমে বনভূমির আকার বাড়ানো সম্ভব। বিশেষত সেখানে বনজ কিছু ফলগাছ লাগানো গেলে বন্যপ্রাণীকূলের খাদ্য চাহিদা প্রাকৃতিকভাবে মেটানো যাবে, যা বনের বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করবে। এছাড়া বনে পিটালি, পাটিপাতা, বেত প্রভৃতির চারা লাগানো গেলে অর্থনৈতিকভাবেও আয়ের উৎস সৃষ্টি করা যাবে। তিনি আরো বলেন, এ বনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করলে দর্শনীয় স্থান হিসেবে পর্যটনের প্রসার ঘটানোর অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

যারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও রাতারগুল জলাভূমির বন এখনো দেখেননি, তাদের জন্য এই বনটিতে ভ্রমণ নিঃসন্দেহে উপভোগ্য হবে। তবে কোনভাবেই বনটির কোনো ক্ষয়-ক্ষতি যেন না হয় কিংবা পর্যটকদের কারণে যেন দূষণের শিকার না হয় সেদিকে সতর্কতা জরুরি ।

মিনহাজুর রহমান শিহাব বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

rahmanshihab06@gmail.com