বাংলা গানের একাল-সেকাল
ফারিয়া ফাতিমা | Friday, 27 August 2021
গান আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে সর্বজনীন প্রশান্তি বা অশান্তিতে, ভালোবাসা বা বেদনায়। জীবনের অনুভূতিগুলো আরও প্রগাঢ় রূপ পায় গান নামক এই সঙ্গীর সংস্পর্শে। আর সঙ্গী যখন নিজের ভাষার গান, যেন মনে হতে থাকে, "আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই,আমি আমার আমিকে চিরদিন, এই বাংলায় খুঁজে পাই"।
আমাদের বাংলা ভাষার ব্যবহার যে গতিশীল, গানও এর ব্যতিক্রম নয়। ভাষা, শব্দ সুরের খেলা গানে পরিবর্তনের ঢেউ আসে খুব সহজেই। গত শতাব্দী হোক বা গত দশক, বাংলা গানের পরিবর্তন কিন্তু চোখে পড়ার মতো। সেই চর্যাপদের বৌদ্ধ নাথগীতিকবিতাকেই ধরে নেয়া হয় বাংলা গানের একদমই প্রাথমিক সূচনা। তবে তারপর সেকালও নয় একালও নয়, বরং বাংলা গানে দেখা যায় আকাল।
পুনর্বিজয়ের পর আর্যশাসকরা ঘোষণা দিয়ে বসেন, সংস্কৃত ছাড়া অন্য ভাষায় গান করলে শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড এবং তার স্থান হবে পুন্নম নরকে। এর পর ইংরেজ বেনিয়াদের শাসনে দ্বিতীয় দফায় আকাল আসার পূর্বে বাংলা গানের শক্ত হাল ধরে রেখেছিল শ্রী কৃষ্ণ কির্তন, রামপ্রসাদী, বাউল ফকিরদের গান, বৈষ্ণব পদাবলি, মহাকাব্য, পুঁথিকাব্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।
ইংরেজ শাসনে আকাল ভেদ করে 'টপ্পা' গান নিয়ে বেরিয়ে আসেন রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু। এরপর আসে বাংলা গানের অমূল্য সম্পদ রবীন্দ্রসঙ্গীত। ধ্রুপদ-খেয়াল, রাগসঙ্গীত থেকে বেড়িয়ে জয়জয়কার চলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টিগুলো ঘিরে, যার আবেদন এখন পর্যন্ত রয়েছে সগৌরবে। রবীন্দ্রনাথ ও পঞ্চপ্রধানের অসাধারণ সৃষ্টির পরপরই নজরুলপ্রতিভার বিস্ময়কর সিদ্ধি নিয়ে বেরোতে থাকে নজরুল গীতি। দেশাত্মবোধক, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, ভক্তিমূলক, ইসলামী সঙ্গীত সবধরনের গানের মাধ্যমে বাংলা সঙ্গীতকে করে গেছেন সমৃদ্ধ, যুগান্তরের নামে রেখে গেছেন মুগ্ধ ও বিস্মিত শ্রোতাকূল।
এর পর সবাক ছায়াছবির প্রচলন, বেতার ব্যবহারের শুরু, গ্রামাফোনের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রমেই বাড়তে থাকে গানের 'চাহিদা' ও 'সরবরাহ'। নব্বইয়ের দশক থেকে এ শিল্পের সাথে ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হতে শুরু করে ব্যবসা-মুনাফা-পুঁজিবাদের অংক।
বাংলা গানের সাম্প্রতিক দিনবদল নিয়ে 'আপেক্ষিক' ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট তানজীর আহমেদ জানান তার মতামত। তিনি বলেন, "বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ে বাংলা গানের মান নিয়ে কিছু বলাটা সাংঘর্ষিক মনে হয়। এই বিষয়টা আসলে আপেক্ষিক। তবে আমি মনে করি, আগে যেসব গানই কালজয়ী হয়েছে, তার সব গানের কথার গভীরতা যথেষ্ট। প্রতিটা গান কিছু একটা বলে, একটা বার্তা দেয়। গানের কথায় গুরুত্ব দিয়ে খুব অর্থবহ গান সেই নব্বই দশকের তুলনায় কম হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে আমার কাছে মনে হয় একটা শিল্পের গভীরতা ধরতে কিংবা বুঝতে হলে যে জীবনবোধ ও প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজন সেটার অভাব প্রকট হচ্ছে বেশ কিছু জায়গায়।
আবার টেকনিক্যাল ক্ষেত্রে খুব ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে যেমন সাউন্ডে। ভালো সাউন্ড অবশ্যই ছিল আগে, তবে সেটা সহজলভ্য ছিল না। বর্তমানে এই প্রজন্মের বহু গুণী সঙ্গীতশিল্পী আছে, যারা সাউন্ডের উপর পড়াশোনা করে এবং সাউন্ড নিয়েই কাজ করে, তাই ক্রমশ সাউন্ডের বৈচিত্র্যটা চোখে পড়ার মতো। তাছাড়া এখন সহজেই অনেক রকম গ্যাজেট এন্ড গিয়ারস পাওয়া যাওয়ায় রেকর্ডিং কিংবা লাইভ শো, সবকিছুতেই প্রযুক্তির আশীর্বাদ লক্ষণীয়।
যদি গান কিংবা ব্যান্ডের জনপ্রিয়তার কথায় আসি, তাহলে গানের ক্ষেত্রেও এখন একটা বিষয় খুব ভালোভাবে মিশে গেছে, সেটা হচ্ছে মার্কেটিং। ৯০ দশকে আমরা টিফিনের টাকা জমিয়ে ক্যাসেট কিনতাম, সিডি কিনতাম, যারা গান ভালোবাসে তারা সবসময় খোঁজ রাখত, কখন কোন অ্যালবাম বের হচ্ছে, আস্তে আস্তে গান মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত এবং গানের কথা ও সুর মানুষের হৃদয়কে ছুঁয়ে দিতে পারলে তা পৌঁছে গিয়েছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কিন্তু বর্তমানে গানেরও মার্কেটিং করতে হয় দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, যার সাথে আবার শ্রোতাশ্রেণী ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বর্তমানে গান জনপ্রিয়তার অনেকটা মাপকাঠি হয়ে গেছে ফেসবুক আর ইউটিউব ভিউ। সেখানে আবার টাকা খরচ করে বুস্ট করতে হয়। পার্থক্যটা এখানেই স্পষ্ট। তখন টাকা খরচ করে মানুষ গান শুনতো আর এখন শিল্পী টাকা খরচ করছে গান শোনাতে, বিষয়টা বেদনাদায়ক।"
তার মতে, "এখনকার সময়ে যে ভালো গান হচ্ছে না, তাও নয়। অনেক অনেক ভালো গান হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু আফসোস হচ্ছে, সেসব ভালো গান প্রাপ্য মর্যাদা পায় না বলে আমার ধারণা। আবার অন্যদিকে সফটওয়্যারের বদৌলতে চর্চা বাদ দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে সবাই শিল্পী হয়ে যাচ্ছে।
আর এই প্রজন্ম ট্রলিং করতে করতেও অনেক আজেবাজে হালকা কন্টেন্ট এবং লোকজনদের 'তারকা' তকমা লাগিয়ে উপরে তুলে দিচ্ছে, যারা কিনা নিজেদের শিল্পী দাবি করছে।
অথচ একটা ভালো গান কিংবা ভালো শিল্পী তার মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে ভালো কিছু করলে সেই তুলনায় ২০%-ও সাড়া পাচ্ছে না। কিন্তু ঠিকই অভিযোগ উঠে আসে, ভালো গান হচ্ছে না! আমার মতে, ভালো গান হচ্ছে কি না- সেটা আগে আপনাকে খুঁজে দেখতে হবে।"
বাংলা গানের ইতিহাস যেখানে শ্রেণি-সংগ্রাম,সমাজ, মানুষের দুর্দশা, দরিদ্রতা, দাঙ্গা, বিপ্লব, দেশপ্রেমের কথা বলে; সেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা, শৈল্পিকতা, দায়বোধ ছেড়ে মুনাফালোভী গানের বাজারের সিংহভাগ এখন দাঁড়িয়ে আছে জৌলুসপূর্ণ, রগরগে মিউজিক ভিডিওতে বা বাংলা সিনেমার গানে। সঙ্গীত একটি সংস্কৃতির শক্তিশালী বুনিয়াদ। সঙ্গীত তৈরি করে শ্রোতাসমাজ, আবার শ্রোতার চাহিদায় আসে গান। একইভাবে শ্রোতার চাহিদা তৈরি করে রুচিশীল শিল্প, আবার শিল্পী তৈরি করে দিতে পারেন রুচিশীল শ্রোতা। খাদ্যের দুর্ভিক্ষ শেষ হলেও, রুচির দুর্ভিক্ষে সৃষ্ট সংকীর্ণ গণসংস্কৃতি দেশে ভালো কিছু বয়ে আনবে না তা বলাই বাহুল্য।
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com