পড়াশোনায় ডিজিটাল যুগের সঙ্গী
ফারিয়া ফাতিমা | Wednesday, 14 July 2021
৮ মার্চ, ২০২০। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত। সারা পৃথিবীর ভয়াবহ অবস্থা দেখে, অনুমেয় কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত খবরটায় বাংলাদেশে শঙ্কার মেঘ ঘন হতে থাকে ক্রমাগত। নতুন বছরের অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন চাপা দিয়ে, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সেই মার্চেই বন্ধ করে দিতে হয় সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২০ এর মার্চ থেকে প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ আছে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
অনলাইনে ক্লাস
কিন্তু ডিজিটাল এই যুগে ভাইরাসের কাছে কি পরাস্ত হতে পারে মানুষের শিক্ষাব্যবস্থা? না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দায়ভার ভবিষ্যতের কাঁধে তুলে দিয়ে পড়াশোনার চাকা সচল রাখার দায়ভার নিয়েছে প্রযুক্তি। গত বছরের মার্চে সব বন্ধের ঘোষণার পর এপ্রিল পর্যন্ত ঈদের ছুটিসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীদের ক্লাস না হলেও মে থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু করে দেয় দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত যা চলছে পুরোদমে। ব্যবহৃত হচ্ছে জুম, গুগল মিট, গুগল ক্লাসরুমসহ ভিডিওকল, ইউটিউবের মতো নানা ডিজিটাল টুল।
এছাড়াও সিলেবাস মেনে তৃতীয় থেকে একাদশ শ্রেণির পাঠদান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সংসদ টিভিতে। বাংলাদেশে এমন শিক্ষাব্যবস্থা নতুন হলেও পৃথিবীতে এই অনলাইনে পড়াশোনা কিন্তু নেহাতই নতুন কিছু নয়।
অনলাইন ক্লাস বা পরীক্ষা ছাড়াও লেখাপড়া আরো কার্যকরী করে তুলতে প্রতিনিয়তই ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যম। ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার নানা বিষয়ের সাথে মিশে যাচ্ছে নানা স্মার্ট টুলের ব্যবহার। পড়াশোনায় নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠছে বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন, সফটওয়্যার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব চ্যানেল, ভিডিও, ওয়েবসাইট ইত্যাদি।
সহযোগী মাধ্যম
স্মার্টফোন হোক বা ল্যাপটপ-কম্পিউটার, হাতের কাছে কিছু অ্যাপ্লিকেশন বা সফটওয়্যার সহজ করে দিচ্ছে নিত্যদিনকার পড়াশোনা। বিষয়ভিত্তিক সমস্যার ক্ষেত্রে সাহায্য করছে বেশ কিছু অ্যাপ। ইংরেজির ভয় কাটাতে পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের ইংরেজি শেখার, গ্রামার চর্চার, ভোকাবুলারি বা শব্দভাণ্ডার মজবুত করার জন্য অ্যাপ। গণিতে সমস্যা কাটাতে আছে গণিত অনুশীলনের জন্য নানান মাত্রার অ্যাপ। নিমোনিক যাদের ভালো লাগে, তাদের জন্য রয়েছে মজাদার কিন্তু কার্যকরী নিমোনিক অ্যাপ। আবার দেখা যায়, হুটহাট নির্ভুল বানান ভুলে যাওয়া শিক্ষার্থী আছে অনেক।
তাদের জন্য বানান শিখতে বা টুক করে চোখ বুলিয়ে নিতে পাওয়া যাচ্ছে নির্ভুল বানান জানার অ্যাপ। বাচ্চাদের লার্নিং অ্যাপ থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সহায়তার সব মাত্রায় এখন সঙ্গী হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যম। আগে যেখানে ভিনদেশি ভাষা জানা না থাকার ফলে পোহাতে হতো নানা ঝক্কিঝামেলা, বঞ্চিত হতে হতো শেখার নানা দ্বার হতে, এখন গুগল ট্রান্সলেটরের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ট্রান্সলেশন এপস এর মাধ্যমে জানার বিষয়টি হচ্ছে আরো সহজ। এসব এপসের মাধ্যমে আংগুলের কয়েক টোকায় অনুবাদ করে বোঝা যাচ্ছে যে কোনো ভাষা। এমনকি রয়েছে ফটো ট্রান্সলেশন বা ভয়েস টান্সলেশনের মতো ব্যবস্থাও।
এছাড়াও বর্তমানে গবেষণা কাজে যে সফটওয়্যারটি হয়ে উঠেছে প্রয়োজনের সঙ্গী, তা হলো প্লেজারিজম চেকার। কোনো অ্যাসাইনমেন্ট বা গবেষণাপত্র ঠিক কতটুক মৌলিক হলো বা কতটুক হলো না- তা সহজেই দেখে নেয়া যায় এসব চেকার অ্যাপের মাধ্যমে। আর ডিজিটাল যুগের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক পড়াশোনার ক্ষেত্রে 'ইনস্টিটিউশনাল মেইল'-এর কথা না বললেই নয়। মেইল আদান-প্রদান তো বটেই, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য পাচ্ছেন বহুমূখী কার্যকরী সুবিধা। ডিভাইসে বেশি স্টোরেজ থেকে শুরু করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন প্রক্রিয়াসহ গিটহাব, রিসার্চগেটে সহজেই যুক্ত হওয়া যাচ্ছে এই মেইলের সাহায্যে। সাধারণত অফিশিয়াল কাগজপত্র স্ক্যান করে তা আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহৃত হলেও করোনাকালে শিক্ষার্থীদের সহায়তায় জোরালো ভূমিকা রেখেছে স্ক্যানার অ্যাপ বা সফটওয়্যার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জানান, "বিভাগের নির্দেশনায় হওয়া অনলাইন মিডটার্ম পরীক্ষায় আমাদের স্ক্যানার অ্যাপটি ব্যবহার করতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে খাতায় লিখে, সেই অ্যাপের মাধ্যমে স্ক্যান করে পিডিএফ ফাইল তৈরি করে তবেই শিক্ষকদের মেইলে উত্তরগুলো জমা দিতে হয়েছে। দেখা যায়, শুধু ছবি তুলে জমা দিলে উত্তরপত্র কখনো ঝাপসা, কখনো আঁকাবাকা দেখায়। কিন্তু স্ক্যান করে জমা দিলে উত্তরপত্র আসলে অনেকটাই নিখুঁতভাবে দেখা যায়৷"
শুধু সফটওয়্যারই নয়, ডিজিটাল এই যুগে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্মার্ট সঙ্গীর তালিকা আসলে অনেক বিস্তৃত। প্রযুক্তির আশীর্বাদসিক্ত এ সময়ে শিক্ষার মতো ব্যাপক বিষয়টিতে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল। ইউডেমি, কোর্সেরা, খান অ্যাকাডেমি, স্কিলশেয়ার ইত্যাদি অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম বিখ্যাত বিশ্ব জুড়ে। এই বিশ্বগ্রামের যুগে নির্দিষ্ট কোনো বিদ্যাপীঠ, কোনো দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এই প্ল্যাটফর্মগুলো কাজ করছে সবার জন্য। বিশ্বখ্যাত 'কোর্সেরা' হোক বা দেশের জনপ্রিয় 'টেন মিনিট স্কুল', 'বিবিসি বাংলা' হোক বা 'অন্য রকম পাঠশালা'- লার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলো বর্তমান যুগে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়িয়ে নেয়ার চমৎকার সঙ্গী।
তবুও বৈষম্য
তবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে ডিজিটাল যুগের এসব সাহায্য-সুবিধা যতই ব্যাপক হচ্ছে, ততই বাড়ছে এ নিয়ে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবল বৈষম্যের দাগটাও। এ প্রসঙ্গে গণ ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রিসোর্স পার্সন জনাব আহমেদ আরিফ বলেন, "বাংলাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল আছে, যেখান থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুবিধা নেবার মতোন অবস্থা নেই। আমি মনে করি না, আমাদের দেশের সকল শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছে।" তার মতে, দূরশিক্ষণ চমকপ্রদ একটা ব্যাপার হতে পারে, যদি এটাকে সঠিকভাবে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকরী করার ব্যাপারটা নিশ্চিত করা যায়। কাজে যে লাগছে না, তা বলা যাবে না। তবে যাদের কাজে লাগছে, সে অনুপাতটা অনেক কম।
শেষটায় আশার আলো
পড়াশোনার মধ্যে পার্থক্য যে আসছে, এটা অকপটেই স্বীকার করতে হবে। পৃথিবীতে সবচে দামী বিষয় যদি সময় হয়, তাহলে এই ডিজিটাল মাধ্যমের বিষয়টি শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে যে কয়েকটি দক্ষতা মানুষকে এগিয়ে রাখবে, সেটার মধ্য 'অ্যাডাপটিবিলিটি' বা খাপ খাইয়ে নেবার অভিযোজন ক্ষমতাটা বেশ উপরের দিকেই আছে। নতুন একটা ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা থাকলে তা সামনের দিনে এগিয়ে যেতে সহায়ক হবে হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে আমরা মানুষেরা এটাকে কীভাবে গ্রহণ করি, তার উপর; কেননা সব বস্তু বা মাধ্যমের ভবিষ্যত সম্ভাবনাই নির্ভর করে তার ব্যবহারকারীদের উপর।
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com