প্রেরণার উৎসভূমিতে যেতে হবে আমাদের-১
রওনক জাহান | Sunday, 15 August 2021
করোনা-অবরুদ্ধ সময়ের যেন আদি-অন্ত নেই। প্রবল স্থবিরতা গ্রাস করছে ক্রমশ। কিন্তু প্রকৃতি এর ব্যতিক্রম। সেখানে জীবনের বিচিত্র প্রকাশ। পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণের নিয়ম ধরে আমাদের ভূমিতে আসে গ্রীষ্ম, আসে বসন্ত। ছয় ঋতুর পালাবদলে কোনো ক্লান্তি এনে দিতে পারেনি কোভিড-১৯। এখন শ্রাবণের শেষ, আকাশে মেঘের ব্যস্ততা। আগস্টের এই সময়টাতে বাঙালি মাত্রই বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়। মুক্ত ভূমিতে জাতির পিতাকে সপরিবারে হারানোর কষ্ট, আফসোস আর বেদনাবোধে বারংবার ক্ষতাক্ত হই আমরা সবাই। শ্রাবণের বিরামহীন বর্ষণ যেন বাংলা প্রকৃতির হৃদয়ের সেই আর্তিকেই প্রকাশ করে।
এই গাঙ্গেয় উর্বরভূমি যতকাল টিকে থাকবে ততকাল বাংলার মানুষ পরম মমতায় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে বঙ্গবন্ধুকে। বেদনায় সিক্ত হবে পনেরো আগস্টের কালো অধ্যায়কে স্মরণ করে। একটি শৃঙ্খলিত জাতিকে মুক্তির লালসূর্য উপহার দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ি আর টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর সমাধিসৌধে তাই যেতে হবে আমাদের, যেতে হবে বারবার।
৩২ নম্বর ধানমন্ডি
সময়টা ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের শেষ। সেবারই প্রথম বত্রিশ নম্বর গিয়েছিলাম। তখন একাদশ শ্রেণিতে পড়ি। তারুণ্যের প্রথম ধাপ, বিমিশ্র এক আবেগে ভাসছিলাম। মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে যে বাড়িটি হয়ে উঠেছিলো ঠিকানা, ধানমন্ডির সেই বত্রিশ নম্বরে গিয়ে নির্বাক হয়ে যাই। এ বাড়িতেই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিবাহিত করেছেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর স্মৃতিচিহ্নে বাড়িটির সর্বত্রই সমৃদ্ধ। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে এখানে বসবাস শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ৬২ থেকে ৭১ পর্যন্ত জাতিসত্তার এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন, স্বাধিকারের লক্ষ্যে সংগ্রাম, দিকনির্দেশনা প্রদান, মুক্তিসংগ্রামের ঘোষণাসহ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলো এই বত্রিশ নম্বর। বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ঠিকানা তখন এটি।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যা এখন স্মৃতি জাদুঘর
আগস্ট ট্রাজেডির জান্তব সাক্ষীও এই বাড়ি। বত্রিশ নম্বরের প্রতিটি জিনিস সেদিনের সেই নির্মমতার সাক্ষী। এর প্রতি ইঞ্চিতে ইতিহাসের চরমতম সেই নৃশংসতার কতো শত চিহ্ন ছড়িয়ে আছে! বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘদিন বাড়িটি ছিলো অবরুদ্ধ। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছে বাড়িটি হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে এটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর-এ রূপান্তরিত হয়।
মূলত, বাঙালির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যে বাড়িটির নাম জড়িয়ে আছে, তাকে জানতেই হবে। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের স্মৃতিধন্য এ বাড়ির ইতিহাস কেবল একটি পরিবারের স্মৃতিচিহ্ন নয়। স্বজাতির ইতিহাসের অনিবার্য অংশ এই বত্রিশ নম্বর। আমি এবং আমার মতো যারা সেদিন প্রথম ওই ঐতিহাসিক বাড়িটি অবলোকন করেছি তারা প্রত্যেকেই স্তব্ধ ও অশ্রুসিক্ত ছিলাম বেশ কিছুক্ষণের জন্য।
এক একটি কক্ষে কী তাণ্ডব চালিয়েছিলো নরপিশাচেরা! দেখেছি সেই সিঁড়ি, সেখানে লেগে থাকা রক্তের দাগ, যেখানে বঙ্গবন্ধুর দেহখানি নিথরভাবে পড়েছিলো। আজ এতো বছর বাদেও বত্রিশ নম্বর বাড়িটিতে প্রথম যাওয়ার সেই অনুভূতি একদম টাটকা হয়ে আছে মনের ভেতর। সেদিন জাতি হিসেবে জনককে রক্ষা করতে না পারার বেদনার অক্ষমতা অনুভব করে কেমন অসার লাগছিলো নিজেকে। ১৯৯১ থেকে ২০২১ একটা লম্বা সময়, তবুও অনুভূতির অনন্যতায় উজ্জ্বল সেই মুহূর্ত।
ড. রওনক জাহান, সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ। rownakbabu21@gmail.com