logo

প্রথমে নিন্দাবাদ, তারপর ব্যবসায় ঝাঁপ

তালেবানের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক


জেভি বারএল | Thursday, 26 August 2021


মাসের পর মাস ধরে তালেবান কাবুল দখলের পরিকল্পনা করেছে। প্রথমেই আফগানিস্তান এবং তার প্রতিবেশী দেশ ইরান ও পাকিস্তানের সঙ্গে যে সীমান্ত পথগুলো আছে তার বেশিরভাগই কব্জা করে নেয় তালেবান। এরপর তারা পদানত করে বড়ো বড়ো বিভাগীয় শহর। এরপর তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে কান্দাহার আর সবার শেষে কুপোকাত করে কাবুল।

সীমান্ত পথগুলো তালবানের রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানের বৈধ সরকারকে হটিয়ে সে পথগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার পর তারা সেখান থেকে ট্রানজিট ফি আদায় করতে থাকে। প্রতিটি গাড়ি, প্রতিটি মালামাল,  প্রতিটি ব্যক্তি যেই হোক না কোনো, সীমান্ত পারাপার করলেই তার কাছ থেকে আদায় করে নেয় এই মাশুল। তালেবানের এই তৎপরতা আফগান সরকারের জন্য বিশাল আঘাত হয়ে ওঠে। আফগান সরকারের নগণ্য রাজস্ব আয়ের ৫০শতাংশই আসে শুল্ক থেকে।

আয়ের আরেক উৎস ছিল এবং আছে মাদক চোরাচালান। প্রধানত, কোকেন এবং হেরোইন ইরানের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্যে পাচার করা হয়। আফগান সরকারের হিসেবে বলা হয়, ২০২০ সালে আফিম-চাষের এলাকা বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে তালেবান আফগানিস্তান দখল করেছিল। সে সময় ধর্মীয় অনুভূতি থেকে আফিম চাষ কমানোর চেষ্টা করেছে। তবে তালেবান দ্রুতই বুঝতে পারে এতে নিজেদের এবং একই সাথে আফগানিস্তানের গ্রামীণ জনপদের মানুষজনকে কুড়াল মারার কাজটিই কেবল হচ্ছে। বাংলা প্রবচনে নিজের পায়ে কুড়াল মারার কথা বলা হয়েছে, এখান অবশ্য কুড়ালের কোপ পড়ছে পায়ে নয় আয়ে। আফগানিস্তানের মানুষকে আফিম চাষের ওপর নির্ভর করতে হয়। যাহোক, তালেবান নিজেদেরকে দ্রুত শুধরে নেয়। আর আফগানিস্তান ঝটপট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাদক চোরাচালানকারী দেশ হয়ে ওঠে।

আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বৈধ সরকার যতদিন ছিল ততদিন দেশটিতে বিদেশি সহায়তার বন্যা বয়েছে। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি-র ৮০ শতাংশেরই যোগান দিয়েছে এই সহায়তা। এর পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার হবে বলে মনে করা হয়। এই সহায়তাই আফগান সরকারের বাজেটের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের থলি হয়ে উঠেছে। ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক জোট আফগানিস্তান জয় করে। এই জয়ের প্রথম বছরেই দাতা দেশগুলো আফগানিস্তান গড়ার কাজে এগিয়ে আসে। দেশটিতে যে হাজার হাজার বিদেশি সেনা ঢুকেছিল তারাই সেখানকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাদের সাথেই আফগানিস্তানের মাটিতে এসে জড়ো হয় ঝাঁকে ঝাঁকে ঠিকাদার ও সেবাদানকারী সংস্থা। দুর্নীতি দাবানলের মতোই ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে নিতে থাকে তারা।

২০২০ সালে দাতাদেশগুলো আফগান সরকারকে ১২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। মোটা অংকের এ অর্থ ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেওয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতিতে উল্লেখ করা হয়। মার্কিন সরকার একাই দেশটিতে সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ করে ৩.৯ বিলিয়ন ডলার। ক্ষুদ্র এবংমাঝারি ব্যবসার জন্য আফগান সরকার বাজেট বরাদ্দ করে ২৯.৫ কোটি ডলার। এ তহবিল দেশটিতে ১৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করবে বলে দাবি করা হয়। তবে দাতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থারা নির্ভুলভাবেই জানত যে এ অর্থ গৌরী সেনের টাকা হয়ে উঠবে। বরাদ্দ প্রকল্পে খরচ হবে না বরং মোটা অঙ্ক শেষ পর্যন্ত হাতিয়ে নেবে কিছু ব্যক্তি এবং রাজনীতিবিদ।

আবর্জনা কিনতে ৫ ০কোটি ডলার আফগানিস্তানে দুর্নীতি এবং চুরির ব্যাপকতা বোঝার জন্য জুলাইয়ের শেষে প্রকাশিত একটি মার্কিন প্রতিবেদনের দিকে একটু চোখ বুলালেই হবে । আফগানিস্তানে পুনর্বাসন তৎপরতার নজরদারিতে নিযুক্ত মার্কিন দফতর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, আফগান সেনাবাহিনীর জন্য রিফারবিশড বা পুনর্নির্মিত ২০টি পরিবহন বিমান কেনার খাতে ৫৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার দেয় আমেরিকা। উড়োজাহাজগুলো আসার পর দেখা গেল, এগুলো ওড়ার উপযুক্ত নয়। পুনর্নির্মাণের জন্য মেরামত দায়সারাভাবে করা হয়েছে। উড়োজাহাজের নিরাপত্তা মানদণ্ড মোটেও মানা হয়নি। কয়েকবছর বাদে, এগুলো মধ্যে ভাঙ্গারি হিসেবে ১৬টি বিমান ৪০ হাজার ডলারে বেচে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০০৮ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে নির্মাণ ও যানবাহন খাতে ৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়। এর মধ্যে মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার নির্ধারিত কাজে খরচ হয়। বাকি টাকা কোন ‘দরিয়ামে ঢালা’হয়েছে তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

আফগানি সেনাবাহিনী তালেবানের জয় ঠেকাতে কেন ব্যর্থ হয়েছে তারও আংশিক ব্যাখ্যা উঠে এসেছে এ প্রতিবেদনে। আফগানিস্তানে খাতাকলমে তিন লাখ ২০ হাজার সেনা ছিল বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সত্যিকারভাবে মাত্র দুইলাখ ৮০ হাজার সেনা ছিল। প্রবাদের কাজির গরুর মতোই হিসাবে যাই দেখানো হোক না কেন,  ‘গোয়ালে’তার সবকটি কখনোই ছিল না। তবে এসব সেনাদেরবেতন-ভাতার পুরো টাকা দিয়ে কমান্ডার সাহেবদের ট্যাঁক ভর্তি হয়েছে। সে যাই হোক, কাবুল সরকারের পতনের সাথে সাথেই ‘গৌরীসেনদের’এটাকাও কর্পূরের মতোই উবে গেছে। এসব টাকার জোরেই আফগানিস্তানের অর্থনীতির চাকা কার্যত ঘুরেছে।

বিদেশি সহায়তা গোষ্ঠীগুলো হয় আফগানিস্তান থেকে সরে পড়েছে না হয় দ্রুত সরে পড়বে। তবে তাদের আগেই দেশটিতে মোতায়েন বিদেশি বাহিনীর সেনা সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে আফগান অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে তারা যেসব তৎপরতা চালাচ্ছিল তাও আস্তেআস্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তালেবান যদি ঘরের বাইরে নারীদের কাজকর্মের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় তবে দেশটিতে বেকারের হার আরো বাড়বে বলেই আশংকা। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের শ্রমবাহিনীর মাত্র ১৬ শতাংশ ছিল নারী।মনে করা হয়, দেশটির সেকেলে জীবনযাত্রা ও সামাজিক রীতিনীতি বদলে দেওয়ার জন্য এই সংখ্যাই যথেষ্ট।তাছাড়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে তারা দেশটিতে নতুন আশার আলো জাগাতে পারবে।

আফগানিস্তানে দুর্নীতির বিশাল চোরাবালি সত্ত্বেও দেশটির সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের সম্প্রসারণ করতে পেরেছে। এই দুইখাতে উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দও করেছে। আফগানিস্তানের পুরুষদের অর্ধেকেই নিরক্ষর, নারীদের মধ্যে এই হার আরো বেশি। তা সত্ত্বেও শিক্ষাবিস্তারে আংশিক সফল হয়েছে আফগান সরকার। তালেবানের আমলে ছেলে-মেয়েদের স্কুল পাঠাতে নিষেধ করেছে তালেবান। কিন্তু আফগান সরকার এমন কোনো বাধা-নিষেধ দেয়নি। তবে শিক্ষাখাতের ৭৮ শতাংশ টাকাকড়িই এসেছে রাষ্ট্রীয় বাজেট নয় বরং ব্যক্তিগত তহবিল হতে।এদিকে, এবারে আশংকা করা হচ্ছে যে, পড়াশোনা নিয়ে পুরানো বাধা-নিষেধ হয়ত আবার চাপিয়ে দেবে তালেবান।

আফগান সরকার কাগজে-কলমে স্বাস্থ্যখাতেও প্রচুর বরাদ্দ দিয়েছে। আরো একটি হাসপাতাল বা ক্লিনিক উদ্বোধনের খবর মাঝে মাঝে দেখা যেত। কিন্তু কতোগুলো অসমাপ্ত দালান-কোঠা এবং যন্ত্রপাতি বা কর্মীহীন স্থাপনা ছাড়া শেষ পর্যন্ত আর কিছুরই দেখা মিলত না বাস্তবে।

উভয় সংকটে পাশ্চাত্য আফগান সরকারের পতন এবং তালেবান গোষ্ঠীর উত্থানের ফলে দেশটির বেসামরিক সরকারকে অর্থ যোগান এবং দেশ পরিচালনার বিষয়টি নতুন করে শ্যেন নজরে নিয়ে এসেছে। গরিব এবং হতভাগ্য দেশকে হাতে পেয়েছে তালেবান। দেশটির অনেক অঞ্চলে এখনো সুপেয় পানি সরবরাহ নেই, নেই কোনো কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু এই হতভাগ্য দেশটির মাটির নিচে রয়েছে অঢেল সম্পদ। ২০১০ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত ভূতাত্ত্বিক এবং গবেষকরা দেশটিতে জরিপ চালায়।তাঁরা দেখতে পান যে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ রয়েছে দেশটির মাটির তলে। বর্তমানে এ সম্পদের পরিমাণ তিন ট্রিলিয়ন ডলার বলে হিসাব করা হয়েছে।

আফগানিস্তানের মাটির নিচে অন্যান্য আকরিকে মধ্যে ৫০ কোটি ডলার মূল্যের সমপরিমাণ লোহা, তামা, নিওবিয়াম, কোবাল্ট এবং মূল্যবান লিথিয়াম রয়েছে। গাড়ির ব্যাটারি, কম্পিউটার, সেলফোনসহ আরো অনেক কিছুতেই এই মূল্যবান আকরিকের ব্যবহার অপরিহার্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিথিয়ামের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। বছর কয়েক আগে,  পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে আফগানিস্তানকে ‘লিথিয়ামের সৌদি আরব’হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। 

আফগানিস্তানে তৈরি আফিম, কোকেন এবং হিরোইনে পশ্চিমের বাজার সয়লাব হয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ঠিক সে সময়ে চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তান তালেবান নেতাদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার কাজে আদাজল খেয়ে নেমেছে। এসব দেশের চোখ রয়েছে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের দিকে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরএই) গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হলো আফগানিস্তান। দেশটির বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যখন তালেবান লড়াই করছিল তখন সেখানকার খনিজ শিল্পের বিকাশ ঘটানো ও খনিজ সম্পদ আহরণের কাজ করেনি চীন।

আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ তালেবানের নিষ্ঠুরতার শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। তবে এতে চীন বা রাশিয়ার তেমন কিছুই যায় আসে না। দেশটিতে মস্কো ও বেইজিংয়ের বিনিয়োগকে নিরাপত্তা দেবে তালেবান আর এমন লোভনীয় পরিস্থিতিতে দুই দেশের বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই মোটা মুনাফার স্বপ্ন দেখবেন, উল্লাস বোধ করবেন।কেবল চীন, রাশিয়া এবং পাকিস্তানই আফগানিস্তানের মাটির তলের সম্পদের দিকে লোভাতুর চোখে তাকাচ্ছে তা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রসচিব গত সপ্তাহে তড়িঘড়ি নিজেদের অবস্থানকে পরিষ্কার করেন। তিনিবলেন, ‘যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে তালেবান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবারে তাদের সাথে আলাপ-আলোচন ‘ করবে। ‘কি কথা তাহার সনে?’  মানবাধিকার নিয়ে? নাকি ইসলামের মধ্যপন্থী ব্যাখ্যা নিয়ে?  নাকি অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে?

এই শাঁখের করাতে পড়েছেন জো বাইডেনও। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপ লাইন বসানোর বিষয়ে ১৯৯৭ সালে আমেরিকান তেল কোম্পানি আনোকালের সাথে কথা বলেছে তালেবান। এই পাইপলাইন তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান ও ভারতে যাবে।

পাশ্চাত্যের সাথে বাণিজ্য করতে সে সময় ধর্ম তালেবানের জন্য কোনো বাধা হয়ে দেখা দেয়নি। একইভাবে আনোকাল এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এমন বাণিজ্য করে দেশটিতে মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটাননি। মনে হচ্ছে, তালেবানের বিজয়ের ডামাডোল কেটে গেলেই আমরা দেখতে পাবো, পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা স্যুট-টাই পরে কাবুলের দামি দামি হোটেলগুলোতে তালেবানের সাথে ব্যবসার আলাপে মেতে গেছে।

[হারেৎস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]