পোষা প্রাণী নিয়ে সেরা চলচ্চিত্রগুলো
মোঃ ইমরান | Friday, 15 July 2022
পোষা প্রাণীর সাথে মানুষের সম্পর্ক একটি সুন্দর ভ্রমণের মতো। এই ভ্রমণ যাত্রায় আবেগ, ভালোলাগা কিংবা কিছুটা বিরক্ত হওয়া সবকিছু উপভোগ করা যায়। পোষা প্রাণী নিয়ে বাস্তবের এই অভিজ্ঞতাগুলো বিভিন্ন সময়ে সিনেমাতে উঠে এসেছে।
মার্লে অ্যান্ড মি (২০০৮)

আপনি ধনী নাকি গরীব পোষা প্রাণীর এসবে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তারা চায় আদর আর ভালোবাসা। মারলি অ্যান্ড মি সিনেমা এরকমই একটি ভালোবাসার গল্প বলে।
জন আর জেনি হলেন সাংবাদিক নবদম্পতি। বাচ্চা নেয়ার আগে তারা কতটুকু বাচ্চা লালন-পালনে যোগ্য এটি বোঝার জন্য একটি কুকুর পোষে। কুকুরের নাম বিখ্যাত গায়ক বব মার্লের নামে রাখা হয়। শুরুতে মার্লে একেবারেই কথা শুনে না। সারাক্ষণ জন ও জেনির জীবনে দম ফেলবারও সময় দেয় না। তাকে কুকুরের আচরণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে দিলেও ফিরে আসে।
এক সময় জন তার পত্রিকার কলামে মার্লেকে নিয়ে লেখা শুরু করে। কলামগুলো এতটাই বিখ্যাত হয় যে পত্রিকার কাটতি বেড়ে যায়। অর্থ-কড়ির অভাব হয় না এই দম্পতির।
একটা সময় জন ও জেনির জীবনে হতাশাও নেমে আসে। কিন্তু ধীরে ধীরে ওই সময়টাতে তারা মার্লের কদর বুঝতে পারে। মার্লে শুধু বিরক্ত করেনি সে ভালোবাসতে জানে, যখন কেউ জন ও জেনির পাশে থাকে না তখন সে পাশে থাকতে জানে।
মার্লি অ্যান্ড মি সিনেমাটি সাংবাদিক জন গ্রগানের একই নামে আত্মজীবনীর উপর নির্মিত। সিনেমার পরিচালক ছিলেন ডেভিড ফ্রাঙ্কেল।
এইট বিলো (২০০৬)

২০০৬ সালে নির্মিত সিনেমাটি হলো প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে। অ্যান্টার্কটিকায় একটি দল গবেষণা করছিলেন। যার জন্য উঁচু বরফাচ্ছন্ন পাহাড়ে তাদের যেতে হতো, তার জন্য প্রয়োজন পড়তো কুকুরের গাড়ির।
তবে অ্যান্টার্কটিকায় আবহাওয়া যখনতখন খারপ হয়। এরকমই একটি সময়ে হঠাৎ বেইজ ক্যাম্প খালি করে যেতে হয় গবেষণা দলের। যাওয়ার সময় তারা কুকুরগুলোকে বেধে রেখে যায়। কুকুরের দেখভাল করা লোকটি হাজার বার মানা করা সত্ত্বেও দলের অন্যান্য সদস্যরা তা মানেনি।
পরে দীর্ঘ ছয় মাস পর কুকুরের মালিক তাদের রক্ষা করতে আসে। কিছু মানুষের স্বার্থপরতা, পোষা কুকুরের কুকুর পালকের সম্পর্ক, তাদের টিকে থাকা এসব কিছু নিয়েই এই সিনেমার গল্প। ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিরিজের পল ওয়াকার এখানে কুকুর পালকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সিনেমাটি একই সাথে এডভেঞ্চারাস এবং আবেগীয়।
আ স্ট্রিট ক্যাট নেইমড বব (২০১৬)

কুকুর থেকে এবার বিড়ালে আসা যাক। জেইমস বাওনি লন্ডনের পথ শিল্পী। লন্ডন শহরের রাস্তার ধারে বিভিন্ন ধরনের বাদ্য বাজান। জেইমসের অতীত সুখকর ছিল না। তার মাদকের নেশা ছিল তারপর ইউরোপের জাঁকজমকপূর্ণ শহর লন্ডনে ছিল না তার কোনো থাকার জায়গা। বন্ধু ভ্যাল তাকে একটি এপার্টমেন্টে থাকার সুযোগ করে দেয়।
একদিন তার ঘরে আসে একটি জিনজার বিড়াল। সে বিড়ালটি তাড়িয়ে দিলে পরের দিন সেটি আবার আসে। কিন্তু এবার বিড়ালের একটি পা ভাঙ্গা। জেইমস আর দেরি না করে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। বিড়ালটির নাম দেয়া হয় বব। ইতোমধ্যে বব জেইমসের সাথে ভালোমত মিশে যায়, যদিও ঠিকানা ছাড়া জেইমস তাকে চায় না। কারণ এই শহরে জেইমসেরই কোনো জায়গা নেই।
কিন্তু ঘটনাক্রমে দেখা যায় বব জেইমসের পিছু ছাড়ে না। জেইমস যেখানে যেখানে যায় বব তার পিছনে চলে আসে। ববকে দেখে পথচারীরাও জেইমসের গান শুনাতে জন্য দাঁড়ায়। তারপর যেন জীবনে অপ্রত্যাশিত এক মোড় আসে তার জীবনে।
এই সিনেমার গল্প জীবনী মূলক বই থেকেই নেয়া। বইটির নাম ‘একর্ডিং টু বব’
হাচি: আ ডগ'স টেল (২০০৯)

পোষা প্রাণী নিয়ে যেই সিনেমাগুলোর কথা পাঠকেরা জানেন, তাদের মধ্যে এটি সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয়।
সত্য কাহিনীর ওপর নির্মিত সিনেমাটি আমাদেরকে পোষা প্রাণীকে শুধুই প্রাণীর বাইরে নিজেদেরই অংশ ভাবতে শেখায়। সব সিনেমাতেই তাই। তবে হাচি শুধু ভাবায় না কাঁদায়ও।
সংখ্যা ৮ কে জাপানিজরা হাচি বলে। হাচিকোকে একটি রেল স্টেশনে পায় প্রফেসর পারকার। সেখান থেকে তাকে ঘরে নিয়ে আসা। গল্পটি আনুগত্যের পরিচায়ক। কীভাবে সম্পর্কে অনুগত হতে হয় কেউ হাচিকে দেখে শিখবে। জাপানে হাচির স্মরণে একটি ভাষ্কর্যও রয়েছে। মূল কাহিনী জাপানের এবং এ নিয়ে জাপানে সিনেমাও নির্মাণ করা হয়। ২০০৯ এই সিনেমাটি মূলত জাপানি সিনেমাটি থেকে অনুপ্রাণিত।
তেরি মেহেরবানিয়া (১৯৮৫)

কুকুর নিয়ে এই সিনেমা বলিউডের। রাম একজন সৎ মানুষ। প্রভাবশালী সন্ত্রাসের দল তাকে হত্যা করে। তাকে হত্যা করার সময় তার পোষা কুকুর মতি দেখে ফেলে।
তারপর মতি একে-একে রামের হত্যাকারীদের ওপর প্রতিশোধ নেয়। শুনতে আজগুবি হলেও বলিউডের এই সিনেমাটি বেশ জনপ্রিয়। এর গান ও গল্পে মতিই হিরো। রামের ভূমিকায় অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে সিনেমাটির অবদান অনেক।
হাতি মেরে সাথি (১৯৭১)

রাজেশ খান্না অভিনীত এই সিনেমায় পোষা প্রাণী হলো একটি হাতি। অনাথ রাজুকে চিতাবাঘের হাত থেকে রক্ষা করে রামু (হাতি)। এরপর থেকে হাতি নিয়েই রাস্তা ঘাটে তামাশা দেখায় রাজু।
প্রেম হয়, প্রেমের পর বিয়ে হয় ধনী ঘরের মেয়ে তনুর সাথে। সন্তান নেয়ার পর তনু রাজুকে শর্ত দেয় হয় পরিবারের সাথে থাকতে হবে, না হয় হাতির সাথে। রাজু তার বন্ধু রামুকে বেছে নেয়।
ঘটনাক্রমে রাজুর পরিবার বিপদে পড়ে, খুব স্বাভাবিকভাবেই রামু তাদের উদ্ধার করে। ঐ সিনেমাটি ছিল সুপার হিট। মূল্যস্ফীতি হিসেব করলে এখনকার সময়ে এটি আয় করে ৯৬০ কোটি রুপি!
সেভেন সেভেন সেভেন চার্লি (২০২২)

মুক্তির পর থেকেই কানাড়ি সিনেমার নক্ষত্র বলা হচ্ছে সিনেমাটিকে।
ধর্মা একজন রগচটা যুবক যার জীবনে খুবই একগুঁয়ে। কোনো স্বপ্ন নেই, ইচ্ছে নেই। সারাদিন কাজ বা এখানে সেখানে পড়ে থাকা, ঝগড়া করা, রাত হলে ইডলি (দক্ষিণ ভারতীয় খাবারবিশেষ) খাওয়া এবং মদ পান। সে এতোটাই বাজে যে আশেপাশের মানুষ বলে কোনো কুকুরও তাকে পছন্দ করবে না।
তবে তাকে পছন্দ করেছে একটি কুকুর, নাম তার চার্লি। প্রথমে চার্লিকে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও ক্রমেই তার প্রেমে পড়ে যায় ধর্মা। একটা সময় এমন হয় যে ধর্মা চার্লিকে ছাড়া যেতে চায় না।
সিনেমাটি দেখলে মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের সাথে মিল পাওয়া যাবে। যুধিষ্ঠির একটি কুকুরকে নিয়ে স্বর্গের পথে রওনা দেয়। যদিও সেটি কুকুর নয় যম দূত ছিল। কিন্তু স্বর্গে যেতেই যখন বলা হলো কুকুরটির স্বর্গে প্রবেশ নিষেধ, তাকে বাইরে ছেড়ে আসতে হবে যুধিষ্ঠির তা মানলেন না। তিনি তার সফরসঙ্গী কুকুরকে ছাড়বেন না।
এই সিনেমাগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় এর বেশিরভাগই বাস্তব কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত। মানুষের সাথে প্রাণীর সম্পর্ক মালিক আর দাসের না বন্ধুত্বের, প্রেমের ও সঙ্গীর। তারপরও আমরা দেখি নির্বিচারে প্রাণীদের ওপর অত্যাচার।
প্রাণীরা আমাদের কাছে কী চায়?
সেভেন সেভেন সেভেন চার্লিতে ধর্মা জিজ্ঞেস করে, "চার্লি কতটা ভালোবাসো তুমি আমায়?" উত্তরে চার্লি ধর্মাকে জড়িয়ে ধরে। এটুকুই চায় তারা।
মো: ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা করছেন।
imran.tweets@gmail.com