পেরুর যে গ্রামে সব পুরুষ অন্ধ হয়ে যান!
মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Sunday, 24 April 2022
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু। এর অনেক গভীরে থাকা প্রত্যন্ত একটি গ্রাম প্যারান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রামের মানুষের ভেতর শিক্ষার বিস্তার ঘটেনি। বাইরের জগতের সাথেও তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
এর ভেতর একদিন গ্রামে আসে একটি খননকারী দল। তারা মূলত খনি থেকে সম্পদ উত্তোলনের কাজ করে থাকেন। তারা খেয়াল করেন এই গ্রামের চমকপ্রদ রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়।
প্যারান নামের এই ভীষণ দুর্গম গ্রামে বয়স পঞ্চাশ হলে হারিয়ে যায় পুরুষদের দৃষ্টিশক্তি। সবার পুরোপুরি হারায়না, তবে অনেকে একেবারে অন্ধ হয়ে যায়।
গ্রামে খুব বেশি মানুষের বাস নেই। সবমিলিয়ে ৩৫০ - ৩৬০ জন মানুষের বাস। এর ভেতর ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ অন্ধ হয়েছেন ৬০ এরও অধিক পুরুষ - যাদের সবার বয়স ৫০-এর ওপরে।
গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ছিল অতিলৌকিক সব ব্যাপার-স্যাপারে। তারা মনে করতেন অতীতের কোনো পাপের ফল বহন করতে হচ্ছে তাদের। হয়ত কো্নো দেবতার অভিশাপে তারা হারিয়ে ফেলেন দৃষ্টিশক্তি।
আর শিক্ষার সুযোগ না থাকায় তারা এসব নিয়ে এর বেশি কিছু ভাবতেও পারেননি। এভাবে যুগের পর যুগ চলে গেছে।
গ্রামটির বেশিরভাগ মানুষ পিচফল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা সবসময় ব্যস্ত থাকেন এই চাষের কাজ নিয়েই। এদিকে সরকারি সহায়তা বা তেমন কোনো এনজিও কার্যক্রমও ছিল না। কাজেই প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া মোটামুটি রুক্ষ পাহাড়ি ভূমিতে চাষের কাজ করে তাদের দিন চলে যাচ্ছিলো। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই অন্ধত্বও তাদের কাছে হয়ে উঠেছিল দেবতার অভিশাপের ফলে ঘটা একটি স্বাভাবিক বা নৈমিত্তিক ঘটনা।
তারপর ২০১৭ সালের দিকে সেখানে একটি খননকারী দল আসে। মূল্যবান বিভিন্ন খনিজ সম্পদের সন্ধান পেয়েই তাদের আসা। তারা দেখলেন এই গ্রামের পুরুষদের সবাই ৫০ বছরের পর দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করে। বয়স ৬০ হতে হতে পৃথিবীর আলো দেখতে পাননা দুচোখে।
তারা ব্যাপারটি নিয়ে কৌতূহলী হন। বাইরে যোগাযোগ করে জানানো হয়। অনেক সাংবাদিক ও চিকিৎসকরা আসেন। পরীক্ষা - নিরীক্ষা করে ডাক্তাররা দেখেন এটি একটি জিনঘটিত বিরল রোগ; নাম রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা।
এর ফলে বয়সের সাথে সাথে চোখের 'টানেল ভিশন' নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ৫০-৬০ বছরের পর আর কেউ দেখতে পাননা। যারা একটু সৌভাগ্যবান, তারা দেখেন আবছা, কুয়াশার মত দৃষ্টি নিয়ে।
রেটিনায় আলো প্রতিফলিত হওয়ায় আমরা দেখতে পাই। এখানে রড ও কোণ নামের দুরকম কোষ থাকে। রড কোষ রাতে দেখতে সাহায্য করে। আর কোণ কোষ বর্ণ চিনতে ও উজ্জ্বলতায় সাহায্য করে।
এই রোগে সর্বপ্রথম রড কোষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে রোগী রাতে দেখতে পাননা। এই সমস্যা সাধারণত কৈশোরকাল থেকেই শুরু হয়। তবে পরবর্তীতে কোণ কোষও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এতে করে রোগী বর্ণ শনাক্তে অক্ষম হয়ে পড়েন। একসময় চোখের ঔজ্জ্বল্য পুরোপুরি হারিয়ে তারা সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। সাধারণত ৫০-৬০ বছরের ভেতরই তাদের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
এই গ্রামে বহু আগে ৭ টি পরিবার এসে বসতি গড়েছিল। চিকিৎসকদের ধারণা, তাদেরই কারো মাধ্যমে এই জিনগত রোগ এখানে এসেছে। তারপর বিয়ে, পরিবার গঠনের মাধ্যমে পুরো গ্রামেই ছড়িয়ে গেছে।
মূলত এটি পুরুষদেহে আসে মা থেকে। সেই মা - রা আবার পান তাদের বাবা থেকে। নারীদেহের দুটো ক্রোমোজোম হলো এক্সএক্স, পুরুষদেহে এক্সওয়াই। মূলত এক্স ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে এটি ঘটে থাকে।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় পুরোপুরি সারানো যায়না। জিনগত রোগ হওয়ায় বংশপরম্পরায় এমন ঘটে চলেছে পেরুর গহন গ্রাম প্যারানের অধিবাসীদের সাথে। ৫০ বছর বয়সের পর থেকে নিভতে শুরু করে ৬০ এর পর পুরোপুরি নিভে যাচ্ছে দৃষ্টিপ্রদীপ। তবে দেবতার অভিশাপ নয়, এর পেছনে আছে জিন, বংশগতি আর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com