পূজায় বাঙালির মিষ্টিমুখ
লাবণ্য ভৌমিক | Monday, 11 October 2021
ঢাকে কাঠি পড়লো বলে
মা আসছে বাপের ঘরে
ছেলেপুলে সঙ্গে নিয়ে
আসছে উমা ঘোটকে চড়ে।
বর্ষা ও শীতের মধ্যে ছোট সময়ের জন্য উঁকি দেয় সবার প্রিয় শরৎকাল। প্রকৃতির এই সুন্দর পরিবর্তন দেয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। শুভ্র শরৎ জানান দেয় বছর ঘুরে মর্ত্যবাসীর অপেক্ষা অবসানের দিন প্রায় চলে এসেছে, এবার ঘরের মেয়ে উমাকে বরণ করার পালা।
পূজা হবে আর মিষ্টি হবে না- এটা ভাবাই যায় না। স্মৃতির পাতা একটু উল্টে দেখা যায়, পূজা এলেই স্কুল-কলেজের অন্য ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের নারকেল নাড়ুর আবদারের বৃষ্টি। ওদিকে ঘরে মা-বৌদিদের নাড়ু বানানোর হিড়িক পড়ে যেত।
যেমন, নারকেলের নাড়ু, তালের নাড়ু, গুড়ের নাড়ু; সাথে খাস্তা-গজা। পূজায় অতিথি থেকে শুরু করে ঠাকুরের পূজার তত্ত্বে মিষ্টি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে দেখা যায়, দুর্গোৎসব মূলত উচ্চবংশীয় জমিদার বাড়িগুলোর বিশেষত্ব ছিল। কালক্রমে বংশপরম্পরায় এখনও অনেক জমিদার বাড়িতে ঘটা করে পূজা হয়। কিন্তু পূজা এখন আর শুধু জমিদার বাড়ির আঙ্গিনায় সীমাবদ্ধ নয়, পেয়েছে সার্বজনীনতা।
পূজা উপলক্ষে একদিকে যখন চলে পোশাক-আশাক ও সাজগোজের কড়চা, অন্যদিকে ভোজন রসিক বাঙালি স্বপ্ন বুনতে থাকে হরেক রকম মিষ্টি দিয়ে উদরপূর্তির। এ শুধু ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত জিভের খোরাক মেটানো নয়, দুর্গাপূজার মিষ্টি বাঙালির ঐতিহ্যও বটে।
এমনই জিভে জল আনা কিছু মিষ্টির মাঝে রয়েছে কমলাভোগ, রসগোল্লা, ছানার সন্দেশ, রসকদম, নারিকেলের লাড্ডু, ছানার কালোজাম, জিলেপি, ক্ষীরের পায়েস, ল্যাংচা, চমচম, কাঁচাগোল্লা, বুন্দিয়া, পায়েস, প্যাড়া, নিমকি, খইয়ের নাড়ু, তিলের নাড়ু, চিড়া আর মুড়ির নাড়ু- আরো কত কি।
মিষ্টিপ্রেমী মানুষের জন্য মিষ্টির কারিগররা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বৈচিত্র্যময় সুস্বাদু সব মিষ্টির রসনা সাজিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়তই। তাই পূজা এলেই মিষ্টির দোকানগুলোতে জমে ওঠে হরেকরকম মিষ্টির অর্ডার আর মিষ্টিপ্রেমীদের ভিড়।
হিন্দু শাস্ত্র বলে, পাঁচ প্রকার মিষ্টি দিয়ে দেবী দুর্গাকে বরণ করতে হয় আর ভক্তদের মাঝে মিষ্টি দিয়ে প্রসাদ বিতরণ করতে হয়। কারণ মিষ্টিকে অনেকেই আনন্দের প্রতীক হিসেবে মনে করেন।
পূজায় মিষ্টির চাহিদা পূরণ করতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে কারিগররা। বর্তমানে প্রচলিত মিষ্টিগুলো স্থান ভেদে ভিন্ন হয়। একেক অঞ্চলে একেক মিষ্টি প্রচলিত।
দিনাজপুর, রংপুর বা নাটোরের দিকে বিখ্যাত ছানামুখী, ছানার বরফি, ছানার পোলাও, ছানার আমিত্তি, ছানা ভাজা, ছানা মাছ, মাছের আমিত্তি, বাদশা ভোগ, রাজভোগ, আঙ্গুরী, স্পঞ্জ মিষ্টি, মালাই মিষ্টি, রসমলাই, কদম্ব, ক্ষীর কদম্ব, ক্ষীর জাম, জাফরান ভোগ, মনোরঞ্জন, সেন্ডোজ, চমচম, কালজাম, হাবসি হালুয়া, লাড্ডু, পেড়া, সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা, নিমকি, ইত্যাদি।
যশোরের জামতলার রসগোল্লা ও চমচম, খুলনার মিহিদানা লাড্ডু, রাজবাড়ীর চমচম, ফরিদপুরের মালাই সর, বরিশালের গটিয়া সন্দেশ ও আদি রসগোল্লা। রাজশাহীর রসকদম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালো তিল কদম, পাবনার ইলিশপেটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি ইত্যাদি।
এছাড়াও আছে লালমোহন,কাঁচা ছানা, ছানার জিলাপি, ভোগসাগর, সাদা চমচম, মালাই সর, সরের মালাই, মালাই চপ, শাহী ভোগসহ আরও অনেক কিছু।
মায়ের আগমন থেকে বিদায়ের সুর পর্যন্ত চলে মিষ্টিমুখ। পূজা আসলেই প্রথমেই চলে দেবীকে ঘরে আনার আহ্বান প্রস্তুতি। রসগোল্লা আর সঙ্গে রকমারি সন্দেশ দিয়ে মায়ের বরণ হয়। এরপর অষ্টমী, নবমীতেও চলতে থাকে পূজার থালায় মিষ্টির সমাবেশ।
এভাবেই চলে আসে দেবী বিসর্জনের পালা- বিজয়া দশমী। দেবী মাকে ভালোবেসে সিঁদুরে রাঙিয়ে মিষ্টিমুখ করায় মা-বউরা, কারণ বাঙালিরা কখনো যে মাকে বিদায় জানায় না। সকলে বলে “আসছে বছর আবার হবে।”
দশমীর রেশ না কাটতেই, কুশল বিনিময় পর্বে মিষ্টিমুখ হয়। ঐতিহ্য মেনে দশমীর মিষ্টির প্লেটে থাকে রসগোল্লা-পান্তুয়া থেকে শুরু করে সীতাভোগ-মিহিদানা বা বাড়ি তৈরির সেই নাড়ু-গজা-নিমকি।
যুগ থেকে যুগান্তরে দুর্গাপূজার মিষ্টিগুলো বাঙালিয়ানাকে করেছে আরো সমৃদ্ধ, আরো উজ্জীবিত। আবহমান বাংলার ধর্মপ্রাণ মানুষগুলোর উপসনাকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানগুলোতে করেছে প্রাণের সঞ্চার।
বর্তমানে যোগাযোগ মাধ্যমের উৎকর্ষের কারণে ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বানানোর রেসিপিও ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। ফলে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি বাঙালির মিষ্টিমুখ অনুষ্ঠানে অবলীলায় জায়গা করে নিচ্ছে দুর্গাপূজার মিষ্টি।
লাবণ্য ভৌমিক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।
labanyabhowmik1777@gmail.com