logo

পুরান ঢাকার অলি-গলিতে

মোঃ ইমরান | Tuesday, 28 December 2021


পুরান ঢাকার রাস্তার নামগুলো বরবারই বেশ নান্দনিক ও শ্রুতিমধুর। কেউ যদি হৃষিকেশ দাস রোড দিয়ে হাঁটা শুরু করে নারিন্দার পাড়ে পৌছায় তাহলে তিনি জানতে পারবেন এখানে একটি মসজিদ আছে যা প্রায় পাঁচ শতাধিক বছর পুরানো। 

নারিন্দা পেড়িয়ে এগিয়ে টিপু সুলতান কিবা আরো এগিয়ে গেলে দেখা মেলবে র‍্যানটিন স্ট্রিট, ওয়্যার স্ট্রিট তথা সমগ্র ওয়ারী। এই নামগুলোর পিছনে রয়েছে গল্প ও ইতিহাস। এই নামের পিছনের কাহিনী নিয়েই আজকের লেখা।

হৃষিকেশ দাস রোড

বর্তমান সূত্রাপুর থানার এক অংশের নাম ছিল ওয়াল্টার রোড। উনিশ শতকে ওয়াল্টার রোড থেকে নারিন্দার পুল পর্যন্ত বৈদ্যুতিক বাতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এই বৈদ্যুতিক বাতির খরচ দিয়েছিলেন হৃষিকেশ দাস নামে একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তার নামেই নারিন্দার ওপারের রাস্তাটি হয়ে যায় হৃষিকেশ দাস রোড।

তিনি ছিলেন একজন ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী। ইট-সুরকি, চুন উৎপাদনসহ ছিল তার নানা ব্যবসা। তিনি টিকাটুলির রোজ গার্ডেনও নির্মাণ করেন

র‍্যানকিন স্ট্রিট

ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্র্যাট টি. জে. র‍্যানকিনের নামে এই জায়গাটির নাম দেয়া হয় র‍্যানকিন স্ট্রিট। টিপু সুলতান রোডের বিখ্যাত জমিদার বাড়ি শঙ্খনিধি হাউজের সাথে বরাবর রাস্তাটিই র‍্যানকিন স্ট্রিট। এটি পুরান ঢাকার ওয়ারীর বিখ্যাত রাস্তা গুলোর মধ্যে একটি। 

টি জে র‍্যানকিন ১৮৮০ এর দিকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব নিয়ে ওয়ারীতে আসেন। তখন তিনি পরিপূর্ণ পরিকল্পনা করে এই সুন্দর নগর এলাকাটি নির্মাণ করেন। 

র‍্যানকিন স্ট্রিটে যে লাল রঙের প্রাসাদ সদৃশ দেখা যায় সেটি এককালের ধলা জমিদারের বাড়ি ছিল। বর্তমানে এটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অধীনে রয়েছে। 

ওয়্যার স্ট্রিট

ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট টি.জে. র‍্যানকিনের মতো এই রোডটিও এক ব্রিটিশ ভদ্রলোকের নামেই নামকরণ করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন ডিসট্রিক্ট কালেক্টর জনাব ওয়্যার (wyre)। 

তিনি ১৮৮০ এর দিকে কালেক্টর হিসেবে ওয়ারী এলাকায় আসেন। তখন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যে বাসযোগ্য নগর এলাকার প্রয়োজন ছিল। বাসযোগ্য এলাকা ও এর সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে দরকার ছিল নির্দিষ্ট পরিকল্পনার। 

এই পরিকল্পিত কাজটিই করেন জনাব ওয়্যার। এইজন্য শুধু একটি রাস্তা ‘ওয়্যার স্ট্রিট’ই নয় এমনকি ওয়ারী নামটাও তার থেকেই আসা। এখানকার তৎকালীন উন্নয়ন মূলক কাজে তার অবদান সর্বাধিক। 

গেন্ডারিয়া 

গেন্ডারিয়ার নাম নিয়ে লোক মুখে দুটি গল্প প্রযোজ্য। একটি গল্প এমন যে কোনো এক ইংরেজ ঘোড়ায় চড়ে লোহারপুল দিয়ে যাচ্ছিলো। তখন এক বিস্তীর্ণ প্রান্তে তিনি উপস্থিত হন। এই এলাকার বিশালত্বে তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেন “হোয়াট অ্যা গ্র্যান্ড এরিয়া ইট ইজ!” এখান থেকেই এর নাম হয় গ্র্যান এরিয়া এবং গ্র্যান্ড এরিয়ার নাম পরিবর্তন হতে হতে লোকমুখে হয়ে যায় গেন্ডারিয়া।

অপর গল্পটি যেটা এই নামের সাথে পরিচিত তা হলো; ব্রিটিশ সময় কিবা তারো আগে থেকে দয়াগঞ্জ, ফরিদাবাদ, মীর হাজির বাগ এইসব এলাকায় প্রচুর পরিমাণে আখের চাষ হতো। আখকে বলা হয় গেন্ডেরি, সেখান থেকেই নাম হয় গেন্ডারিয়া।

গুলিস্তান 

এই যানজটে পরিপূর্ণ গুলিস্তানের চিত্র চিরকাল এমনই ছিল না। এখানে আগে রত্তি পরিমাণে বাড়ি আর বেশিরভাগই গাছপালা ও বাগান সমৃদ্ধ ছিল। ব্রিটানিয়া হল নামে ছিল একটি প্রেক্ষাগৃহ। 

গুল ও স্তান দুটি ফারসি শব্দ, গুলের অর্থ ফুল। গুলিস্তান নামকরণ হয় একটি সিনেমা হলের নামে। 

‘৪৭ এর দেশ ভাগের পরে কোলকাতার চিত্র ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজলে দোশানি ঢাকায় চলে আসে এবং ‘৫৩ সালে প্রতিষ্ঠা করে গুলিস্তান সিনেমা হল। সিনেমা হলটি ছিল ঢাকার প্রথম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ। 

দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখানোর ফলে এটি দ্রুতই বিখ্যাত হয়ে ওঠে। লোকমুখে এই সিনেমা হলের নামেই জায়গার নাম প্রচলিত হতে থাকে। এভাবেই যা কাগজ-কলমে এক সময় জিন্না এভিনিউ এবং বর্তমানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ নামে পরিচিত তা মানুষ এখনো গুলিস্তান নামেই ডাকে। 

লালবাগ

লালবাগের নামকরণ হয় ১৮৮৪ কাছাকাছি। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে সুবেদার শায়েস্তা খান বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে আসেন। তখন এই জায়গার নাম ছিল আওরঙ্গবাদ। 

বলা হয় মারাঠাদের সাথে পরাজয়ের পরে সম্রাট আওরঙ্গজেব সুবেদার শায়েস্তা খানের উপর নারাজ হয়ে তাকে বাংলার সুবেদারি থেকে বরখাস্ত করেন। ঢাকা অনেক সময় পর রাজধানীত্ব হারায় মুর্শিদাবাদের কাছে। 

তবে ততোদিনে আওরঙ্গবাদে তাজমহলের মতোই মুঘল রীতিতে একটি লাল রঙের প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল। তারপর ১৮৮৪ সালে এই লাল রঙের প্রাসাদের নামানুসারেই এই এলাকার নাম হয় লালবাগ। 

ঢাকার নারিন্দা-ওয়ারী একদিকে, আরেকদিকে লালবাগ ও গুলিস্তান। আজ এই যানজট, ধুলোবালিতে জরাজীর্ণ শহরটিকে ইতিহাসের নানা পট পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হয়েছে। 

যাত্রা পথে কিছু ব্যক্তির অবদানে হয়েছে আলোকিত। তাদের এই অবদান পুরান ঢাকার ইমারতের প্রতিটি ইটে আলো-বাতাসের মতো আর বেঁচে আছে মানুষের মুখের ডাকে শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে।


মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com