logo

পালিয়েও রেহাই নেই: ধাওয়া করে চীনের দুর্নীতি দমন অভিযান

সৈয়দ মূসা রেজা | Thursday, 31 March 2022


মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআইয়ের পরিচালক ক্রিস্টোফার রে জানুয়ারির শেষের দিকে দেওয়া এক বক্তৃতায় শি’এর দুর্নীতি দমন অভিযানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমনের লক্ষ্য নিয়েই চালু করা হয় অপারেশন ফক্স হান্ট। কিন্তু বাস্তবে চীন “রাজনৈতিক বা আর্থিক দিক থেকে হুমকি হিসেবে মনে করছে বিদেশে বসবাসকারী সে সব সাবেক চীনা নাগরিককে তাদের লক্ষ্য করে এ অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানের মধ্য দিয়ে তাদেরকে আটকের এবং  দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য রয়েছে।”

তিনি আরো দাবি করেন, “চীনা সরকার ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী সাবেক চীনা নাগরিকদের  ক্রমবর্ধমানভাবে লক্ষ্যবস্তু করে তুলছে।”  এতে মার্কিন সংবিধান এবং আইনে দেওয়া স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে বলে রে মনে করেন। তার কথা অনুযায়ী “বর্তমানে, মার্কিন মাটিতে শত শত সাবেক চীনা নাগরিক রয়েছে যাদের নাম দেশটির সরকারি লক্ষ্য- তালিকায় রয়েছে। কেবল তাই নয় বরং  আরো অনেকে রয়েছেন যাদের নাম এমন সরকারি তালিকায় নেই।”

সিসিপির কবল থেকে পালানো

দুর্নীতি দমন অভিযানের অংশ হিসেবে, শি চীনের আমলাতন্ত্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেন। পার্টি নেতৃত্বের মেয়াদ দু’বারের বেশি হবে না। এমন এক বিধি চালু করেছিলেন দেং জিয়াওপিং। চার বছর আগে সে মেয়াদ-সীমাকে বাতিলের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেন শি। পাশাপাশি জাতীয় তত্ত্বাবধান কমিশন বা ন্যাশনাল সুপারভিশন কমিশন (এনএসসি)ও চালু করেন তিনি।

ইউরোপীয় মানবাধিকার গোষ্ঠী সেফগার্ড ডিফেন্ডারস এর মতে এনএসসি কার্যত চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি)র দুর্নীতি দমন সংস্থা সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশন বা সিসিডিআই’এর নতুন এবং বর্ধিত সংস্করণ। সিসিডিআইকে  ভয় পায় না সিসিপিতে এমন কোনো সদস্য নেই। এনএসসি তৈরি করা হয় সিসিপি’র সদস্য নয় এমন ব্যক্তিদের মোকাবেলা করার জন্য। সেফগার্ড ডিফেন্ডারসের মতে, “এনএসসি সৃষ্টি করে চীনে আইনের শাসনের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি হানা হয়েছে।”

“চীনের পুলিশ, সরকারি কৌশলীর দফতর এবং আদালতকে পাশ কাটিয়ে তদন্ত চালানোর ক্ষমতা আছে এনএসসি’র। প্রবাসী চীনা রাজনৈতিকদের বিরুদ্ধে আগের তুলনায় বেশি হারেই নামছে এ সংস্থা। বিচারিক সংস্থা না হওয়া সত্ত্বেও প্রায়ই চীনের আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা দিতে দেখা যায় এই সংস্থাকেই । 

বিদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিকদের জন্য এনএসসি কতোটা হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে তা ফুটে উঠেছে গ্রেস মেং’এর ঘটনায়। ইন্টারপোলের সাবেক প্রধান মেং হংউইয়ের স্ত্রী গ্রেস মেং। হংউইয়কে ২০১৮ সালে আটক করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়। 

ব্যবসায়ী-নারী গ্রেস মেং’এর উপাখ্যান

সাবেক ব্যবসায়ী নারী গ্রেস মেং’এর চীনা নাম হলো গাও গি। তিনি চীনের বিলাসী অভিজাত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সাবেক সদস্য। কারাবন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত তার স্বামী ছিলন চীনের গণ-নিরাপত্তা বিষয়ক সহ-মন্ত্রী। দেশে-বিদেশের যে সব চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযান চলেছে তাদের মধ্যে শীর্ষ স্থানীয় হিসেবে বিবেচিত হন তিনি। চীনা রাজনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী এবং ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি শি এবং সিসিপি’র অভিযানের আওতায় পড়েছে। 

প্যারিস এবং লিওনের ফাইনান্সিয়াল টাইমসেরে দফতরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রেস মেং জানান, লিও থেকে তাকে অন্তত দুই দফা অপহরণ করে চীনে ফেরৎ নেওয়ার চেষ্টা করেছে চীনা গুপ্তচররা। ২০১৮ সালে তার স্বামী আটক হওয়ার পর এ চেষ্টা চালানো হয়। ইন্টারপোলের সদর দফতর লিওতে অবস্থিত। এখানেই এ চীনা দম্পতি বসবাস করতেন।

বেইজিংয়ে স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পরপরই গ্রেস মেং’এর আবাসগৃহের বিপদের সংকেত বেজে ওঠে। গাড়িটি খারাপ হয়ে যায়। সময় নষ্ট না করে বাড়ি ছেড়ে এক হোটেলে আশ্রয় নেন তিনি। হোটেলেও তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালায় দুই চীনা নাগরিক। তিনি এবারে সেখান থেকে সরে পড়েন। প্রায় একই সময় এক পরিচিত চীনা ব্যক্তি তাকে ব্যক্তিগত জেট বিমান করে লিও থেকে পূর্ব ইউরোপে ব্যবসায়িক সফরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু ফাঁদ হতে পারে অনুমান করে সে প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন তিনি।

এদিকে, স্বামীর চিঠি নেওয়ার জন্য গ্রেস মেংকে আমন্ত্রণ জানান লিওর চীনের কনসাল। জবাব তিনি বলেন, যে কোনো প্রকাশ্যে স্থানে দেখা করবেন তিনি। দেখা করার বিষয়টি জানানো হবে ফরাসি কর্তৃপক্ষকে। এ সাক্ষাতের সময় সাংবাদিকরাও উপস্থিত থাকবেন। ওই সাক্ষাৎ আর কখনো হয়নি বা স্বামীর সে চিঠির কথাও আর শোনেননি গ্রেস মেং।

মাস কয়েক পরে গ্রেস মেংকে চীনে ফেরত পাঠানোর জন্য প্যারিসের ওপর চাপ দেয় বেইজিং। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফরাসি এক পদস্থ কর্তা বলেন, “এ সময়ে গ্রেস মেং দুর্নীতিতে জড়িত বলে অভিযোগ এনে তাকে চীনে ফেরত পাঠানোর দাবি জানাতে থাকে বেইজিং।”

তিনি আরো বলেন, দুর্নীতির অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করা হয়েছে এবং সিসিপির ভেতর বিভক্তি ও সহিংসতা দেখা দিয়েছে তারই পরিণতি হিসেবে এ অভিযোগ তৈরি করা হয়েছে সে সব বুঝতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। প্যারিসের চীনা দূতাবাসকে এ নিয়ে মন্তব্য করতে বললেও এ পর্যন্ত আর কোনো জবাব মেলেনি।

চীনাদের দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়েছে, বাড়ছে শরণার্থীও

চীনা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং তৎপরতা নিয়ে খবর সেভাবে প্রকাশ পায় না। মেং এর ঘটনাকে তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। ২০১২’তে পৃথিবীব্যাপী আশ্রয়প্রার্থী চীনা নাগরিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫,০০০; সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তা বেড়ে ১,০০,০০০ এ দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে ১,৭৫,০০০ শরণার্থী হয়ে চীনারা শীর্ষে অবস্থান করে নিয়েছে।

বেইজিংয়ের জাতীয় নিরাপত্তা আইন হংকং’এর ওপর আরোপ করা হয়। এতে চীনে সীমান্তের বাইরেও সন্দেহভাজনদের বিচারের অনুমতি দেওয়া হয়। এই আইন চীন ছাড়ার  প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ পাসপোর্ট কর্মসূচির অধীনে কয়েক হাজার হংকংবাসী গত বছর যুক্তরাজ্যে ভেগে গেছে। অনুমান করা হচ্ছে, পাঁচ বছরে এ সংখ্যা ৩,০০,০০০ ছোঁবে।

চীনা কর্তৃপক্ষের দাবি যে দুর্নীতির দায়ে হাজার হাজার সন্দেহভাজন বিদেশে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। তাদের চীনে ফিরিয়ে আনার অধিকার বেইজিংয়ের আছে এবং এ অধিকার বাস্তবায়নে চীন বন্ধপরিকর। সিসিডিআই’এর দেওয়া হিসাব বলছে, শুধু ২০২০ সালে, ১৪০০’র বেশি পলাতক চীনা নাগরিককে স্বদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের সাথে সাথে চীনে ফিরেছে বৈধতাহীনভাবে অর্জিত ৪৫ কোটি ডলারও।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিশেষজ্ঞ জিয়াংনান ঝু বলেন, এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চীন থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের, যাদের ধরার জন্য সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে তাদের, জনপ্রিয় গন্তব্যের তালিকার শীর্ষে রয়েছে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া। তারা কেউ রাতারাতি পালান না। বা চীন ছাড়েন না। ভেগে যাওয়ার কাজটা করা হয়, সাধারণত, সুপরিকল্পিতভাবে। বছরের পর বছর ধরে মোটা অঙ্কের পুঁজি গাপ করে ফেলা হয়। স্থানান্তর করা হয় বা চোরাপথে চীনের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর সুযোগ বুঝে নিজেরা সটকে পড়েন।

চীনা আইন বিশেষজ্ঞ এবং নিউ জার্সির সেটন হল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্গারেট লুই বলেন, এ সব মানুষকে চীনের বাইরে কী ধরণের সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ আছে – সে প্রশ্ন নিয়ে “সত্যিই পরীক্ষার” পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। আর এ পরীক্ষায় পড়েছে মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সব সরকার। 

তিনি বলেন, পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদ নিয়ে চীন থেকে যারা ভেগে যেতে সক্ষম, তাদের কাছে আকর্ষণীয় হবে সে সব দেশ যেখানে শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে। যে সব দেশ বলে, “আমরা মানুষকে উড়োজাহাজে করে ফেরত পাঠিয়ে দেই” তাদের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয় হবে এ সব দেশ।”

তিনি আরো বলেন, “অভিযুক্তদের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে, পাশাপাশি দেশ যেন দুর্নীতিবাজ কর্তাদের ভাগাড় বা স্বর্গভূমি না হয়ে ওঠে তাও দেখতে হবে। শ্যাম রাখি না কূল রাখি এমন এক পরিস্থিতির মুখে পড়বে দেশগুলো। সব মিলিয়ে এ এক জটিল কাজ হয়ে দেখা দেবে।”

দু’বছর আগে প্রকাশিত ‘চায়না’জ গিলডেড এজ: দ্যা প্যারাডক্স অব ইকোনমিক বুম অ্যান্ড ভাস্ট করাপশন’ বইয়ের লেখক এবং চীনা রাজনীতির বিশেষজ্ঞ ইয়ুয়েন ইয়ুয়েন অ্যাং বলেন,  চীনে বিপ্লবী নেতা মাও সে তুংয়ের জমানায়ও দুর্নীতি ছিল। সে যুগের দুর্নীতির মাত্রা ছিল খুবই কম এবং দুর্নীতির পরিস্থিতিও ছিল একেবারেই প্রাথমিক।  রাষ্ট্রের কাছ থেকে রেশন বা আবাসন সুবিধা নেওয়ার জন্য খাবার এবং উপহারের ছলে ঘুষ দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। মাওয়ের আমলে আমলারা ন্যায়পরায়ণ থাকায় ঘুষের প্রকোপ কম ছিল বলে গোঁড়া মাওবাদীরা দাবি করেন। কিন্তু প্রকৃত কারণ তা নয় বরং সে সময়ে চীনা নাগরিকেরা তুলনামূলকভাবে গরীব ছিল। কঠোর শান্তির বিধান ছিল। সামান্য দুর্নীতির দায়েও সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে প্রাণদণ্ড কার্যকরা করা হতো।” 

ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]

আরো পড়ুন: শি জিনপিং ও চীনের দুর্নীতি দমন অভিযান