পশ্চিমের গোটা একটা প্রজন্মকে আত্মপরিচয় দিয়েছে আফগানিস্তান
কনসটানজে স্টেলজমুলার | Saturday, 4 September 2021
সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাবো পশ্চিমা সামরিক শক্তি দফায় দফায় পিছু হটছে। আলজেরিয়া (১৯৬২), ভিয়েতনাম (১৯৭৫), ইরাক (২০১১), সুদান (মে ২০২১) এবং সম্প্রতি তারা হটেছে আফগানিস্তান থেকে। কিন্তু সর্বশেষ পিছিয়ে আসার এ ঘটনা কেন এতো বেশি ভিন্ন ধরণের মনে হচ্ছে? কেন এ ঘটনাকে এতো বেদনাদায়ক, এতো ব্যক্তিগত এবং তাৎক্ষণিক হিসেবে অনুভব করা হচ্ছে?
বিলেতের রক্ষণশীল সংসদ সদস্য এবং সাবেক সেনা কর্তা টম টুগেনহাট কমন্স সভায় জানান তাঁর কাছে কাবুল থেকে উপায়ন্তরহীন মানুষ উদ্ধার পাওয়ার আশায় ফোন করছে, টেক্সট মেসেজ পাঠাচ্ছে। তিনি বলেন, “অন্য অনেক সাবেক সেনার মতো এ সপ্তাহে আমাকেও ক্রোধ, উন্মাদনা এবং দুঃখ ও মর্মবেদনাকে সামাল দিয়ে চলতে হয়েছে।” তাঁর জোরালো বক্তৃতা দ্রুতই ভাইরাল হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর এই বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে আফগানিস্তানের ২০ বছরের যুদ্ধে জড়িত আমেরিকা এবং ইউরোপের সাবেক সেনা ও বেসামরিক কর্তারা মন্তব্য করেছেন এবং করছেন। তাঁদের মন্তব্য করার ধারা অব্যাহত রয়েছে। এ সব মন্তব্যের মধ্যে বেদনা এবং উদ্বেগ দুটোরই দেখা মিলবে।
সোমবার (৩০ আগস্ট) শেষ বেলায় মার্কিন বিমান চলে যাওয়ার সাথে সাথেই আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমা সেনাবাহিনীকে সরিয়ে আনার ‘নটে গাছটি মুড়াল।’ এই সরিয়ে আনার জন্য কাবুলে এবং আফগানিস্তানের দূরবর্তী এলাকায় দিনরাত কাজ করেছে এক লাখের বেশি কূটনৈতিক, ত্রাণ এবং উন্নয়ন তৎপরতায় জড়িত আফগান কর্মী বাহিনী। মার্কিন মিত্র বাহিনী তাদেরকে আফগানিস্তান থেকে বের করে এনেছে।
এর চেয়ে হয়ত স্মরণযোগ্য যে সরিয়ে আনার এ তৎপরতায় পশ্চিমা বেসামরিক সমাজ উল্লেখযোগ্য ভাবে জড়িয়ে পড়ে। খোদ আমেরিকায়, সাবেক সেনাদের সংগঠনগুলো কালবিলম্ব না করেই সহায়তা করতে এগিয়ে আসে। একই ভাবে অন্যান্য দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলোও সরিয়ে আনার কাজে ঝাঁপ দেয়।
সরিয়ে নেওয়ার এই তৎপরতায় কি কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা ছিলো? এ নিয়ে পশ্চিমা জনগণ কি আবেগ তাড়িত হয়ে কাজ করেছে? কিংবা বিভিন্ন সংস্থা ও মানুষের মধ্যে কি এ নিয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে? হ্যাঁ, ওরকম সব অবস্থার মুখেই পড়তে হয়েছে। বহুপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করা নিয়ে ইউরোপ গর্ব করে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে সরে আসার একতরফা সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আর এভাবে সরে আসার সময় জাতিসংঘ, জি-৭ গোষ্ঠী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পশ্চিমা সেনাবাহিনী, দূতাবাস বা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জন্য হাজার হাজার আফগান নারী-পুরুষ কাজ করেছেন। কাবুল থেকে সরে আসার সময়ে তাঁদেরকে পিছে ফেলে চলে যায় পশ্চিমারা। তাঁদের জীবন এখন প্রাণঘাতী হুমকিতে পড়েছে। তবে তাঁদেরকে সহায়তা করার কাজ চলছে। একশটি দেশ তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করার ঘোষণা দেয় রোববারে। সরিয়ে আনার তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে এ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়। ত্রাণ তৎপরতাকে চালিত করছে যে সংহতি এবং গরজ তা সত্যিই নিখাদ, কার্যকর এবং বিস্ময়কর ভাবে বড় পরিসরের।
কেন এমনভাবে সবাই তৎপর হয়ে উঠেছে? নিশ্চিতভাবেই অপরাধ বোধ তাদের তাড়া করছে। সরিয়ে আনার এবং সমর্থন দেওয়ার তৎপরতা অব্যাহত রাখা না হলে বিপদাপন্ন আফগানদের ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। আর এ বিষয়টি সামগ্রিক বিবেকের ওপর ভারী বোঝা হয়ে থাকবে।
জার্মানি ১৯৩৮ সালে চেকোশ্লাভিয়ায় যে আগ্রাসন চালায়। সে সময় ‘এ নিয়ে সংসদে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই’ বলে বক্তব্য দিয়ে কুখ্যাতি অর্জন করেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিন। টুগেনহাট কমন্স সভায় প্রায় একই কথার প্রতিধ্বনি ঘটান। তিনি বলেন, “আফগানিস্তান দূরের কোনো দেশ নয় যে যার সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি।”
আল-কায়েদার ৯/১১ হামলার জবাবে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায় আমেরিকা। আল-কায়েদাকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল তালেবান। এই অভিযান চালানোর জন্য সেবারই প্রথম ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা (ধারা ৫) কে কার্যকর করা হয়। মার্কিন হামলা পরবর্তী দুইটি দশক আফগানিস্তানের মাটি ব্যাপক প্রাণক্ষয়ের ঘটনা চাক্ষুষ করে। কমপক্ষে এক লাখ ৬০ হাজার আফগান নিহত হয় আর পশ্চিমাদের মৃতের সংখ্যা প্রায় আট হাজারে গিয়ে ঠেকে। আফগানিস্তানে যুদ্ধ-খরচ বাবদ একমাত্র আমেরিকার গাঁট থেকে দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা গেছে বলেই মনে করা হয়। পশ্চিমা এবং আফগান নীতি নির্ধারকরা দেশটিতে মারাত্মক সব ভুল করেছেন। আজ অবধি এ সব ভুলের পুরোপুরি উন্মোচন বা বিশ্লেষণ করা হয়নি।
তবে আফগানিস্তানে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থতার বানের পানিতে ভেসে গেছে, তা বলা যাবে না। আল-কায়েদাকে আফগানিস্তানের মাটি থেকে খেদিয়ে দেয়া হয়েছে। আফগান অনেক নাগরিক বিশেষ করে নারীদের জীবনমান বেশ উন্নত হয়েছে যা হয়ত কোনো মাপকাঠি দিয়ে বোঝা যাবে না। আফগানিস্তানে একটি শিক্ষিত সুশীল সমাজ গড়ে উঠেছে। অতীতে কখনো দেশটিতে এমন সুশীল সমাজের অস্তিত্বই ছিল না। এদের অনেকের কাছেই পশ্চিমা বিশিষ্টজনদের সেল ফোন নম্বরও আছে।
আফগানিস্তানেরই কেবল পরিবর্তন ঘটেছে তা নয়, একই ভাবে বদলে গেছে পশ্চিমও। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাবে প্রায় আট লাখ ৩২ হাজার মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করেছে। জার্মান বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন করে জানা গেছে, সে দেশটির দেড় লাখ সেনা গিয়েছিল আফগানিস্তানে। আফগানিস্তানে মোতায়েন ন্যাটো বাহিনীর স্থিতিশীলতা স্থাপনকারী মিশনের সর্বোচ্চ সেনা সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩০ হাজার। ৫০টি দেশ থেকে ন্যাটো বাহিনীর এ সব সেনা নেওয়া হয়েছিল। এর সাথে যোগ করতে হবে কূটনৈতিক, ত্রাণ কর্মী ও সাংবাদিকদের বিপুল বহরকে। তাদের মোট সংখ্যা চট করে জানার কোনো উপায় নেই। এ ভাবে পশ্চিমাদের গোটা একটি প্রজন্মের কর্মী জীবন ও রাজনৈতিক পরিচয়কে গড়ে তুলেছে আফগানিস্তানের মিশন। শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এমন ঘটনা কোথাও আর কেউ দেখেনি। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনেগ্রেট ক্র্যাম্প-কারেনবাউয়ার গত সপ্তাহে আত্মা-অনুসন্ধানী এক ভাষণে স্বীকার করেন, ‘একটি জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয়কেও তুলে ধরেছে আফগানিস্তান। এমন একটি জাতির পরিচয় তুলে ধরেছে যে কিনা সত্যের পক্ষে নিয়ে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না।’
আফগানিস্তানে পশ্চিমের হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত কিন্তু এখনো অসমাপ্ত ফলাফলই এর বৈধতাকে নির্ধারণ করবে। আর এখন যে সব ঘটনা ঘটবে বছরের পর বছর ধরে তারই প্রভাব বর্তাবে রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ এবং সেনাবাহিনীর পারস্পরিক আস্থার উপর।
এখন সবার আগে বিপন্ন আফগানদের রক্ষা করার দিকে পশ্চিমকে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে পশ্চিম নিজেকেও রক্ষা করবে।
[লেখক একজন জার্মান সাংবাদিক। ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]