পরিবেশ-কর্মীদের আবার ডাক দিচ্ছে ১৯৭১
একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি
সৈয়দ মূসা রেজা | Monday, 18 October 2021
‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা…’কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই সতর্কবার্তায়ও কাব্যের স্বাদ অটুট আছে। কিন্তু এমন পর্যায়ের জীবনযাত্রায় সে কল্পলোকের অল্প মজার রেশটুকু হাতড়িয়ে পাওয়া যাবে না। গত দশকের পর দশক জুড়ে গোটা মানবজাতি এবং অন্যান্য প্রজাতির বেশির ভাগ সদস্যই ধ্বংসের সীমারেখার কাছেই চলে গেছে। এবারে চোখ খুলেই দেখতে পাচ্ছি আমাদের গোটা দৃষ্টিপথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে তেড়ে আসা দৈত্যের মতো সমূলে বিনাশ। গণবিলুপ্তি। দেখতে পাচ্ছি গনগনে দাবানল থেকে শুরু করে চরম আবহাওয়াসৃষ্ট বিধ্বংসী উৎপাত। আগামী মাসে গ্লাসগোর কপ২৬ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের আলোচ্যসূচি দখল করে থাকবে এমনই অসংখ্য বালা-মুসিবতের উদ্বেগের আখ্যান। কিন্তু যদি থাকতো কোনো আগাম সর্তকবার্তা কিংবা যদি কেউ বাজিয়ে দিত বিপদ ঘণ্টা!
সেই আগাম বার্তা তাঁরা দিয়েছিলেন। তাঁরাই সাহসে ভর করে দ্বিধাহীন স্পষ্টতায় বাজিয়ে দিয়েছিলেন বিপদ ঘণ্টা। প্রথম ১৯৬২ সালে রাসেল কারসন প্রকাশ করেন সাইলেন্ট স্প্রিং । কীটনাশক এবং ডিডিটি’র সর্বনাশী ভূমিকা সর্বসম্মুখে তুলে ধরেন তিনি। কারসনের কাজকে অপেশাদার মানসিকতার তড়কা বা খিঁচুনি বলে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো লোকের অভাব সে দিন হয়নি। কিন্তু মহাকাল কারসনকে ভুলে যায়নি। পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম ভিত হিসেবে গণ্য হওয়ার বিরল সম্মাননা পেয়েছে সাইলেন্ট স্প্রিং । পরিবেশ-সচেতন লেখকদের গোটা প্রজন্মকে ‘ঘা-মেরে’জাগিয়ে তুলেছেন কারসন। তার প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৭১ সালে।

রাসেল কার্সন ও তার বই সাইলেন্ট স্প্রিং
১৯৭১ সালে বা আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে, বাংলাদেশের রক্তাক্ত অভ্যুদয়ের সালে, বিশ্বজুড়ে উদ্ভূত পরিবেশ বিপর্যয়ে মানুষের দায়ভাগ স্পষ্ট করে তোলে তিনটি বই। সেসময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গান, “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি” আজকের পরিবেশ যুদ্ধের একটি শ্লোগান হয়ে উঠতে পারে বলে এখন ভাবাই যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের বছরটিতেই তিন প্রকাশনার নির্ভুল দায় নির্ধারণী ভূমিকা বাকহারাই করে না বরং তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গভীরতা এবং ব্যাপ্তি আমাদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা আদায় করে নেয়।
দশকের পর দশক জুড়ে অবিরাম পরিবেশ বিপযর্য়। তেল ছড়িয়ে বা চুইয়ে বিপর্যয়ের ধোয়াশাকে আরো ঘনীভূত করে তোলা। দূষণের খতিয়ানকে আরো জঘন্য কাতারে নামিয়ে আনার সাথে সাথে অব্যাহত মানব অধিকার পদদলিত করা এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-বিগ্রহের দাপটে কম্পমান এ গ্রহ। অব্যাহত বিরূপ যাত্রার কালজুড়ে এই তিন প্রকাশনার প্রাসঙ্গিতা আজো অটুট রয়েছে বলে মনে করেন নীলাঞ্জনা রায়। ফাইনান্সিয়াল টাইমসে এক নিবন্ধে এসব প্রকাশনার ওপর আলোপাত করেছেন।
“পাঁচ বছরের মধ্যেই আমাদের উদ্বেগশক্তিতে তাড়িত জনরোষ বিকট আকার ধারণ করবে। জন্ম নেবে অনেক শূন্যগর্ভ আইন।“ ১৯৭১ এ কথাগুলোই লিখেছেন ওয়েনডেল ব্যারি। এর বছর তিনে আগে ১৯৬৮ সালে তিনি দ্য হোল আর্থ ক্যাটালগ নামে একটি সাময়িকী প্রকাশন শুরু করেন লেখক ও উদ্যাক্তা স্টুয়ার্ট ব্র্যান্ড। বিচিত্র রচনাবলীর বুনো সমাহার বলা যায় এই প্রকাশনাটিকে। এতে স্থান করে নেয় একাধারে নিবন্ধ, গল্প-কাহিনি, পণ্য পর্যালোচনা এবং সুপারিশমালা। পরবর্তীকালে স্টিভ জবভ দ্য হোল আর্থ ক্যাটালগ সম্পর্কে বলেন, “একে মুদ্রিত গুগল বলা যায়...একাধারে আদর্শবাদী, দুর্দান্ত ধারণা এবং ঝরেঝরে হাতিয়ারে পরিপূর্ণ, উপচে পড়া এক প্রকাশনা।”১৯৭১ সালের জুন মাসে এর ‘শেষ’ সংখ্যায় [এরপর অনিয়মিত ও বিচ্ছিন্নভাবে ১৯৯৮ পরযন্ত প্রকাশিত হয়েছে] সাময়িকীটিতে প্রকাশিত হয় মার্কিন বড় মাপের কবি, উপন্যাসিক, কৃষক এবং পরিবেশবাদী ওয়েনডেল ব্যারির নিবন্ধ “থিংক লিটল।” এ সাথেই প্রকাশ করা হয় কাল জং-এর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিফলন সংক্রান্ত রচনা এবং কায়াক(এক জাতের নৌকা) কিটসের বিজ্ঞাপন। ওয়েনডেল ব্যারি তাঁর রচনায় সতর্ক বার্তার শীতল ঝাণ্ডা ওড়ান, লেখেন, “পাঁচ বছরের মধ্যেই আমাদের উদ্বেগশক্তিতে তাড়িত জনরোষ বিকট আকার ধারণ করবে। জন্ম নেবে অনেক শূন্যগর্ভ আইন। একই সাথে একটি মহান এবং হয়ত শেষ মানব সুযোগও চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে।”

দ্য লাস্ট হোল আর্থ ক্যাটালগের প্রচ্ছদ
ব্যারির সযত্ন যুক্তি উপস্থাপনে রীতিমত চমকিত হন আজকের দিনের পাঠক। ব্যারি বলেন, “পরিবেশবাদ একক ভাবে কাজ করতে পারে না। পরিবেশবাদকে নাগরিক অধিকার এবং শান্তি আন্দোলন থেকে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা করা যাবে না বরং এ সব আন্দোলনের যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে দেখা উচিত। আমি মনে করি, এই তিন আন্দোলনের মধ্যে যে ভেদ রেখা টানা হয়েছে তা কৃত্রিম। লোভ এবং বঞ্চনার মানসিকতা থেকে এটি করা হয়।”
একই বছর ফ্রান্সেস মোর ল্যাপের “ডায়েট ফর এ স্মল প্লানেট”বইটি প্রকাশিত হয়। তাঁর বয়স তখন ২৭ এবং দারিদ্র নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এ পর্যন্ত তাঁর বই বিক্রির সংখ্যা ৩৫ লাখ অতিক্রম করতে চলেছে এবং বর্তমানে এ বইয়ের ২০তম সংস্করণ বের হয়েছে। ৫০ বছর পূর্তি স্মরণে বইটির বিশেষ সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে। একটি লিফলেট প্রকাশের মাধ্যমে এ বই লেখায় নেমেছিলেন ২৬ বছর বয়সি ল্যাপে। ডায়েট ফর এ স্মল প্লানেটে ল্যাপে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, গোশতকেন্দ্রিক খাদ্যেই “দুনিয়ার উৎপাদশীলতা অপচয়ের প্রধান কারণ।” এ ছাড়া খাদ্যপণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা গণ-যান্ত্রিকরণের বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

ডায়েট ফর এ স্মল প্লানেট বইয়ের প্রচ্ছদ
ল্যাপের চোখে রাজনীতি এবং খাবার বাসনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, দুনিয়ার সব মানুষকে খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে পৃথিবীর ভাণ্ডারে। “ক্ষুধার মতো অন্যায়”টি, ল্যাপে মনে করেন, “প্রার্চুযে ভরা এ বিশ্বে”এড়ানো সম্ভব। ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত বইটির বিশেষ সংস্করণে ল্যাপে জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষুধা পরিস্থিত আরো খারাপ হয়েছে। অথচ ৫০ বছর আগের চেয়ে এখন বিশ্বের খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যেকের মাথাপিছু এক-পঞ্চমাংশ বেশি ক্যালোরির খাবার যোগান দেওয়া হচ্ছে। তারপরও খোদ আমেরিকাতেই ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান তিনি!
১৯৭১-এ পরিবেশবাদের হাওয়ার দুলে উঠেছিল শিশু সাহিত্যের কোমল জগতও। লোরাক্স নামের পরিবেশ-রূপকথা প্রকাশ করেন শিশু সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং শিশুদের খুবই প্রিয় সে সময়ের লেখক ড. সিউস। লোরাক্সে তিনি তুলে ধরেন লোভী শিল্পপতি ওয়ানস-লার কবল থেকে ট্রফলা বনকে বাঁচানোর লড়াইয়ের এক কাহিনি। নামসর্বস্ব খুদে শ্যাওলা প্রাণী লোরাক্স “সে সব গাছের জন্য কথা বলে যে সব গাছের ভাষা নেই।” লোভী ওয়ানস-লারকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে লোরেক্স। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ছিনতাই হয়ে গেছে এমন জমি নিয়ে দুঃচিন্তায় পড়তে হয়।
পরিবেশ সংকট নিয়ে শিশুতোষ বই লেখার আদর্শ আদল হয়ে দাঁড়ায় ড. সিউসের এ বই। ১০ লাখ বই বিক্রি হয়েছে। তারপরও কাঠ শিল্পের শক্তিশালী কুড়ালের মুখে পড়ে দ্য লোরাক্স। স্কুলের পাঠ্য তালিকা থেকে বইটিকে ছেঁটে দেওয়ার জন্য ১৯৮০ এবং ১৯৯০’এর দশকে কাঠ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন।

দ্য লোরাক্স বইয়ের প্রচ্ছদ
তাহলে দেখা যাচ্ছে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেই আমরা নির্ভুল ভাবেই জেনে যাই যে, সমস্যার নাগপাশ পৃথিবীর শরীরকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলছে। এই তিন বইসহ পরিবেশবাদী লেখকদের কলম হতে একই বছর থেকেই ক্ষুরধার রচনা বের হতে থাকে। এই তিন বইয়ের একটি প্রকৃতিতে প্রতি-সাংস্কৃতিক, আরেকটি সর্বাধিক বিক্রির পতাকা বছরের পর বছরে উচিয়ে রেখেছে আর তৃতীয়টি হলো শিশুতোষ বই। এই তিন বইয়ের কল্যাণে অনেক মানুষের মন বদলে গেছে, বদলে গেছে ভাবনার স্বরূপ। তবে এইসব লেখক বিপ্লবের কোনো আগুন উস্কে দিতে পারেননি। সে ব্যর্থতা কেবল তাদেরই একার নয়।

ওয়েনডেল ব্যারি এখন ৮৭ বছরে পা দিয়েছেন
তাহলে আজকের দিনের পরিবেশ লেখকদের জন্য তারা কোন শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন? হ্যাঁ আজকের দিনের লেখককে সম্ভাব্য সর্বাধিক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং পরিবেশ সংকটের রেখাচিত্র তুলে ধরতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, আসন্ন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে হতাশার অতল গহ্বরে ডুবিয়ে দেওয়ার বদলে আশার উজ্জ্বল শিখায় উদীপ্ত করে তুলতে হবে। ওয়েনডেল ব্যারি এখন ৮৭ বছরে পা দিয়েছেন, তিনিও বলছেন, “এমনকি আমাদের পক্ষের মানুষরাও বলছে, ভয় পাও, ভয় পাও, ভয় পাও। তাদের এমন কথাও ছুঁড়ে ফেলতে হবে আমাদেরকেই।”
ভয় নয়, ভালোবাসা নিয়ে নামতে হবে পরিবেশ-যুদ্ধে।
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]